সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অনিরুদ্ধ গোস্বামী (পর্ব – ১৬)

অদৃশ্য প্রজাপতি

কতক্ষন বসে ছিলাম জানি না। রাত তখন একটা।কি করতে হবে এই প্রজেক্ট এ আমার এ নিয়ে আর কোনো সংশয় আর থাকলো না। এক অদ্ভুত ভাবে মন আমার শান্ত। ভেতরেই সমাধান (ওশো)। ল্যাপটপ নিয়ে বসলাম আর আমার সিদ্ধান্ত গুলো নোট করে নিলাম।
১ ]আমরা মার্কেট এ লঞ্চ এর দিন এগিয়ে এনে পরের সপ্তাহে বুধবার করবো । হাতে আর সাত দিন সময় আছে।
২] কোনো ট্রেড অফার মার্কেট এ দেব না।
3] প্রতিটি এম্পুলের এর দাম অপরবর্তনীয় রাখা হবে
৪] প্রতিটি এম্পুলের এর সাথে ইনজেকশন সিরিঞ্জ ফ্রি দেওয়া হবে।
পরের তিন দিন ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক কি ভাবে কাজ করলে কোম্পানি থেকে ডিস্ট্রিবিউটার আর ওষুধের দোকানে প্রোডাক্ট পৌঁছে যাবে তার একটা রূপরেখা তৈরী করে নিলাম। সেলস টীম এর ভালো সাপোর্ট চাই। সে মতো কুটটি র কে জানিয়ে একটা মেইল করে দিলাম।
পুরো ব্যাপার তা সম্পূর্ণ করার পর মনে হলো চারিদিকে কোলাহলের মাঝে ভেতরেই শান্তি আর সমাধান।
সকালে ভিডিও কনফারেন্স এ প্রজেক্ট প্রোগ্রেশন নিয়ে ম্যানেজিং ডিরেক্টর এর সাথে কথা হল। একটাই কমেন্ট করলেন “নীল ইওর ফ্রি সিরিঞ্জ কনসেপ্ট উইল ক্রাশ দি কম্পিটিটর ”
সিরিঞ্জ এর পুরোটা আসবে আমাদের কোম্পানির অন্য একটি ডিভিশন এর থেকে। এতে আমাদের ডিস্ট্রিবিউশন এর কোনো সমস্যা থাকবে না। ফ্রি সিরিঞ্জ প্রোডাক্ট এর সাথেই পৌঁছে যাবে।
পুরো দিন টা গেল সেলস হেড ,ডিস্ট্রিবিউশন,স্টকিস্ট এর সাথে মিটিং এ। সেলস হেড পুরো ব্যাপার টা সেলস টীম কে ভিডিও কনফারেন্সিং ব্রিফ করল। আমি জোর দিলাম দুটো ব্যাপার এ
এক ডিস্ট্রিবিউটের আর ওষুধের দোকানে শনিবার এর মধ্যে যেন আমাদের প্রোডাক্ট টি পৌঁছে যায় ফ্রি সিরিঞ্জ সহ। বিন্সি সিরিঞ্জ এর প্রয়োজন কতটা হবে তার একটা প্রজেকশন এর মধ্যে তৈরী করে হেড অফিস এ জানিয়ে দিলো।
ব্যস্ত তম দিনের শেষে কুটটি, আমি আর বিন্সি ডিনার এ বেরোলাম ” আরাবিয়ান নাইটস ” রেস্টুরেন্ট এর উদ্দেশে। কালুর – কাদাবানথার রোড এর কাছে এটার স্পেশালিটি হচ্ছে মিডল ইস্ট এর খাবার , তার সাথে সি ফুড। ডিসপ্লে তে বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ রাখা থাকে। যেটা অর্ডার করা হবে সেটা সুন্দর ভাবে গ্রিল করে সার্ভ করবে। আফগানী চিকেন এখানকার বিশেষ মেনু।
ডিনার টেবিল এ কুটটি জিজ্ঞাসা করলো ” নীল বস কি ভাবে এই আইডিয়া টা আনলেন”
বিন্সি যোগ করলো আর কোনো কম্প্রোমাইসে না করে এবং প্রফিটেবিলিটি বেশি রেখে।
ছোট্ট উত্তর দিলাম ” এমং ডার্কনেস ( অন্ধকারের মধ্যে থেকে)
© অনিরুদ্ধ

জগিং এর অনেক বেনিফিটের মধ্যে একটা হলো মনসংযোগ ঠিক রাখা। হার্ট রেট বাড়ে আর মনের এদিক ওদিক ছোটা কমে যায় । সকালে মেরিন ড্রাইভ এর ওয়াক ওয়ে তে জগিং এর সময় সমুদ্রের তাজা বাতাস অনেক তরতাজা করে দেয়। আমি এক্স্টাটিক মুহূর্ত তখন ফীল করি যখন বিন্দু বিন্দু ঘাম পেছনের চুল বেয়ে উষ্ণ ঘাড়ে পড়তে থাকে। ঠিক এই রকম একটি মুহূর্তে পাশে একটি স্কুটি কে দাঁড় করানো দেখতে পেলাম। আথিরার স্কুটি টাও একই রকম দেখতে ছিল । একদম নতুন। সামনে “এ “লেখা থাকতো । আথিরার স্কুটির নম্বর ছিল KL ******। নম্বর টাও অজান্তে মুখস্ত হয়ে গেছে ।

 

