সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৫)

হারিয়ে যাওয়া একলব্য
কিন্তু আমাকে কাজ করতে হবে ধীরে ধীরে খুব সন্তর্পনে। যেন দূর্যোধন জানতে না পারে আমার কৌশল। যদি বুঝতে পারে তাহলে সব কাজ ধ্বংস হবে আমার।সেজন্য আমি চুপিচুপি ওই দুর্যোধনের কানে কুমন্ত্রণা দেব আর ধ্বংস করব কৌরবকুল। দূর্যোধন ভাবে নিজেকে বড় পন্ডিত। কিন্তু ওর মত মূর্খ ভূভারতে নেই। দুর্যোধন ভাবে শকুনি মামা আছে।তার চক্রান্তের কারণে ধ্বংস হবে পান্ডবরা।আর বন্ধুর সাহায্যে আমি পাণ্ডব কুলকে ধ্বংস করব। কিন্তু পাণ্ডবকুলে যে শ্রীকৃষ্ণ আছে সে কথা ভুলে গেছে সে। যেখানে ধর্ম সেখানেই জয়, একথাও সে ভুলে গেছে। কর্ণ ভাবেন,সংসারে সং সেজে দিবারাতি নিজেকে ঠকিয়ে কোন ঠিকানায় ঠাঁই হবে আমার ।নিজেকে নিজের প্রশ্ন কুরে কুরে কবর দেয় আমার অন্তরের গোপন স্বপ্ন । জানি রাত শেষ হলেই ভোরের পাখিদের আনাগোনা আরম্ভ হয় খোলা আকাশে । আমার রাধা মা’কে অনেকে অভিশাপ দেয়, আমার কারণে । আমি দেখেছি ধৈর্য্য কাকে বলে । আজ কালের কাঠগোড়ায় তিনি রাজলক্ষ্মী প্রমাণিত হয়েছেন । কালের বিচারক কোনোদিন ঘুষ খান না ।একলব্য ভাবেন, গুরুর বিচারের আশায় দিন গোনে , সব অবিচার ,অনাচার। কড়ায় গন্ডায় বুঝে নেবে আগামী পৃথিবীর ভাবি শিশু। । অপেক্ষায় প্রহর গোনে নিজের অন্তরের প্রদীপ শিখা জ্বালিয়ে । সাবধান খুনীর দল ,একবার হলেও অন্তত নিজের সন্তানের জন্য শান্ত পৃথিবী রেখে যা । ঋতু পরিবর্তন কিন্তু তোর হত্যালীলায় বন্ধ হবে না নির্বোধ ।শান্ত হোক হত্যার শাণিত তরবারি ।নেমে আসুক শান্তির অবিরল ধারা। রক্ত রঙের রাত শেষে আলো রঙের নতুন পৃথিবী আগামী অঙ্কুরের অপেক্ষায়। শিউলি শরতের ঘ্রাণে শিহরিত শরীর। শিউলির মত শিউলি কুড়োনো পাঞ্চালী নামের মেয়েটি আমার ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয়।মনে পড়ে রাজবাড়ির স্বয়ংবর সভায় অপেক্ষা করেও সুযোগ পাই নি জাতবিভেদের জন্য। অপেক্ষায় আছি ঝরা ফুলের দলের মত । সে জানত ফুল ঝরে গেলেও তার কদর হয় ভাবি প্রজন্মের হাতে । সে আমাদের ফুল জীবনের পাঠ শেখায়। মানুষও একদিন ফুলের মত ঝরে যায়। । শুধু সুন্দর হৃদয় ফুলের কদর হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরখ করার সুযোগ মেলে। কিন্তু আমাদের কয়েকজন বন্ধু লোক ব্যাঙ্গের সুরে বলে, বেজাতের ভিমরতি হয়েচে। সখ দেখো এখনও রঙীন স্বপন দেখে । শরীরচর্চা করে, ব্যায়াম করে। তারপর মরে যাওয়ার পড়ে অন্তিম কাজ, নির্লজ্জ ভুরিভোজ। তবু সব কিছুর মাঝেই ঋতুজুড়ে আনন্দের পসরা সাজাতে ভোলে না প্রকৃতি। সংসারের মাঝেও সাধু লোকের অভাব নেই। তারা মানুষকে ভালোবাসেন বলেই জগৎ সুন্দর আকাশ মোহময়ী, বলেন আমার মা। সব কিছুর মাঝেও সকলের আনন্দে সকলের মন মেতে ওঠে। সকলকে নিয়ে একসাথে জীবন কাটানোর মহান আদর্শে আমার দেশই আদর্শ। সত্য শিব সুন্দরের আলো জাতিভেদ ভুলে সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করুক। এসব কথা চিন্তা করত একলব্য, আর পাঁচজন স্বাভাবিক ছেলের মতই।