দেশ-অন্তর সংসর্গ তে বিপ্লব গোস্বামী (আসাম)

কাকতাড়ুয়া
মহামারির জন্য প্রায় বছর দিন থেকে পুচকি ও গুড্ডুদের স্কুল বন্ধ।লকডাউনের জন্য শহরে গৃহবন্দী জীবন কিছুতেই কাটছিল না পুচকি-গুড্ডুদের।ছেলে ও মেয়ে দু’জনেই একেবারে যেন মনমরা হয়েগেছে।ঘরে বসে টিভি দেখে যেন সময় কিছুতেই কাটছে না।একদম একঘোয়ে হয়ে যাচ্ছে দুজন।জলের মাছ ডাঙ্গায় তুললে যেমন হয় ঠিক তেমনই অবস্থা তাদের।পুচকিদের এমন অবস্থা দেখে পুচকির বাবা খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন।পুচকির মা দু’জনকে তাদের মামার বাড়িতে নিয়ে রেখে আসার পুচকির বাবাকে বলতে লাগলেন।পুচকির বাবা এই সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানালেন।সিদ্ধান্ত মত পুচকির বাবা পুচকি ও গুড্ডুকে তাদের মামা বাড়ি রেখে এলেন।
পুচকিদের মামাবাড়ি এক প্রতন্ত গ্ৰামে।শহর থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে হবে।গ্ৰামটি চারদিক দিয়ে পাহাড়ে ঘেরা।যে দিকে চোখ যায় সেদিকেই শুরু সবুজ বনানী।গ্ৰামের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে একটি পাহাড়ি নদী।বৃষ্টি দিলে নদীটি যৌবনে ভরে উঠে।আবার ঘন্টা কয়েক পর আবার আপন অবস্থান ফিরে যায়।গ্ৰামটির প্রকৃতির দৃশ্য বড় মনোহর।সকাল হতেই গাছে গাছে শুরু হয় রকমারি পাখির আনাগোনা।আর সারাদিন শুনা যায় বিরামহীন পাখির কূজন । রাতে শুনা যায় নিশাচর পাখিদের চিৎকার।বৃষ্টি হলে রাতে ব্যঙের ঘেঙর ঘেঙর শব্দে পিচকিদের ঘুম হয় না।পুচকি ও গুড্ডু এখানে এসে আনন্দে আত্মহারা।প্রথম দু-এক দিন কিছুটা অসুবিধা হলে দেখতে দেখতে মিশে গেছে গ্ৰাম বাংলার প্রাকৃতির পরিবেশে সাথে।আপন করে নিয়েছে গ্ৰামের মাঠ-ঘাট-নদি-নালা আর সম বয়সীদের। শুধু খেলা আর খেলা।এখন আর খাওয়া দাওয়ার কোন ঠিক নেই।আনন্দে তারা এতোই আত্মহারা হয়ে গেছে যে বাবা মায়ের কাছে ফোন করার কথাও ভুলে যায়।এখন বাবা-মাকে আগে থেকে ফোন করে খোঁজ নিতে হচ্ছে।খাঁঁচায় বন্দি পাখি বন্ধন মুক্ত হলে যেমন হয় পুচকিদের অবস্থাও ঠিক তেমনই।সারা দিন খেলা আর প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করে কিভাবে যে দিন চলে যাচ্ছে বুঝতেই পারেছে না তারা।
এভাবেই হাসা-ঠাট্টা, হই-হোল্লোড় আর আনন্দে কাঠছিল পুচকি-গুড্ডুর দিন।কিন্তু হঠাৎ একদিন সন্ধ্যেবেলা বড় মামার সবজি ক্ষেতে বেড়াতে গিয়ে ঘটল এক অঘটন।বেড়াতে বেড়াতে দুজন পৌঁছে গেল বড় মামার সবজি খেতে।তখন সূর্যাস্তের সময়।ক্ষেতের ঠিক মাঝখানে ভূতকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে পুচকি ও গুড্ডু ভূত ভূত বলে চিৎকার করতে লাগল।সঙ্গে সঙ্গে দুজনের জ্বর এসে গেল।পুচকিদের দিদা ভয়ে অস্থির।পুচকির মামাদেরকে কবিরাজ ডেকে আনার জন্য বার বার বলতে লাগলেন দাদু দিদি।কিন্তু মামারা তেমন পাত্তা দিচ্ছিলেন না।উল্ট বড় মামা রেগে বললেন আমি তো দিন রাত খেতে কাজ করি কোন দিন তো ভূত পাইনি।কোন কিছু দেখে হয় তো ভয় পেয়ে গেছে।তা অমনিই ঠিক হয়ে যাবে।দিদা কবিরাজের জন্য নাছোরবান্দা হয়ে উঠলেন।অবশেষে দাদু গিয়ে কবিরাজ মশাইকে নিয়েই এলেন।
কবিরাজ বাড়িতে এসে পুচকিদের দেখেই বলতে লাগল,” ভূত নয় ভূত নয় , জ্বীন ধরেছে দুজনকে ! এ কোন সামান্য জ্বীনে ধরেনি, অনেক বড় জীনে ধরেছে ওদেরকে ।
দাদু দিদার ভয়ে গলা শুকাতে লাগল।দিদি কবিরাজকে বলতে লাগলেন ,”আমার দাদুভাই আর দিদিভাই ভালো হবে তো কবিরাজ মশাই ? আপনি যে ভাবেই হোক আমার নাতি-নানতীকে ভালো করে দিন।”
অনেক অনুরোধ করার পর কবিরাজ বলল,” এ এত সহজ কাজ নয়।এর জন্য অনেক কিছু করতে হবে।রাজি হলে দেখতে পারি।যা বলব তা পারবে তো এনে দিতে ?”
