সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে বিজয়া দেব (পর্ব – ১)

অতিমারি

(প্রথম ঢেউ)

মরমী হাঁফাতে হাঁফাতে কথাকলিদের বাড়িতে যখন ঢুকল তখন কেরলরাজ্যে অতিমারির ছোঁয়া এসে গেছে, কিছু মানুষ আক্রান্ত – জ্বরকাসি, গলাব্যথা এরপর ফুসফুস সংক্রমণ হয়ে দু’একজন মারাও গেছে।
মরমীর সমস্যাটা অন্য জায়গায় ছিল, এবার তা এই অতিমারির সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল। বাড়িতে তার বৃদ্ধা মা, যিনি তাকে না জানিয়ে বাড়িটা ছেলে নিরাময়ের নামে লিখে দিয়েছেন।
নিরাময় ও তার স্ত্রী বৃন্দা মাকে ভালবাসবার দুর্দান্ত
অভিনয়কলায় মাকে মুগ্ধ করে বাড়িটা হাতিয়ে
নিয়েছে বলা চলে। মরমী একই বাড়িতে আছে, অথচ
তার অজান্তেই ঘটনাটা ঘটে গেছে। ধীরে ধীরে শুরু
হয়েছে সূক্ষ্ম মানসিক নির্যাতন, যা এখন অনেকটা
স্হূলত্বের পর্যায়ে চলে গেছে। এসব এখন হচ্ছে
আকছার, সংবাদমাধ্যমে অসহায় বৃদ্ধ বা বৃদ্ধাকে
রেলস্টশনে বা রাস্তার পাশে রেখে চলে যাচ্ছে
সন্তানরা – এগুলো দেখে আঁতকে ওঠে মরমী।
এখন মার্চ মাস। শীত বিদায় নিয়েছে – বাতাসে
বসন্তকালীন পেলবতা। কথাকলিদের ছাদবাগানে
বাহারি ফুল।
কথাকলি ও মরমী মুখোমুখি এখন।
-কথা, “দিনশেষে” তে দুটো মানুষের জন্যে ব্যবস্থা
করে দিতে হবে। আমি ও মা।
– মোটেই না। নিজের বাড়ি ছেড়ে কোত্থাও যাবে না।
প্রশ্নই ওঠে না। দরকার হলে ওরা বেরিয়ে যাক।
আইনি ব্যবস্থা নেবে। এখন এসব নিয়ে একদম
ভেবো না। মাসিমা না বুঝে কাজটা করেছেন
অথবা নিরাময়দা জোর করে লিখিয়ে নিয়েছে।
এসবের জন্যেও আইন আছে। আপাতত
ব্যাপারটাকে আরও এগোতে দাও।
“দিনশেষে” একটি বৃদ্ধাবাস। একটি এন জি ও
“প্রত্যয়” সেটি চালায়। “প্রত্যয়” এর কার্যকরী
সমিতির সক্রিয় সদস্যদের অন্যতম হচ্ছে কথাকলি মরমীও আছে সাধারণ সদস্য হিসেবে।
-করোনা ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দেখতে পাচ্ছ?
ইতালির অবস্থা দেখছ? এদিকে আমাকে ক’টা
দিনের জন্যে দিল্লি যেতে হচ্ছে।
-এখন দিল্লি যাবি? অনেকদেশে যে লকডাউন দিয়ে দিচ্ছে রে। এখন না যাওয়াটাই ভালো ।
-হ্যাঁ, স্বপ্নিল আমাকে যেতে বারণ করছে। কিন্তু
আমাকে যেতেই হবে। আকাশদের ইস্কুলবাড়ির
জন্যে কিছু টাকা স্যাংশন হয়েছে। আমার যাওয়াটা
খুব জরুরি।
-কিন্তু যাওয়ার পর যদি লকডাউন হয়ে যায়?
-ধুর। এমনটা হয় নাকি? স্বপ্নিলও তাই বলছিল।
একদম অ্যাবসার্ড কথা। একটা সময় তো দেবে।
কোনকালে শুনেছ সব পরিবহন অনির্দিষ্টকালের
জন্যে বন্ধ হয়ে যাবার কথা? এমনটা হয় না। আরে
