গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা ভারত চন্দ্র রায়
বীর মুক্তিযোদ্ধা ভারত চন্দ্র রায়, এফ.এফ. ভারতীয় তালিকা নম্বর-৩৯৩৭৪, গেজেট নম্বর-লালমনিরহাট সদর-৪১৫, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০১১৪০১০০৬৯, মোবাইল নম্বর-০১৭২৫১৮১৮৮৮, পিতা ঃ সতীশ চন্দ্র রায়, মাতা ঃ সন্ধ্যা রায়, স্থায়ী ঠিকানা ঃ গ্রাম ঃ নাগেশ্বরী মাষ্টারপাড়া, ডাকঘর ও উপজেলা ঃ নাগেশ্বরী, জেলা ঃ কুড়িগ্রাম। বর্তমান ঠিকানা ঃ গ্রাম ঃ শিবরাম, ডাকঘর ঃ বড়বাড়ি, উপজেলা ও জেলা ঃ লালমনিরহাট।
পাঁচ ভাই তিন বোনের মধ্যে ভারত চন্দ্র রায় ছিলেন সবার বড়। ১৯৭১ সালে নাগেশ্বরী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০ম শ্রেণিতে পড়াশুনা করতেন। ফুটবল খেলার প্রতি তার ছিল প্রবল ঝোঁক। দয়াময়ী স্কুলে ২৪ জন ছাত্রের দুটি ফুটবল টীম ছিল। প্রতিদিন ক্লাশ শেষে স্কুল মাঠে তারা ফুটবল খেলায় মেতে উঠতো। ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পর থেকেই দেশের অবস্থা উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আহুত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করার সাথে সাথে সারা বাংলাদেশের মানুষ একযোগে রাস্তায় নেমে এসে সরকারের বিরুদ্ধে প্রচন্ড গণআন্দোলন শুরু করেন। দেশের এহেন টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুকে মোকাবেলার আহবানের সাথে সাথে সাথে বজ্র কন্ঠে ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে দয়াময়ী হাই স্কুল ফুটবল টীমের ২৪ জন ছাত্রের মধ্যে ভারত চন্দ্র রায়সহ ১৪ জন এলাকায় এলাকায় ঘুরে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে প্রচার কাজ শুরু করে দেন। ২৫ মার্চ কাল রাতে আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশের নিরস্ত্র নিরিহ বাঙালিদের উপর আক্রমণ করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা ও সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ শুরু করে। সেদিন রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর পরই তিনি পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেফতার হন। তিনি গ্রেফতার হলেও তার ঘোষণা অনুযায়ী সারা বাংলাদেশে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে ভীত হয়ে কুড়িগ্রাম ও নাগেশ্বরী থানা এলাকার হাজার হাজার জনতার সাথে ভারত চন্দ্রের পরিবারও পার্শবতী দেশ ভারতের দিকে যাত্রা করে। কিন্তু ভারত চন্দ্র পরিবারের সাথে না গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে ফুটবল টীমের সেই ১৪ জন সদস্যের সাথে ভুরুঙ্গামারী সীমান্তে গিয়ে হাজির হন। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান ভুরুঙ্গামারী কলেজ মাঠে সিনিয়র গ্রুপের ছেলেদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যে তাদেরও প্রশিক্ষণ শুরু হয়। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে পাকিস্তানি সেনারা কুড়িগ্রাম থেকে নাগেশ্বরী হয়ে এসে ভুরুঙ্গামারী আক্রমণ করে। তখন রান্না করা খাবার ফেলে রেখে ভারত চন্দ্রসহ সকল প্রশিক্ষনাথর্ী মুক্তিযোদ্ধা সীমান্তের বাগভান্ডার বিওপিতে গিয়ে হাজির হন। সেখান থেকে ভারতের কুচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জে। সাহেবগঞ্জে বেশ কিছু দিন থাকার পর একটা রিক্রুটিং টীপ এসে মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ভারতচন্দ্রসহ প্রায় ২০০ জন যুবককে বাছাই করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ট্রাকযোগে দার্জিলিং জেলার মুজিব ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়।
সেখানে ৩০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করে তাদের জলপাইগুড়ি জেলার চাউলহাটি সীমান্তে প্রেরণ করা হয়। সেখানে তারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর শঙ্কর সিংয়ের অধীনে যুদ্ধ করতে শুরু করেন। এই সময় মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি চাউলহাটি থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন শত্রুক্যাম্প আক্রমণ করে আবার নিজেদের ক্যাম্পে ফিরে আসতেন। এই সময় তারা ওমরখানা ও জগডল পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পের উপর আক্রমণ পরিচালনা করেন। আগষ্ট মাসে মাহবুল আলমের নেতৃত্বে ভারত চন্দ্রদের গ্রুপটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে প গড়ের পেয়াদাপাড়ায় সেল্টার গ্রহণ করেন। সেখানে এসে তারা প্রথম প্লাস্টিক এক্সপ্লোজিভ দিয়ে প গড় সদরের বিশমনি ও তালমা সড়কসেতু ধ্বংস করেন।
ওমরখানা পাকিস্তানি বিওপি আক্রমণ ঃ ওমরখানা বিওপিতে পাকিস্তানি সেনাদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। ভারতচন্দ্রদের মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের অবস্থান ছিল সেখান থেকে ৪ কিলোমিটার পূর্বে পেয়াদাপাড়ায়। এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। ভারত চন্দ্র কাট-অফ গ্রুপে অন্তভর্ূক্ত হয়ে ওমরখানা থেকে প গড় টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করার পর সঙ্কেত দেওয়ার সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধারা শত্রু ক্যাম্পের উপর প্রবল আক্রমণ শুরু করেন। প্রায় ৩ ঘন্টা যুদ্ধে শত্রুদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করার পর তারা নিজেদের ক্যাম্পে ফিরে যান। ডিসেম্বর মাসে নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হলে মাহবুব আলমের নেতৃত্বে ভারত চন্দ্রদের মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি শত্রুসেনাদের সাথে সন্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এই সময় জগডল, ময়দানদীঘি, বোদা হয়ে সৈয়দপুরের পাশের ১০ মাইল দখল করার পর তাদের যুদ্ধ শেষ হয়। তার মাত্র কয়দিন পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। যে দেশের স্বাধীনতার জন্য ভারত চন্দ্র রায় জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের জানাই সংগ্রামী সালাম।