গল্পেরা জোনাকি তে রীতা পাল (ছোট গল্প সিরিজ)

অবনি বাড়ি আছো
অবনি বাবুর স্বভাব রাতে শোবার আগে পেপারে আর একবার চোখ বোলানো। এমন সময় দরজায় কড়ানাড়া-
-অবনি বাড়ি আছো?
এতো রাতে কে,আস্তে করে দরজাটা খুললেন। ঘরের মধ্যে পিল পিল করে কারা যেন ঢুকে গেল।
-তোমরা কারা?কোথা থেকে আসছ?তোমরা অমন বিদঘুটে পোশাকে ঢাকা কেন?
-আমরা অন্য গ্রহের মানুষ।
-ও ,তা আমার এখানে কি?বলেই বলেন,আমার বেশ ভালো লাগছে তোমরা বাংলা ভাষায় কথা বলছ। অন্য গ্রহের মানুষ বাংলা জানে আর আমার পৃথিবীর মানুষ দু-পাতা ইংরেজী পড়ে মাতৃভাষা ভুলে যায়।
-আপনি এখন পৃথিবীতে নেই।
-মানে,এই তো রাতের খাবার খেয়ে পেপার পড়ছিলাম নিজের বাড়িতে।
-না পৃথিবী এখন সীমারেখা টেনে দিয়েছে। শনির সাথে সংঘর্ষে একটা ছায়া পথ তৈরী হয়েছে। আপনার বাড়িটি যেখানে ছিল সেখানেই আছে, আপনি অন্য গ্রহের মধ্যে চলে এসেছেন।
-ইয়ারকি হচ্ছে? আমি অন্য গ্রহে?
অবনি বাবু প্রচন্ড রেগে গেলন। একজনের পোশাক ধরে টান দিলেন। দেখলেন পোশাকে লেখা নং ১।
একসাথে সবাই সাপের মত হিসহিস্ করে উঠল। অবনি বাবু ভয় পেয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন।
-পোশাক টেনে আমাদের মুখোশ খোলার চেষ্টা করবেন না। এর ফল ভালো হবে না।
এইবার অবনি বাবু হেসে উঠলেন। এ দেখে দেখে আমি অভ্যস্ত । তবে হ্যাঁ সুন্দর মুখের আড়ালে মুখোশ ।
-তা নং ১ আমি কি করলে পৃথিবীতে ফিরে যাবো। আচ্ছা, আমি কি মরে গেছি?তোমরা কি যমদূত?তোমরা কি আমাকে নিতে এসেছ?
-আমরা আপনাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেব।
অবনি বাবু ভাবলেন,এদের যতটা খারাপ ভেবেছিলাম ততটা নয়। যাকবাবা মানে মানে বাড়ি ফিরতে পারলেই হলো।
-আসুন—–
-ও কি এতো আগুন কেন ?এ কি এরা সব ঘরদোর পোড়াচ্ছে কেন?এরা কারা ?-এই মেরোনা ও তো শিশু,ও তো কোনো অন্যায় করে নি–এইভাবে মানুষ মানুষকে কচুকাটা করছে,এ হতে পারে না। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন এ আমার পৃথিবী হতে পারে না। আমার পৃথিবীতে বিশ্বাস,ভালোবাসা,মায়া -মমতা ,আশা সব সব আছে, এ আমার পৃথিবী নয়।
অট্টহাসি হাসতে লাগলো সবাই,ওটাই তোমাদের পৃথিবী ।
-আপনি জানেন না, বিশ্বাস দা মারা গেছে- হা হা হা।ভালোবাসা হারিয়ে গেছে আর মায়া- মমতা গাঙের জলে ভেসে গেছে–হা হা হা।
অবনিবাবু কোন কথা না বলে অন্য দরজা দিয়ে পালাতে গেলেন–হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন।বৃষ্টিতে সারা শরীর ভিজে গেছে। বিদ্যুৎ চমকাতেই দেখতে পেলেন লাশের স্তুপে পড়ে আছেন। কত মানুষ এই সব লাশ মারিয়ে ছুটে চলছে একটু আশ্রয়ের জন্যে। তিনি পারলেন না আবার পিছনে ফিরে এলেন। মনে পড়ে গেল ঘরে স্ত্রী ,পুত্র,নাতি নাতনী।
-ফিরে এলেন ? কিন্তু এখানে তো আমরা আপনাকে থাকতে দিতে পারি না। এটা একটা শরনার্থি শিবির।
-না না আমি আমার পরিবার কে নিতে এসেছি। তাদের নিয়েই আমি চলে যাব।
-কোথায় যাবেন ?
-অন্য পৃথিবীতে যেখানে এখনো আশা বেঁচে আছে। এখনও মানুষ মানুষের জন্যে নিজের জীবন দিতেও কুণ্ঠা বোধ করে না- সেই পৃথিবীতে।
-ওরাও আপনার মতো আশ্রয় খুঁজতে চলে গেছে।
অবনিবাবু আর পারছেন না, নাতি নাতনীর জন্যে বুকটা হু হু করতে লাগল। মাটিতে বসে পড়লেন।
-কতক্ষন বসে থাকবেন ?
-আমাকে আমার পৃথিবীতে ফিরিয়ে দাও।
ছায়াপথ ধরে হেঁটে চলেছেন অবনি—–
-কোথায় বাড়ি, সব পুড়ে ছাই । তারমধ্যে ঝলষানো কিছু হাড়-গোড়। এখনো জ্বলছে নীল নীল কটা অগ্নিশিখা।
আবার কটা মুখোশধারী,-এই এখান থেকে যাও নাহলে মৃত্যু অনিবার্য।
অবনিবাবুর আশাও শেষ,চোখ দিয়ে ঠিকরে পড়ছে আগুন ,গগনবিদ্বারী চিৎকার করে বল্লেন,-“বলতে পার আমি কোন পৃথিবী তে যাব?এতো বড় পৃথিবীতে আমাদের জায়গা কই?”
—ও খোকা,শিকগিরী আয়, তোর বাবা কেমন করছে। কতবার বলেছি পেপার নিয়ে চেয়ারে ঘুমিও না।
অবনি বাবু আস্তে আস্তে চোখ খুললেন। নতুন সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়েছে মুখে। শরতের সাদা মেঘে এক ঝাঁক পায়রা ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে।
নিচে লোহার গেট খোলার শব্দ
“অবনি বাড়ি আছো”