মার্গে অনন্য সম্মান খুশী সরকার (সর্বোত্তম)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার
সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৭৫
বিষয় – বন্ধু
ঈশ্বরেরে দূত
“খাচ্ছো কই?এত কম দামে আর কি হবে,বলো?”
তুমি ভুল ভাবছো।খেতে তো হবেই কিন্তু আমার ভাবনা অন্য জায়গায়।সে কি আমি বুঝি না
তোমার চেষ্টার তো কোনো ত্রুটি নেই।
“একটা ব্যবস্থা তো হয়েই গেছিল কিন্তু বন্ধু যে এমন হতে পারে সেটা বগাকে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না। আর ক’টা দিন,শেষ রক্ষা বোধহয় আর হলো না” শংকরের পেটখালি করা দীর্ঘশ্বাস পড়তেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।কি আর করা, অগত্যা দীপা দরজা খুলতেই চক্ষু ছানাবড়া।”একি আপনি?”হতভম্ব দীপা।আসতে বলবে কি না— ভাবতে ভাবতেই দীপক বলে,কি ব্যাপার চমকে উঠলে যে!ঘরে আসতে বলবে না?
একটু ধাতস্থ হয়ে দীপা বলে,হ্যাঁ,হ্যাঁ আসুন।
“কোথায় যে বসতে দিই”
এইতো তোমাদের বিছানাতেই বসি।
দীপক মানে শঙ্করের পুরনো বন্ধু। অনেকদিন পর এসেছে। দীপককে দেখে শংকর ভাত ছেড়ে উঠে পড়ে। “আরে, তুমি উঠছো কেন? খেয়ে নাও”
খাবো, খাবো, একসঙ্গেই দু’জনে খাবো।এবার বলো, কি করে জানলে আমরা এখানে আছি?
“দিদির কাছে শুনলাম”
“তা নিজের বাড়ি ছেড়ে ভাড়া বাড়িতে উঠে এলে যে তোমরা!” দীপক জিজ্ঞাসা করতেই দীপা বলে, “না এসে কোনো উপায় ছিল না।”
“কেন,তা হঠাৎ!”
“রোজ রোজ অশান্তি আর ভালো লাগছিলো না।” ম্লানমুখে বলে শংকর
“আবার কি অশান্তি?”
“টাকা।” আমাদের এখন অনেক টাকার প্রয়োজন।
“হঠাৎ অনেক টাকা প্রয়োজন হল কেন?”
দীপা শংকর কেউ কথা বলে না। মাথা নিচু করে চুপ। দু’জনের দিকে তাকিয়ে দীপক বলে, “ও বুঝেছি, আমাকে বলা যায় না তাই না।”
না না, আসলে তা নয়।
“সেটাই।”
না, তুমি ভুল বুঝো না। আসলে পুরো ফেডআপ হয়ে গেছি, বুঝলে। তুমি তো জানো না, এর মধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেছে।
“আরে বাবা আমি তো সেটাই জানতে চাইছি। অনেকদিন হয়ে গেল এটা ঠিক, অনেকদিন তোমার সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই এটাও ঠিক, কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব তো এখনো দিনের আলোর মতো ঝলমল করছে।
“হ্যাঁ,তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু জানো বন্ধুত্বের উপর বিশ্বাসটা আমার হারিয়ে গেছে।”
“কেন? খুলে বলবে না?”
“বলবো বলবো” মাথা নাড়ে শংকর। মাথা নিচু করে বসে আছে দীপা একপাশে। কিভাবে বলবে বুঝে উঠতে পারে না শংকর।
মনের পর্দাই আছড়ে পড়ে সেদিনের সেই ঘটনা–
সেদিনটা রবিবার। এক বুক আশা আনন্দে শংকর গেছে বগার বাড়ি খুব সকালেই। বগা তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি।তাই একা একা বসে থাকতে থাকতে মনে ভেসে ওঠে ছোটোবেলার স্মৃতি। একসঙ্গে স্কুলে পড়ার সময় বগা কি হিংসুটে আর অহংকারীই না ছিল। সেদিন অঙ্কের ক্লাসে তো ধরায় পড়ে গেল। শংকরের করা অঙ্ক টুকে ম্যাডামকে নিজে করেছে বলে দিব্যি চালিয়ে দিল কিন্তু বোর্ডে আর সেই অঙ্ক করতে না পেরে শেষে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকলো তবুও সত্যিটা বলল না। কিছুতেই নিজেকে ছোটো করতো না। বন্ধুদের খাবে কিন্তু কাউকে খাওয়াবে না। সেই ছেলে এত উদার ও বন্ধুত্বপূর্ণ হয়েছে,এটা ভেবেই শংকরের খুব ভালো লাগছে। বিশেষ করে তার এই বিপদের দিনে ও-ই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
“কি রে কখন এসেছিস?”বগার কথায় সম্বিত ফিরে এলো শংকরের।
মুহূর্তে একগাল হেসে বলে, “এইতো কিছুক্ষণ আগে।
তা কি যেন বলেছিলি, তখন ভালো করে বুঝতে পারিনি।আসলে পাশেই কীর্তন হচ্ছিল তো।”
“ও-ব্বাবা, বুঝতে পারিসনি?”