মনে পড়লো বিন্সি র এর আত্মীয় RTO অফিস এ কাজ করেন। আমার হোন্ডা সিভিক কেনার সময় খুবই সাহায্য করেছিলেন। আজ অফিস বিন্সি কে নম্বর তা দিয়ে ডিটেলস টা দিতে অনুরোধ করলাম। কয়েকদিন এর মধ্যে জানাবে বললো।
বুধবার লঞ্চ এর জন্য সব কাজ পরিকল্পনা মতো ঠিক ঠাক এগোচ্ছে। ডাক্তার দের সাথে কিভাবে কথা বলবে ,আমাদের প্রোডাক্ট এর গুনাগুন ঠিকমতো ডিটেল করছে কিনা , তার প্র্যাকটিস কেমন চলছে তার একটা রিপোর্ট নিয়ে নিলাম কুটটি জির কাছে। যদিও এতটা না জড়ালেও চলে। কিন্তু এই প্রজেক্ট এ একটা প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ আছে। তাই ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।

রবিবার গুলো যেন আজকাল আর কাটতেই চায় না। আথিরার নম্বর টা আর কোনোদিন বেজে উঠবে না মন যে কিছুতেই মানতে চায় না। সকাল ১০ টা নাগাদ ডোর বেল বাজলো। আথিরা আসতো তখন ,ভাবলাম সেই নয়তো ?দরজা খুলে দেখি বিন্সি। একটু অবাক হলাম না জানিয়ে চলে এসেছে দেখে।
বিন্সি :বস ,ভেতরে আসতেও বলবেনা ? অবাক হলে নিশ্চয়।
নীল :আরে বিন্সি ,ওলোয়েস ওয়েলকাম। ফীল ফ্রি এস ইওর হোম।
ভেতরে আসতে ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বার করে বললো ” তুমি যে স্ক্যুটি র ডিটেলস টা চেয়েছিলে সেটা দিতে এলাম। ভাবলাম না জানিয়ে গিয়ে অবাক করে দি।
খুলে দেখলাম নাম লেখা আছে আথিরা বালাকৃষ্ণান ,ঠিকানা -থিরুভানানথাপুরাম (ত্রিভান্দ্রাম )
একটা হার্ট বীট মিস হলো আমার মনে হয়।
বিন্সি : নীল এড্রেস টা দেখো আমাদের রাইভাল কোম্পানির হেড অফিস ত্রিভান্দ্রাম এর। একে চিনলে কিভাবে।
মনের কথা মুখে আস্তে না দেওয়া আমাদের মতো কর্পোরেট মানুষদের অন্যতম স্কিল।
জানতাম এই প্রশ্ন টা আসতে পারে। বললাম ,জানিনা স্ক্যুটি টা কে অফিস এর আসে পাশে কয়েকদিন দেখেছি।
কথা ঘোরাবার জন্য বললাম লিভ ইট বিন্সি । প্রথমবার এলে আমার ফ্লাট এ বল কি খাবে।
বিন্সি তার স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে বললো যদি বলি একসাথে লাঞ্চ করতে চাই তাউ তোমার হাতে বানানো তা হলে কি খুব বেশি চাওয়া হবে। নাকি বলবে ” আই এম নট প্রিপেয়ারড !”
নীল:বিন্সি ,লাঞ্চে তুমি খাবে বললে যখন তখন স্পেশাল কিছু ভাবতে হবে। তৈরী করা যেতে পারে কেরালা ঘি রাইস আর কুঁদাপুর ঘি রোস্ট চিংড়ি। চলবে ?
বিন্সি: ইয়া বস দৌড়াবে বলে লাফিয়ে উঠে জড়িয়ে ধরলো।
বললাম :হেল্প উরসেল্ফ উইথ জুস এন্ড এনজয় দি ভিউ ফ্রম ব্যালকনি । বিন্সি আজ একটু বেশি মাত্রায় চঞ্চল।
ঘি রোস্ট এর মসলা টা তৈরী করে নিলাম তারই মধ্যে। মন পরে আছে কাগজের ওই ঠিকানা তার দিকে। আথিরার সাথে কি সম্পর্ক ওই কোম্পানির। কর্পোরেট espionage এর ব্যাপার নয় তো ?
এইসব ভাবছি ঘি এর মধ্যে প্রন্স আর মশলা মেশাতে মেশাতে। সুন্দর ঘি আর রোস্ট করা মশলার গন্ধে চারিদিকে ম ম করছে। বিন্সি পিছন থেকে এসে বললো সুন্দর একটা গন্ধ ছড়িয়েছে। টেস্ট করতে পারি। বলে নিজেই তুলে নিয়ে একটা প্রন মুখে পুরে দিল। গরম টা জিভে লাগতেই উঃ আঃ করে লাফাতে লাগলো। সেই অবস্থায় খোলা মুখে ফু দিতে একটু ধাতস্ত হলো। আমার ঠোঁট তার মুখের খুবই কাছে। এক পলক আমার চোখের চোখ রাখলো …গলার স্বর যেন একটু অন্যরকম … ডেলিসিয়াস নীল বলে নিজের ঠোঁট দিয়ে আমার জড়িয়ে রাখলো আবেশে। তার জিভ আর অন্য এক স্বাদের সন্ধান করে চলেছে আমার মুখের মধ্যে। তার একটা হাত ঘর্মাক্ত আমার বুক বেয়ে গলার কাছে আলতো করে স্পর্শ করে রইলো। সে অপর দিক থেকে সাড়া পেলো না ।
বললো :নীল আমার সমর্পনের কি ঘাটতি থেকে গেল ?
আমি তার হাত ধরে বললাম বিন্সি আমি যে সমর্পিত। হাত ছাড়িয়ে চলে গেল। সব প্রেম মনে
হয় মানুষ কে একা করে দেয়।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।