কর্ণকে তার রাধা মা বলেন,বৃষ্টির পরেই রাম ধনু দেখা যায় । দুঃখ শেষে আনন্দ । তেলের পাগলামি যে ভালোবাসে সেই শোভন ।দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে মানুষকে ভালোবাসার নামই জীবন । নর জীবনে নারী ছাড়া জীবন অচল । তবু কেন এত অন্যায় অত্যাচার নারীর উপর । সাধুবেশে নারীদের বিশ্বাস অর্জন করে ন্যায় অন্যায় জলাঞ্জলি দিয়ে কেন তাদের বিশ্বাস হত্যা করা হয় । তারা যে মায়ের আদরের আঁচল । তাদের রক্ষা করার জন্য তৈরি হোক সমস্ত মানবহৃদয় ।কর্ণ ভাবেন,ছোটবেলা যখনই হাঁটতে শেখার চেষ্টা করতাম তখনই মা নিশ্চয় রক্ষা করেছেন। আমি বিপদে পড়েছি রক্ষা পেয়েছি নারী হৃদয়ের কমনীয়তার গুণে ।ভীষণ মানসিক বিপদে ভেসে চলেছিলাম স্রোতের তোড়ে । রক্ষা পেয়েছি মাসির বলিষ্ঠ হাতের আশ্রয়ে । জীবনে জ্বর হয় বারে বারে । সেবা পেয়েছি বোনের শাসনে । বারে বারে জীবনযুদ্ধে যখন হেরে যাই ভালোবাসা র আড়ালে মায়াচাদর জড়িয়ে রাখেন আমার বড় সাধের সহধর্মিণী ।আর আমার মা সুখে দুখে শোকের নিত্যদিনের সঙ্গী । পুরো জীবনটাই ঘিরে থাকে নারীরূপী দেবির রক্ষাকবচ । সমগ্র পুরুষ সমাজ আমার মতোই নারীর কাছে ঋণী । তবে কোন লজ্জায় পুরুষ কেড়ে নেয় নারীর লজ্জাভূষণ । পুরুষদের মধ্যেই অনেকে আছেন তাদের শ্রদ্ধা করেন । তাদের রক্ষায় জীবন দান করেন । তারা অবশ্যই প্রণম্য । তাদের জীবন সার্থক ।এই পৃথিবী সকলের স্বাধীন ভাবে বিচরণের স্থান হোক । হিংসা ভুলে পৃথিবীর বাতাস ভালোবাসা ভরুক দুর্বল মানসিকতায়।কর্ণ ভাবেন, সূতপুত্র বলেই এত অবহেলিত হব কেন? আমার এত অস্ত্র মজুত থাকা সত্ত্বেও আমি সুখে নেই।এমন কোন মহাস্ত্র নেই যা আমার কাছে মজুত নেই। কোন শত্রুকে ভয় পাই না আমি।নির্ভীক আমি যে কোন শত্রুকে পরাস্ত করতে পারি। মানুষের প্রথম পরিচয় কি জন্ম না কর্ম। শুধু সূতপুত্র বলেই আমাকে এত ছোট করার কারন কি। মহাবীর ভীষ্ম বলেন যে তুমি অর্ধরথ, সুতপুত্র। বারবার আমাকে কেন অপমানিত হতে হয়। কর্ণ ভাবেন, আমি জন্মগতভাবে সূতপুত্র বলে আমি সব জায়গায় অবহেলিত। কিন্তু আমার অপরাধ কি? আমি তো কোন অপরাধ করিনি। আমার সূতবংশে জন্ম নেওয়ার জন্য আমি তো দায়ী নই।একলব্য এইসব চিন্তা করেন আর জাতপাতের বিভেদ তাকে কষ্ট দেয়।
কর্ণের পালিত পিতা কোনদিন প্রকাশ করেন নি যে কর্ণ কুড়িয়ে পাওয়া সন্তান।অতি আদরে নিজসন্তানের মত কর্ণকে পালন করেছেন তিনি।আর কেউ জানেনও না যে অধিরথ কর্ণকে জল থেকে উদ্ধার করে বাড়ি এনেছেন। কর্ণের পালিতা মা রাধা কর্ণকে চোখের আড়াল করতে পারেন না। তাকে খেতে না দিয়ে তিনি নিজেও খান না।শুধু জন্ম দিলেই কি মা হওয়া যায়।রাধার মনে প্রশ্ন কুড়ে কুড়ে খায়।
মহাবীর কর্ণ জানিয়ে দিতেন একমাত্র একা তিনি যুদ্ধ করে পান্ডবদের হারিয়ে দিতে পারেন। সারথিনন্দন কর্ণ, বলে উপহাস করতেন ভীষ্ম। কর্ণ এই উপহাস সহ্য করতে পারতেন না। তিনিও ভীষ্মকে, বুড়ো ভাম বলে অবহিত করতেন। অনেকেই কর্ণকে সারথীপুত্র বলেই সম্বোধন করতেন। অবহেলা শুনতে হতো। মহাবীর কর্ণের পালিত পিতা হলেন অধিরথ ও মাতা হলেন রাধা।