সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ৯১)

সোনা ধানের সিঁড়ি
১৩০
বেশ কয়েকবছর আগেকার কথা। কোনো একদিন সকালে আমার এক পুরানো চেনা মানুষকে প্রায় একবছর পরে ফোন করি। ফোন ধরেই তার একের পর এক অভিযোগ – “কী ব্যাপার এতদিন পরে বন্ধুকে মনে পড়ল? তোরা সবাই এক একজন স্বার্থপর! সবাই দরকারে ফোন করিস তোরা” ইত্যাদি ইত্যাদি। অদ্ভুত লাগলো একটা ব্যাপার দেখে, এতদিন পরে ফোন করছি অথচ ফোন ধরেই শুধু অভিযোগ! মুখোমুখি সাক্ষাৎ হওয়া, ফোনে কথা বলার পরেই কি দুটো মানুষ মনে মনে মারা যায়। অসাক্ষাৎ -এ তারা কেউ কাউকে মনে করে না। তাদের কোনো স্মৃতি নেই? তাদের কাটানো সময় নিয়ে তারা ভেতরে ভেতরে আলো হয়ে যায় না?
ফোনের এপ্রান্তে আমি চুপ। অপেক্ষা করছি ওপ্রান্তে কখন অভিযোগের প্রাবল্য কমে আসে। একসময় সে চুপ হল। আমি বললাম – “ফোনটা তো তুইও করতে পারতিস। সেদিক থেকে তো কোনো বাধা ছিল না। এবার একটু অন্যদিক থেকে ভাব, এতদিন পরে আজ সকাল থেকে শুধু তোর কথাই মনে পড়ছিল। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে কত কত মানুষ থাকে, তাদের সকলকে সরিয়ে দিয়ে আজ সকাল থেকে শুধু তুই মনে উঠে এলি! আর তাই তো তোকে ফোন না করে পারলাম না। এটা কি একটা মানুষের কাছে বড় পাওয়া নয়?”
ওপ্রান্ত তখন গলে জল। একটু আগের চিৎকার এখন শোনাই যাচ্ছে না এমন আস্তে হয়ে গেছে গলা – “আসলে আমি এতটা ভেবে দেখিনি। আমি আমার আচরণের জন্যে ক্ষমা চাইছি।”
সত্যিই আজ ভাবার মানুষ কমে গেছে। আজকের এই উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগে মানুষ সবকিছুকে মুহূর্তের মধ্যে কাছে পেতে চাইছে। ভাবার সময় কোথায় তার। শুধু দৌড় আর দৌড়। আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের কাছে গল্প করি – স্কুল কলেজের পড়ার সময়ে সবাই সবাইকে দেখতে পাচ্ছে কিন্তু যেই ছুটি পড়ে গেল অমনি সকলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ। যতক্ষণ না তার বাড়িতে যেতে পারছি। আজকের ছেলেমেয়েদের মতো হুটহাট বাবা মাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বন্ধুর বাড়ি চলে যাওয়া তখন সম্ভব ছিল না। তাই বন্ধুরা তখন আমাদের মনের মধ্যে চলাচল করত। মনে মনে তাদেরকে ডেকে নিয়ে এসে আড্ডা শুরু করতাম। না, স্কুল কলেজ খোলার পর আমরা একে অপরকে বুকে টেনে নিতাম। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না।
আর আজকের ছেলেমেয়েরা কেউ কাউকে চোখের আড়াল করে না। এরজন্য তাদের অবশ্য কোনো ভূমিকা নেই। আজকের সময়ই তাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছে। এখন একটা ছেলে বা মেয়ে যখন রাতে শুতে যাচ্ছে তখনও সে তার প্রিয়জনের কন্ঠ শুনে তবে চোখ বুজছে। তারা তাদের মানুষদের নিয়ে ভাবার সময় পাচ্ছে কোথায়! আর যেহেতু তারা মনকে গুরুত্ব দিচ্ছে না তাই তারা সবাই চোখের আড়াল না হলেও মনের আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
আমার জীবনে এখনও কয়েকজন কাছের মানুষ আছে যাদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হয় না। ব্যস্ততার জন্যে খুব বেশি কথাও হয় না। অথচ দেখা হলে মনে হয় গতকালই আমাদের দেখা হয়েছে। এমনকি কখনও কখনও মনে হয় মুহূর্ত আগেও আমাদের দেখা হয়েছে। কিন্তু এরা কেউই আমার ছোটোবেলার বন্ধু নয়। কত তৈরি মানুষ এরা। এদের জন্যে আমার গর্ব হয়।