“আবার বলতে তোর অসুবিধা আছে।”
“না না,তা কেন। আমি বড় আশা করে এসেছি রে।”
“আগে বিষয়টা বলবি তো নাকি?
“তোর কাছে পঁচিশ হাজার টাকা ধার চাইছি,জমিটা বিক্রি হলেই তোকে দিয়ে দেবো।”
“কি করবি টাকায়?”
“একটা চাকরির সুযোগ এসেছে কিন্তু বুঝতেই তো পারছিস আজকাল টাকা ছাড়া কোনো চাকরিই হয় না।”
“তা তো বুঝলাম কিন্তু তোর বাবারই তো কত টাকা।”
“বাবা বউমার চাকরি দেখে দেবে না”
“তুই দিচ্ছিস তো,বগা?”
“কী যে বলিস?চাকরি করবি তোরা, আর টাকা দেবো আমি!”
“ধার চাইছি তো।”
“না না, হবে না”
“মানে?”
“দিতে পারবো না।”
“তুই তো দিবি বললি ফোনে, এখন বলছিস দিবি না। বিপদ থেকে উদ্ধার কর না ভাই।”
“তোর কি মাথা খারাপ?ব্যবসাটা বাড়াতে হবে আমার।”
“বড় আশা করে এসেছিলাম,টাকাটা বড়ো প্রয়োজন,বগা।”
“চাকরি না করে বিয়ে করতে কি আমি বলেছিলাম?”
“ঠিক আছে ভাই,আমারই বোকামি,আসি”বলেই বেরিয়ে এসেছিল শংকর।আজ আবার সেই কথা আর এক বন্ধুকে বলতে মন সায় দিচ্ছে না।
কিন্তু দীপক নাছোড়বান্দা,শুনবেই। শংকরকে ইতস্ততঃ করতে দেখে দীপা নিজেই বলে,একটা চাকরির কল এসেছে।আর এই মরুভূমির জীবনে একটা চাকরি খুব প্রয়োজন কিন্তু টাকা নেই। আজকাল চাকরির যা ডিমাণ্ড, টাকা ছাড়া যোগ্যতা থাকলেও হয় না।তাই ও ভীষণ চিন্তায় আছে।
“তোমার শ্বশুরের তো অনেক টাকা,চাও।”মুচকি হেসে বলে দীপক।
“চেয়েছিল কিন্তু আমার চাকরি দেখে দেবে না।”
“কি শংকর,সত্যি?”
“হ্যাঁ।
“হওয়ার কি সম্ভাবনা আছে?”
“আছে,কিন্তু টাকার প্রয়োজন।এই মুহূর্তে আমাদের ওই একটুখানি জমি আর অর্ধেক তৈরি করা দোকান ঘরটা ছাড়া আর কিছু নেই।”
“ঠিক আছে। যত টাকা লাগে আমি দেবো। তোমরা টাকার চিন্তা করো না। তোমরা শুধু যোগাযোগ করো।”
দীপা উৎফুল্ল হয়ে বলে, সত্যি! প্রয়োজন হলে দিবেন তো?
