ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব- ২৫)

সুমনা ও জাদু পালক
সুমনা যখন খুব মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখছে এবং মনের ভিতরে খুব ইচ্ছে হচ্ছে ছবিটা একবার ছুঁয়ে দেখার, ঠিক তখনই অদৃশ্য কণ্ঠ বলে উঠলো, না সুমনা, ভুলেও এমন ভুল করোনা । খবরদার !এখানকার কোন জিনিসে হাত দিওনা!একবার ভুল করেছো কি সর্বনাশ। আর তোমাকে আগের রূপে ফিরিয়ে দেবার ক্ষমতা আমার নেই। তাছাড়া যে কাজের জন্য তোমাকে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে, সেই কাজটাও পন্ড হয়ে যাবে।
সুমনা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, কাজ? কোন কাজ? কি করতে হবে আমাকে?
—– কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো, সব জানতে পারবে।
—– ঠিক আছে, আমি ছবিতে হাত দেবো না। শুধু একটা কথা আমাকে বলো ,আমার মত হুবহু দেখতে ছবির ওই সুন্দর মেয়েটার নাম কি?
—– ওতো রত্নমালা ,এই দেশের রাজার একমাত্র মেয়ে।
—- আর ওই যে খাটে শুয়ে সুন্দর দেখতে ছেলেটা ,ওকি রাজকুমার?
—- হ্যাঁ, ও এই দেশের রাজকুমার। ওর নাম হীরক।
—- রত্নমালা আর হীরক কি তাহলে ভাই বোন?
—– হ্যাঁ ,ঠিক বলেছ, ওরা ভাই বোন। রত্নমালা বড় আর হীরক ছোট।
—- হীরক তো এখানে শুয়ে আছে, রত্নমালা কোথায়?
—–তাকেই তো ধরে নিয়ে গেছে দুষ্টু জাদুকর।———- কোথায় ?
—–তার রাজ্যে।—-
—– সেটা কোথায়?
—– মরুভূমির দেশে। ঠিক আছে, তোমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছ তো, এখন আমার সঙ্গে চলো সুমনা ।
—-কোথায়?
—- যে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এলে, সেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে বাঁদিকে যাবে। কিছুটা গেলেই একটা নীল রঙের বিশাল দরজা দেখতে পাবে। তুমি ওই দরজাটা না ছুঁয়ে খুব জোরে জোরে তিনবার ‘ওম নমঃ শিবায়’ এই মন্ত্র বলবে ।তাহলেই দরজাটা খুলে যাবে। দরজা পেরিয়ে একটা মস্ত বাগান দেখতে পাবে ।সেই বাগানের ফল পাতা পাখি সবই পাথর হয়ে আছে। খুব সুন্দর দেখতে ওগুলো।আবারো বলছি সুমনা, তুমি কিন্তু কোন কিছুতে হাত দিওনা।
—না,দেবনা।
—- শুধু বাগানে দাঁড়িয়ে ঈশান কোণে তাকাবে ।
ঈশান কোণ কাকে বলে জানো তো?
—- হ্যাঁ, জানি, উত্তর-পূর্ব কোণ।
—- ঠিক। ঈশান কোণে তাকালে একটা খুব উঁচু সাদা রঙের মন্দির দেখতে পাবে। ওই মন্দির লক্ষ্য করে এগিয়ে যাবে তুমি।
—- কিসের মন্দির ওটা?
—- শিব ঠাকুরের মন্দির । মন্দিরের ভিতরে বিশাল শিবলিঙ্গ আছেন।
সুমনা সঙ্গে সঙ্গে হাততালি দিয়ে বলে উঠলো, এখানে শিব ঠাকুর আছেন! বাহ! তাহলে তো খুব ভাল হল !
—–কি ভালো ?
—-আমি শিব ঠাকুর কে বলবো, যাতে রাজকুমার হীরক কে শিব ঠাকুর ভালো করে দেন আর এই রাজ্যের সব্বাইকে আবার আগের মত স্বাভাবিক করে দেন ।
—ঠিক আছে,বোলো, এখন এসো তো।
—-বেশ।
সুমনা আবার ফিরে চললো আগের রাস্তা ধরে। সিঁড়ি দিয়ে নিচে বারান্দায় নেমে বাঁদিকে ঘুরল ও। কিছুটা যাওয়ার পর একটা মস্ত বড় নীল রঙের দরজা দেখতে পেল । দরজাটা বন্ধ। সুমনা দরজার সামনে গিয়ে হাতজোড় করে খুব জোরে জোরে তিনবার ‘ওম নমঃ শিবায়’বলল ।আর কী আশ্চর্য ,সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ দরজাটা খুলে সুমনাকে যাওয়ার রাস্তা করে দিল ।সুমনা দরজা পেরিয়ে বাইরে এল। সত্যি একটা বিশাল ফলের বাগান দেখতে পেল সুমনা। চারদিকে তাকিয়ে দেখল, কত রকম ফলের গাছ। থোকা থোকা সবুজ-লাল-হলুদ রঙের ফল ঝুলছে গাছে গাছে। সুমনা তাকিয়ে দেখল চারদিকে। সব ফলের গাছ চেনে না ও।
