ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৩৬)

সুমনা ও জাদু পালক

অদৃশ্য কন্ঠের নির্দেশ মতো সমস্ত প্রস্তুতি নেওয়া হলো। সেনাপতি ঈগলের নির্দেশে সমস্ত পক্ষী সেনারা দ্রুতগতিতে শুকনো ডালপালা এবং লতাপাতা জোগাড় করে পাহাড়ের উপরে সবুজ গাছটার চারিদিকে বৃত্তাকারে সাজিয়ে দিল।
খবর দেওয়া হলো সবুজ পাখির দ্বীপের প্রাজ্ঞ চিকিৎসক বৈদ্যরাজ ‘মহাশ্যেন’ কে।তিনি সযত্নে আগুনের বন্দোবস্ত করে নির্দিষ্ট ক্ষনের জন্য পাহাড়ের মাথায় অপেক্ষা করতে থাকলেন।

গুহার ভিতরে যাতে আলোর অভাব না হয় তাই খবর দেওয়া হলো সবুজ পাখির দ্বীপের রানীর বান্ধবী নৈশ বিহারী খদ্যোত রানীকে । সে তার দলবল নিয়ে এসে গুহার এক কোণে উড়ে বেড়াতে লাগল।আলোকোজ্জ্বল হয়ে গেল গুহা।
অশ্ব ‘দুধরাজ’ এলো গুহার অভ্যন্তরে। অদৃশ্য কন্ঠের নির্দেশমতো সুমনা ঘোড়ার পিঠে চেপে হাসিখুশি দ্বীপে ঘুমন্ত রাজপুরীর শিব মন্দির থেকে সংগৃহীত একটি বিল্বপত্র হাতে নিয়ে নাগের আগমনের প্রতীক্ষায় গুহার প্রবেশদ্বারের দিকে তাকিয়ে রইল।

ধীরে ধীরে সবুজ পাখির দ্বীপে সূর্যের আলো কমতে কমতে এক সময় ঝুপ করে নেমে এলো অন্ধকার। সেনাপতি ঈগল তার দলবল সহ গুহায় ঢোকার মুখের দুপাশে উঁচু গাছে বসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে থাকলো চতুর্দিকে। ঘুম নেই কারো চোখে। রাত গভীর হলো। সবুজ পাখির দ্বীপের একমাত্র বৃদ্ধ শৃগাল ‘মহাশিবা’ উচ্চৈঃস্বরে রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর ঘোষণা করল। ‘মহাশ্যেন’ অগ্নিসংযোগ করলেন পাহাড়ের মাথায় বৃত্তাকার রাখা শুকনো ডাল পালায়। আগুন জ্বলে উঠলো দাউ দাউ করে। সেই আলোতে চতুর্দিক আলোকিত হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পরে পাহাড়ের মাথায় এসে উপস্থিত হলো তিন মাথাওয়ালা বিশাল লম্বা এক নাগিনী। পাহাড় চূড়ায় আগুন দেখে সে প্রথমটা থমকে গেল। তারপর আগুন কে পাশ কাটিয়ে ধীরে ধীরে নেমে এলো নিচে। তাকে দেখামত্র
সেনাপতি ঈগল ও তার দলবল একসঙ্গে তীব্র জোরে চিৎকার করতে লাগল। সেই আওয়াজ পৌঁছে গেল গুহার ভিতরে। সতর্ক হলো সুমনা।
ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল সবুজ পাখির দ্বীপের রাজা ও রানী।

পাখিদের চিৎকার শুনে খুব বিরক্ত হল তিন মাথাওয়ালা নাগিনী। সে সজোরে নিক্ষেপ করল তীব্র বিষ। সেই বিষের ধোঁয়ায় চারিদিক আচ্ছন্ন হয়ে উঠল। গাছের ডালে বসে থাকা পাখিরা জ্ঞান হারিয়ে পাকা ফলের মতো টুপটাপ করে পড়ে গেল মাটিতে। সেনাপতি ঈগল দ্রুতবেগে উপরে উঠে গিয়ে বিষের প্রভাব থেকে রক্ষা করল নিজেকে।
প্রচন্ড ক্রুদ্ধ হয়ে নাগিনী এবার এগিয়ে চলল গুহার দিকে। গুহার ভিতরে ঢুকেই সে দেখতে পেল অশ্বারূঢ়া সুমনাকে। প্রচন্ড রাগে তীক্ষ্ণ হিস হিস শব্দে ভরিয়ে দিল গুহা। সুমনা ভীত হয়ে পড়লো। অদৃশ্য কন্ঠ বললো, কোন ভয় নেই। তুমি শক্ত হাতে ধরে রাখ বিল্বপত্র।
নাগিনী এবার তিনটি মুখ দিয়ে বিষ ছুঁড়তে শুরু করল। আর সঙ্গে সঙ্গে সুমনার হাতে ধরা বিল্বপত্র আকারে বিশাল হয়ে সুমনার সামনে ঢালের মতো হয়ে দাঁড়াল। নাগিনীর ছোঁড়া
বিষ সেই বিল্বপত্র ভেদ করে সুমনার কাছে না এসে ফিরে গেল নাগিনীর কাছে। নিজের ছোঁড়া তীব্র বিষের ধোঁয়ায় নাগিনী নিজেই ছটফট করতে থাকলো।
আর ঠিক সেই সময়ে অদৃশ্য কন্ঠ বলে উঠল, সুমনা ,তোমার হাতে ধরা বিল্বপত্র ওই নাগিনী কে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ কর। সুমনা অদৃশ্য কন্ঠের নির্দেশ পালন করল। আর কী আশ্চর্য! সুমনার ছোঁড়া সেই বিল্বপত্র ত্রিশূলের তিনটা ফলার মতো হয়ে যেন নাগিনীর তিনটি ফণাতে চেপে বসল। নাগিনী ছটফট করতে থাকলো। প্রানপনে চেষ্টা করেও ওই অবস্থা থেকে মুক্ত হতে পারল না ।সে প্রচন্ড জোরে লেজ আছড়াতে শুরু করলো। কিন্তু কোনমতেই নাগিনী ওই অবস্থা থেকে মুক্ত হতে পারল না। শেষে পরিশ্রান্ত হয়ে মাটিতে ফণা নামিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ ওই অবস্থায় থাকার পর নাগিনী খুব মৃদু স্বরে কাকুতি-মিনতি করে বলল, হে অশ্বারূঢ়া কন্যা , আমি এই অবস্থায় থাকতে পারছি না । ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার। আমাকে মুক্ত করে দাও।
সুমনা উত্তর দেওয়ার আগেই অদৃশ্য কন্ঠ বলল, ওহে ত্রিফণা নাগিনী, রাজকুমারী রত্নমালা তোমাকে এই অবস্থা থেকে মুক্ত করতে পারেন যদি তুমি তো কয়েকটা শর্ত মেনে চল।
—– আমি সব শর্ত মানতে রাজি আছি। দয়া করে মুক্ত করো আমাকে।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।