ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে এ এফ এম সেবগাতুল্লা (পর্ব – ১৪)

সাবির সুবীর ও মাতলা নদী 

দাদুর শরীর সমন্ধে যা জানা গেল, তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। তার রোগ জটিল নয়। সাবির সুবীর দাদুর কাছে থেকে ওই পঞ্চাশের দশকের ভয়াবহ নৌকাডুবির ব্যপারে বিস্তারিত জানল। পুরাতন খবরের কাগজেও সেই ঘটনার বিবরন তারা পেয়েছিল অবশ্য , তবে যা জানা গেল, তা হল : সেই দিন ছিল বিকেল বেলা। ক্যানিং থেকে আমঝাড়া গামি নৌকা ছেড়েছে। তখনও ভটভটি মানে জেনারেটর চালিত নৌকার চলাচল শুরু হয়নি । বিকালের দিকে নৌকাটি আমঝাড়া গ্রামে পৌছানর আগে থেকেই আকাশে ছিল মেঘ। যেন কালো মেঘ সারা আকাশে ঢেকে ছিল। ক্যানিংএর হাঁড়িঘাটা থেকে নৌকা সবে ছেড়েছে। ডকঘাট ঢোকার আগে কাঠালবেড়িয়া গ্রামের ওই দিকে নদীটা কোন মত তৈরি হয়েছে সেখানে ছিল তাল গাছের সারি,ওই দিক টাতে ছিল ” চকের পাড়া”, যা আজ মাতলার গর্ভে বিলীন। ওই দিকের আকাশে কালো মেঘ নিয়ে ধেয়ে আসছে কালবৈশাখী! কিছুক্ষন পরে শুরু হয়েছে ঢেউ। আমঝাড়ার দিকে যতই এগচ্ছে ঢেউএর তীব্রতা যেন ততই বেড়ে চলছে। আর মাতলার ঢেউ মানে ভয়ানক ঢেউ! যাদের অভিজ্ঞতা আছে তারা জানে।

সাবির – সুবীর দাদুর কাছে জানতে চাওয়াতে দাদু বললেন ” সেই দিন মাঝি বলল সবাই নৌকার মাঝখানে জড়ো হও। আমরা সবাই নৌকার মাঝখানে এসে জড়ো হই। নৌকাটা মোচার খোলার মতো নদীর ঢেউ এ দুলতে লাগল। ” দাদু আরও বললেন “নৌকাটার হাল হঠাৎ করে ছিঁড়ে যায়। মাঝি কোনও রকম ভাবে নিজের গামছা দিয়ে হালটা আবার নৌকার সাথে বেঁধে নিল” সুবীর জিজ্ঞাসা করল ” তারপর কি হল দাদু ? দাদু জানাল “শেষ রক্ষা আর হয়নি”! দাদু নিজের মত আনমনা হয়ে বলেই চলল ” আমাদের নৌকাটা আমঝাড়া ঘাটের কাছে প্রায় এসে পড়েছে ,এমন সময় উল্টে গেলো ! দাদু ঘটনা গুলো বলতে বলতে একটু মনমরা হয়েগেলেন। বলতে বলতে দাদুর চোখের কোণে জল এসেগেল। দাদু বললেন ” আমার মা আর আমার ছোট ভাই, ওই নৌকাতেই ছিল। আমি মাকে জড়িয়ে ধরেই ছিলাম। নদীর ঐরকম ঢেউএ আমরা অনেকেই ভিজে গেছিলাম। ” সাবির দাদুকে জিজ্ঞাসা করল তারপর কিহল? দাদু বললেন, “যখন নৌকাটা ডুবতে শুরু করেছে তখন কেউ কেউ নৌকার পাটার মধ্যে চলে যাচ্ছিল, কেউ কেউ আবার সরাসরি নদীতেই ঝাঁপ দিচ্ছিল। আমার মা আমার হাতটা শক্তপক্ত ভাবেই ধরেছিল। তার পর দেখি হাতটা আলগা হয়েগেল।”!

সাবির – সুবীরের চোখে তখন জল! দাদু এর পর জানাল ” আমি গ্রামের ছেলে সাঁতার জানি । কিছুক্ষন পাড়ের দিকে সাঁতার কাটলাম, তারপর ওরকম ঢেউ এ আর যেন পারছিলাম না ! পাড় থেকে লোকজন হাঁকাহাঁকি করছিল অল্প স্বল্প শুনতে পাচ্ছিলাম । তারপর আমার আর কিছু মনে নেই। ” সাবির – সুবীর জানতে পারল দাদুকে ওদের পাড়ার একজন লোক যিনি ওই নৌকাতেই ছিলেন কোনও ক্রমে দাদুকে প্রাণে বাঁচাতে পেরেছিলেন। অনেকেই ওই দিনের নৌকাডুবিতে বেঁচে ফিরতে পেরেছিল। অনেকেই লাস হয়ে নদীর পাড়ে ফিরেছিল। আর অল্প ক একজন চিরতরে নদী গর্ভে বিলীন হয়েযান। আর হ্যাঁ, দাদুর মা আর ভাই চিরতরের জন্য হারিয়ে যান।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।