না ,এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করলে চলবে না ।সুমনাকে তো শিব ঠাকুরের মন্দিরে যেতে হবে। সুমনা এবার এদিক ওদিক ঘুরে তাকিয়ে দেখতে দেখতে অনেকটা দূরে একটা সাদা রঙের মন্দির দেখতে পেল। সুমনা বাগানের পথ ধরে এগিয়ে চলল সেদিকে। একসময় ফলের বাগান শেষ হতেই সুমনা দেখতে পেল মস্ত বড় একটা পুকুর। টলটলে জলে ভর্তি ।বাঁধানো ঘাট ও আছে।
অদৃশ্য কন্ঠ বলল, এটা ‘ শিব পুকুর’। তুমি যাও নিচে নেমে পুকুরের জলে ভালো করে হাত পা ধুয়ে এসো।
না না, কোন ভয় নেই ।এই শিব ঠাকুরের মন্দির এবং তার চারিপাশের এলাকাতে জাদুকরের জাদু কাজ করেনি। তাই এগুলোর কোনো পরিবর্তন হয়নি ।তুমি হাত পা ধুয়ে ওই মন্দিরে এসো ।
সুমনা তাই করল। ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলো ধীরে ধীরে ।পুকুরের জল হাত দিয়ে সে দেখল, কি ঠান্ডা জল। ভালো করে হাত পা মুখ ধুয়ে সুমনা এবার উপরে উঠে মন্দির লক্ষ্য করে এগিয়ে চলল ।
একসময় মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ায় সুমনা। বাহ !মন্দিরের চারিপাশে অসংখ্য নীলকন্ঠ লতার ঝোপ আর অজস্র আকন্দ ফুলের গাছ ।উজ্জ্বল নীল রঙের ফুলে ভর্তি হয়ে আছে নীলকন্ঠ লতা আর সাদা সাদা আকন্দ ফুলে ছেয়ে আছে আকন্দ গাছ।
অদৃশ্য কন্ঠ বলল, ভয় নেই ,এগুলো সব সত্যিকারের ফুল। বললাম না, এই শিব ঠাকুরের এলাকাতে জাদুকরের জাদু কাজ করেনি।
এবার মন্দিরে প্রবেশ করো সুমনা।
মন্দিরের বিশাল দরজা খোলা ।সুমনা দরজা পেরিয়ে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করতেই অবাক হয়ে গেল। সুমনার সামনে এক বিশাল শিবলিঙ্গ দাঁড়িয়ে আছেন। ধবধবে সাদা শিবলিঙ্গ। শিবলিঙ্গের চারিপাশে স্তূপীকৃত অগুনতি বেলপাতা ।কিন্তু ওগুলো দেখে সব টাটকা মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, একটু আগে বুঝি কেউ বেল পাতা দিয়ে শিব ঠাকুরের পুজো করে গেছে। শিব ঠাকুরের গলায় অনেকগুলো লম্বা লম্বা রুদ্রাক্ষের মালা ঝুলছে। গৌরীপট্টের উপরে বেলপাতা আর অপরাজিতা ফুল । শিব লিঙ্গের মাথাতেও চাপানো বেলপাতা আর নীলকন্ঠ ফুল।
মন্দিরের মেঝেতে মাথা ঠেকিয়ে সুমনা হাতজোড় করে প্রণাম জানায় শিবলিঙ্গের উদ্দেশ্যে , মনে মনে বলে, হে ভোলানাথ, হে আশুতোষ, হীরক কুমার কে
তুমি ভালো করে দাও। এ রাজ্যের সবাইকে ভালো করে দাও, স্বাভাবিক করে দাও। প্রণাম ও প্রার্থনা শেষ করে উঠে দাঁড়াতেই অদৃশ্য কন্ঠ বলল, সুমনা , বাইরে গিয়ে আকন্দ ফুল তুলে একটা খুব সুন্দর মালা তৈরি করো। এই মন্দিরের কুলুঙ্গিতে সুঁচ সুতো রাখা আছে।
সুমনা ঘাড় কাত করল। সুমনা শিব ঠাকুরকে মনে মনে আবার প্রণাম জানিয়ে মন্দিরের ভিতরে
একটু খুঁজতেই একটা কুলুঙ্গিতে সুঁচ সুতো পেয়ে গেল ।এবারে মন্দিরের বাইরে এসে ইচ্ছে মত প্রাণভরে অনেক আকন্দ ফুল তুলল সুমনা ।তারপর খুব সুন্দর একটা মালা তৈরি করল ।অদৃশ্য কন্ঠে বলল ,যাও সুমনা, এবার মন্দিরের ভিতরে ঢুকে শিব ঠাকুরের গলায় আকন্দ ফুলের মালাটা পড়িয়ে দাও। তাহলেই দেখবে একটা ম্যাজিক হবে।
—— কি ম্যাজিক?
—— দেখতেই পাবে ।
তাড়াতাড়ি মন্দিরের ভিতরে ঢুকে শিব ঠাকুর কে প্রণাম করে শিবলিঙ্গের গলায় আকন্দ ফুলের মালাটা পরিয়ে দিল সুমনা।আর কী আশ্চর্য প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শিব ঠাকুরের গলা থেকে একটা রুদ্রাক্ষের মালা যেন উড়ে এসে ওর গলায় পরিয়ে দিলো কেউ ।
অদৃশ্য কন্ঠ বলল, ব্যাস নিশ্চিন্ত এবারে। জাদুকর আর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না তোমার। আপাতত এখানের কাজ শেষ সুমনা এরপর আমাদের যেতে হবে মরুভূমির দেশে, জাদুকরের রাজ্যে।
চলবে