সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে কুণাল রায় (পর্ব – ২৪)

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা:

নবম অধ্যায় : ‘রাজবিদ্যা রাজগুহ্য যোগ’ : অন্তিম পর্ব :

ভগবান বললেন তাঁর পরম সখা অর্জুনকে, বহুজন নানা চিন্তায় নিজেদের উৎসর্গ করেন। আবার কেউ কেউ তাঁর বিশ্বরূপের উপাসনা করেন।
তিনি সকল যজ্ঞের আদি পুরুষ। তিনি পিতৃ পুরুষের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ এবং অন্যান্য কর্ম। তিনি রোগ নিবারক ভেষজ। তিনি মন্ত্র। তিনি হোমের ঘৃত। তিনি অগ্নি। তিনি হোমক্রিয়া। তিনি এই ব্রহ্মাণ্ডের পিতা, মাতা, বিধাতা এবং পিতামহ। তিনি বস্তু, শোধনকারী ও সকল মঙ্গলের আদি স্রোত। তিনি বেদের মধ্যে সাম। তিনি তাপ প্রদান করেন। বৃষ্টি বর্ষণ করেন। আকর্ষণ করেন। তিনি জন্ম ও মৃত্যু। জড় ও চেতন – উভয়ই তাঁরই মধ্যে বর্তমান। যাঁরা বেদে নিহিত জ্ঞান সম্পূর্ণ রূপে লাভ করেছেন তাঁরা সমরস পান করে সকল পাপ মুক্ত হন। স্বর্গে গমন প্রার্থনা করেন। পুণ্য কর্মকে অবলম্বন করে ইন্দ্রলোকে গমন করেন। পরম স্বর্গসুখ উপভোগ করেন। পশ্চাতে এই মৃত্যুলোকে ফিরে আসেন। এই ভাবেই ইন্দ্রিয়ভোগকারী মনুষ্যগণ বারংবার এই ধরিত্রীতে ফিরে আসেন। অন্যদিকে যে সকল ভক্তবৃন্দ দিবারাত্রি কেবল তারই উপাসনা করেন তিনি তাঁদের সকল স্থাবর, অস্থাবর এবং প্রাপ্ত অপ্রাপ্ত বস্তুর সংরক্ষণ করেন।
অর্জুনকে বললেন যে যার পূজা বা উপাসনা করুক না কেন, প্রকৃত অর্থে তারই ভজনা করে থাকেন। তিনিই সকল যজ্ঞের ভোক্তা ও প্রভু। কিন্তু এই চিরন্তন সত্য অবগত না হওয়ার কারণে মনুষ্য বারংবার এই সংসারূপী সমুদ্রে ফিরে আসে।
দেবতাদের উপাসকেরা দেবলোক প্রাপ্ত হন। পিতৃপুরুষের উপাসকেরা পিতৃলোক প্রাপ্ত করেন। ভূত ও পিশাচের উপাসকেরা ভূতলোক প্রাপ্ত করেন। এবং তাঁর উপাসকগণ তাঁকেই প্রাপ্ত করে এক পরম সৌভাগ্যের অধিকারী হন।
এক বিশুদ্ধ চিত্ত নিয়ে কেউ তাঁকে নৈবেদ্য প্রদান করলে তিনি তা পরম প্রীতি সহকারে গ্রহণ করেন। তাই অর্জুনকে উপদেশ দেন যে তিনিও তাঁর সকল যজ্ঞ, দান ও তপস্যা তাঁর চরণ কমলে অর্পণ করেন। এই প্রকার কর্ম করলে, তিনিই সকল শুভাশুভ কর্ম বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে তাঁকেই লাভ করবেন।
ভগবান সকলের প্রতি সমভাবাপন্ন। কেউ তাঁর প্রীতির বা বিদ্বেষের পাত্র নন। কিন্তু কেউ পরম যত্ন সহকারে তাঁকে উপাসনা করলে, তাঁকেই লাভ করেন। ঈশ্বরও সেই ভক্তের মাঝেই সদা বিরাজ করেন।
তিনি আরো বললেন যে কোন দুরাত্মা তাঁর উপাসনা করে সকল পাপ মুক্ত হন। তিনি এক সঠিক পথের সন্ধান পান। তিনি এক নিত্য শান্তি লাভ করেন। তাঁর ভক্ত কখনও বিনষ্ট হন না। যাঁরা তাঁকে বিশেষ ভাবে আশ্রয় করেন, তাঁরা যেই রূপেই জন্ম নেন না কেন অবিলম্বে পরাগতি লাভ করেন।
তাই অর্জুনকে তাঁর ভক্ত হওয়ার উপদেশ দিলেন। তাঁর নিত্য ভজনা করতে বললেন। তাঁকে প্রণাম করতে বললেন। তাঁর ভাবনায় লীন হয়ে যেতে বললেন। এই সকল ক্রিয়া এই দুঃখময় পৃথিবী থেকে তাঁকে চিরতরে মুক্তি প্রদান করবে। এবং নিঃসন্দেহে তিনি পরমেশ্বরকে লাভ করবেন।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।