হ্যাঁ,অবশ্যই। তোমরা একদম চিন্তা করো না। শংকর তো কার কথা যেন বলতে চেয়েও বলল না। ঠিক আছে বলতে হবে না। আমার সঙ্গে ওর বহুদিনের সম্পর্ক। তোমরা ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারলে টাকা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। যত টাকা লাগে—-“
বুক ভরে শ্বাস নেয় দীপা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটার পর একটা ছবি। তেমন রোজগার না থাকলে যে দাম্পত্য জীবন কত দুর্বিষহ হয়, সকলের কাছে কত হেনস্থার শিকার হতে হয়, তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে সে। উপযুক্ত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু অর্থের অভাবে কারো কাছে মূল্য পায়নি এতোটুকু। যন্ত্রণা লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে প্রতিমুহূর্তে। শুধু তাই নয় মাথার ছাদ পর্যন্ত চলে গেছে কিন্তু অদম্য ইচ্ছা আর বিশ্বাস তার, যে করেই হোক একটা কাজ জুটবেই। জীবনে টাকাই সব। টাকা না থাকলে পৃথিবীতে কোনো সম্পর্কের মূল্য নেই, এই আসল সত্যটা তার বুঝতে আর বাকি নেই। তবুও তার বিশ্বাস,পৃথিবীতে এখনও মানবিকতা আছে। এখনো আছে কেউ কেউ। মন থেকে যেন তার একটা প্রশান্ত শীতল বাতাস আসছে নিঃশ্বাস বেয়ে।একটা সুরভিত আশ্বাসের আলো তার সারা শরীরে বিদ্যুৎ তরঙ্গে ঢেউ তুলে বলে, দীপক কথার খেলাপ করবে না, তার কথা রাখবে।
যোগাযোগ করতে গিয়েও দেখা গেল অন্ধকার ক্রমে সরে যাচ্ছে। অলিগলির বাঁকা পথ উঠে আসছে মূল সোজা রাস্তায়। মাত্র কয়েকদিনের মাথায় ইন্টারভিউ হয়। তালিকাভুক্ত হয় তার নাম। ধীরে ধীরে রাত অন্ধকার সরিয়ে ভোরের আলোর অপেক্ষায়।
সব ঠিকঠাক। ফোনে দীপককে সব জানায় শংকর।
“ও তাই!” উচ্ছসিত কন্ঠে বলে দীপক।
“তুমি সব ঠিক করে রেখেছো তো?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ।চিন্তা করো না। কবে লাগবে?”
দীপকের সমস্ত কথা শুনেও শংকর যেন পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না। না জানি সেও—–
দীপার কিন্তু স্থির বিশ্বাস দীপক আসবেই। তাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করবেই। তাই শংকরকে বুঝিয়ে বলে,”অত চিন্তা করো না। সবাই এক হয় না। পৃথিবীতে এখনো চন্দ্র সূর্য ওঠে।”
দীপার কথাই শংকর যেন সাহস খুঁজে পায়।ফোন করে দীপককে বলে, “তুমি সামনের পনেরো তারিখে পঞ্চাশ হাজার নিয়ে চলে এসো।”
নির্দিষ্ট দিনে দীপক সঙ্গে নিয়ে চলে আসে।
সমস্ত ফর্মালিটি মেনে একমাস পর দীপা চাকরিতে যোগ দেয়।
ঘরে ফিরে ওরা তিনজনেই একসাথে। ঘরে ঢুকেই শংকর দীপকের হাত চেপে ধরে বলে, “তোমার এই উপকার আমি জীবনে কোনোদিন ভুলবো না। তুমি ঈশ্বরের দূত হয়ে এসেছো আমাদের জীবনে। বন্ধুর প্রতি বিশ্বাস আমার হারিয়ে গিয়েছিল। খুব কষ্ট পেয়েছি আমি আরেক বন্ধুর কাছে কিন্তু সব বন্ধু যে এক হয় না সেটা প্রমাণ করে দিলে তুমি। কেউ বন্ধু হয়েও বন্ধুত্বের মর্যাদা তো রাখেই না বরং সুযোগের সদ্ব্যবহার করে,আবার কোনো বন্ধু বন্ধুত্বের ভালোবাসায় বিপদের সময় হয়ে ওঠে ঈশ্বরের দূত। সেই ঈশ্বরের দূত হয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছো তুমি। জানি না আমি তোমার কোনদিনও উপকারে আসতে পারবো কিনা তবে তোমার এই ঋণ আমি সারাজীবন মনে রাখবো।” এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল শংকর।
“আরে আরে, কি করছো, কি করছো? বিপদের দিনে বন্ধু হয়ে বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোয় তো বন্ধুত্বের প্রধান এবং প্রথম কাজ। বিপদের দিনে তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আমি তো শুধু সেটুকুই করেছি।”আরো বলে, নিজেকে এত দুর্বল ভেবো না, ঈশ্বর আছেন সবার মাথার উপর। তিনিই আমাকে দিয়ে করিয়েছেন। আমি তো উপলক্ষ মাত্র। দীপকের বিনীত ব্যবহার ও সৌহার্দ্যপূর্ণ কথায় শংকর বন্ধুর প্রতি বিশ্বাস যেন ফিরে পায়। সেই রাতে খুব আনন্দ করে খাওয়া-দাওয়া করে। পরদিন দীপককে যখন ওরা গাড়িতে তুলতে যায় তখন চারদিকে বসন্তের উতল হাওয়া। রাধাচূড়া কৃষ্ণচূড়া রাস্তায় বিছানো। কোকিলের সুমধুর কুহু ডাকে রোমাঞ্চিত এক পরিবেশ। বাতাসে ভেসে আসছে “আজি দখিন দুয়ার খোলা,এসো হে এসো হে।”