এতে দেশের অর্থনীতি বিকল হয়ে যাবে।
-হয়নি। তবে এবার হয়ত হবে। বিদেশে যেটা হয়ে
যাচ্ছে সেটা এ দেশে হবে না এমন ভাবার কোনও
কারণ নেই। এখন যাস না কথা।
-অত ভেবো না তো। অতীশমামু সব ব্যবস্থা করে
রেখেছে। ১৮ ই মার্চ আমার টিকিট কেটে রাখা।
আকাশদের জন্যে একটা ইস্কুলবাড়ির স্যাংশনটা
যদি বের করে আনতে পারি তাহলে ভাবতে
পারো? আমাদের ইস্কুলটা দাঁড়িয়ে যাবে।
কথাকলির বয়েস আর কত হবে? এই ছাব্বিশ /সাতাশ। এন জি ও র কাজে রীতিমত পোক্ত হয়ে গেছে।
তাদের এন জি ও “প্রত্যয়” এর ব্যবস্থাপনায় পথশিশুদের নিয়ে একটা ইস্কুল চলছে। নিজেরাই ক্লাস নেয় তারা স্বপ্নিল, কথাকলি, মরমী আরও দু’চারজন। এই বাচ্ছাগুলোর একটি নিজস্ব ইস্কুলবাড়ি হলে আর চিন্তা নেই। ঐ পোড়োবাড়িতে রাতে যত সমাজবিরোধীদের আড্ডা। অনেক কষ্টে ওদের কিছু অর্থদন্ড দিয়ে তারপর ক্লাস করানোর ব্যবস্থা করা গেছে। ওদের বাগে আনতে এখনও কিছু কম কসরৎ করতে হয় না।
বাড়ি ফিরে মরমীর মনে হল, আলবেয়ার কাম্যুর “দ্য প্লেগ “ উপন্যাসটি আরেকবার পড়তে হয়, তার আলমারিতে বইটি আছে।মহামারী সম্পর্কে একটা আগাম ধারণা থাকা দরকার। সেভাবে মহামারী তো তারা দেখেনি। “ইবোলা” নামে একটি ভাইরাসের কথা পত্র পত্রিকায়, নিউজ চ্যানেলে শুনেছে। কিন্তু ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে সেটিকে নাকি অনেকটা বাগে আনা গেছে।
ঘরে ঢুকে দেখল মা কাঁদছে। এই এক হয়েছে আজকাল। সারাক্ষণ বাড়িতে এক অশান্তির পরিবেশ। একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ, সেটা তৈরি করে রেখেছে ছোটভাই এর বৌ বৃন্দা ও ছোটভাই নিরাময়। নিরাময় বাড়িতে ফেরার পর তা আরও বেড়ে যায়। বিচ্ছিরি আকার ধারণ করে। রাতের খাওয়া আজকাল আর একসাথে হয় না। ওদের খাওয়া শেষ করে ওরা সব কিছু গুটিয়ে নিয়ে তারপর যখন শুতে যায় তখন মরমী মাকে নিয়ে খেতে বসে। এমনটা আগে ছিল না, দিনের পর দিন তা বাড়ছে, বিচ্ছিরি আকার নিচ্ছে। মা-কে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস না করেই মরমী “দ্য প্লেগ” খুঁজছে। খুঁজতে খুঁজতে টের পেল মা-র ফোঁপানো কমে এসেছে। কিছু কিছু অস্বস্তিকর অবস্থা এভাবে এড়িয়ে গেলে দিব্যি রেহাই পাওয়া যায় অন্তত কিছুটা সময়ের জন্যে। বইটি অতঃপর খুঁজে পাওয়া গেল, আর খুলতে গিয়ে একটি চারভাঁজ করা কাগজ মেঝেতে পড়ল, ঝুঁকে কাগজটাকে তুলে বইটা হাত থেকে রেখে কাগজটার ভাঁজ খুলতেই দেখল হলদে হয়ে যাওয়া পুরনো চিঠি-

ক্রমশ..

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।