দাদু বললেন ,”আমার নাতি-নাতনিদের জন্য আমি সব করতে রাজি আছি।আপনি শুধু একবার বলুন কি করতে হবে।”
গম্ভির সরে কবিরাজ বলল,” জ্বীন নামাতে হবে।পারবী তো জ্বনীর খাদ্য যোগার করতে ?
দিদা বললেন,” পারব কবিরাজ মশাই পারব।আপনি শুরু বলুন কি কি লাগবে।”
কবিরাজ বলল, “হুম, বলছি জ্বীন নামাতে লাগবে একটা কালো পাঠা, লাল শালু,একজোড়া কবুতর,লাল ফুল,শষ্য কলাই আর মাথার খুলি।এসব যদি যোগার করতে পারিস তবে তবে দেখতে পারি।
দাদু বললেন ,”পারব আমি সব পারব।শুধু মাথার খুলিটা !”
কবিরাজ বলল,”এর জন্য তোর চিন্তা করতে হবে না ।ওটা আমি করে নিবো।”
এই বলে কবিরাজ তার ঝুলনা থেকে একটা খুলি বের করে সামনে রাখল।কবিরাজের কথা মতো সব কিছু জোগাড় করা হলো।জ্বীন নামোনো দেখার জন্য বাড়িতে মানুষের ভীড় লেগে গেল।রাত বারোটায় জ্বীন নামনো শুরু হলো।জ্বীন যাওয়ার চিহ্নিনও পাওয়া গেল।আম গাছের ডাল ভেঙ্গে চিহ্ন রেখে গেল।জ্বীন নামানোর পর পুচকি গুড্ডু দুজনেই ভালো হয়ে গেল।কবিরাজ মশাই একহাজার একটাকা দক্ষিণ আর কালো পাঠা নিয়ে চলে গেলেন তার বাড়িতে।যাওয়ার সময় বলে গেলে খুব সাবধানে থাকবি ।জ্বীনে কিন্তু আবারও ধরতে পারে।
পিয়াদের ছোট মামা সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক।তিনি ভূত প্রেত, ,জ্বীন ওসব বিশ্বাস করেন না।কবিরাজের ভূত নামানোকে তিনি নিছক ভেলকি বলে তাচ্ছিল্য করছিলেন।একথা শুনে শুনে পুচকির দাদু-দিদা খুব ভৎসনা দিলেন তাকে।পুচকির বাবা ফোন করে ছোট মামাকে বলেন, “শালাবাবু মাস্টার হয়েগেছে বলে ,এখন আর ভূতকে অবিশ্বাস করে না।”
দিদি বললেন,”ভূত যদি নেই তবে কবিরাজ নামালোটা কি? আর দাদুভাইদের জ্বরটা সারল কি ভাবে ?
ছোট মামা মায়ের মুখের উপর তর্ক না করে নীরবে বসে থাকলেন।তিনি পুচকি ও গুড্ডুকে নিয়ে বড় মামার সবজি খেতের দিকে রওয়ানা দিলেন।পুচকি-গুড্ডু তো ভয়ে নাজেহাল।মামা দুই হাতে দুজনকে ধরে এগোতে লাগলেন।আর বলতে লাগলেন কোথায় তোরা ভুত দেখেছিলে।যত এগোতে লাগলেন পুচকি-গুড্ডু ভয় ততই বাড়তে লাগল।খেতে প্রবেশ করতেই পুচকি-গুড্ডু বলতে লাগল মামা ঐ দেখ মাঠের মধ্যে ভূত দাড়িয়ে আছে।দুজনেই চিৎকার করতে লাগল আর পালাতেও চাইল।মামা দুজনকে আরো জোড়ে আগলে ধরে বলতে লাগলেন আমাকে দেখা ভূত কোথায়।দুজন এক সঙ্গে আঙ্গুল দিয়ে দেখালো ঐ যে দাঁড়িয়ে আছে।মামা দেখলেন ওরা মাঠা দাঁঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়ুয়াকে দেখাচ্ছে।মামা উচ্ছ স্বরে হাসতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন ঐ বুঝি তদের ভূত।এ তো হচ্ছে কাকতাড়ুয়া ।এ রকম কাকতাড়ুয়া আমাদের গ্ৰামের প্রতিটি সবজি ক্ষেতে দেখতে পাবে।সবজি ক্ষেতে যাতে পাখি ও পশুরা সবজির কোন ক্ষতি না করতে পারে সেজন্য মাঠের মাঝখানে কাকতাড়ুয়া রাখা হয়।