সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ১)

হারিয়ে যাওয়া একলব্য

শেষ থেকে শুরু

একলব্যের প্রতিভাকে খুন করেছিল বর্ণবাদীরা।শূদ্র বলে, নিষাদনন্দন বলে, তার প্রতিভাকে দমন করেছিল তৎকালীন সমাজ।
গুরু দ্রোণাচার্যকে বুড়ো আঙুল কেটে গুরুদক্ষিণা দিলেন একলব্য।সাধারণ মানুষ হলে এখাানেই তার জীবনের স্বপ্নদেখা শেষ হত। কিন্তু না, একলব্য সেই দলের নন।তিনি ভাবলেন,গুরু হয়ত আমার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য বৃদ্ধাঙ্গুলি চাইলেন।কিন্তু আমি এই চারটি আঙুল সহযোগে দেখিয়ে দেব, ইচ্ছা থাকলে,গুরুর আশীর্বাদ থাকলে এই অবস্থাতেও সাধনা চালিয়ে রাখা যায়।
আদিবাসীদের নিষাদ নামক একটি রাজ্যের রাজা হিরণ্যধনু ও রানী বিশাখার সন্তান। একলব্য চেয়েছিলেন নিজেকে বড় ধণুর্ধর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। তাই অস্ত্রশিক্ষা করতে অনেক আশা নিয়ে শরনাপন্ন হয়েছিলেন রাজকুমারদের অস্ত্রশিক্ষক গুরু দ্রোনাচার্যের। কিন্তু গুরু দ্রোণাচার্য প্রত্যাখ্যান করলেন একলব্যের শিষ্যত্ব । দ্রোণাচার্যের এহেন বিমাতাসুলভ আচরনের কারন বিশ্লেষণ করলে চারটি বিষয় সামনে আসে, প্রথমত একলব্য ছিলেন শুদ্রজাত সন্তান, দ্বিতীয়ত রাজপরিবারের গুরুদের বহিরাগত কাউকে শিষ্য হিসেবে গ্রহন করার পরম্পরা ছিল না তৃতীয়ত, গুরু দ্রোণ পাঞ্চালরাজ ধ্রুপদকে পরাজিত করার জন্য অপ্রতিদন্দ্বী হিসেবে প্রস্তুত করছিলেন অর্জুনকে, তাই একলব্যকে শিক্ষা দেওয়াটাও তার প্রতিশোধ নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাড়াতে পারে। এবং চতুর্থত, একলব্য ছিলেন নিষাদরাজের পুত্র।

দ্রোণাচার্যের কথা

দ্রোন আর দ্রুপদ সমবয়সী। দুই বালক ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে লেখা পড়া, অস্ত্রবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা শিখতে লাগলেন। রাজা পৃষৎ ভরদ্বাজের বন্ধু। দ্রোন আর দ্রুপদের মধ্যে ও সুন্দর বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। কিন্তু রাজন অসম বন্ধুত্ব স্থায়ী হয় না। আর দুনিয়ায় বন্ধুত্ব একটা শব্দ মাত্র। প্রভুত্বই সার কথা। এই জগতে সম্পর্ক একটাই তুমি প্রভু আমি ভৃত্য, অথবা আমি প্রভু তুমি ভৃত্য। রাজা পৃষতের মৃত্যু হয় দ্রুপদ উত্তর পাঞ্চালের রাজা হলেন। আর ভরদ্বাজ স্বর্গে গলেন। বিদ্বান তাপস দ্রোন হলেন আশ্রমিক। একজন সিংহাসনে, আর একজন কুশাসনে।দ্রোনের জীবন পথ আর তার বাল্য বন্ধুর জীবন পথ ভিন্ন। সময় চলছে দিন, মাস, বছর, বছরের পর বছর।দ্রোন শরদ্বানের কন্যা কৃপীকে বিবাহ করলেন। এই বার তিনি সংসারি হলেন। দ্রোন মহেন্দ্রপর্বতে পরশুরামের কাছে গেলেন। তাকে সন্তুষ্ট করে বললেন, “হে ভার্গব, আপনি সমস্ত অস্ত্র ও শস্ত্র প্রয়োগ এবং সংহার বিদ্যা আমাকে দান করুন।” পরশুরাম বললেন, তথাস্তু। দ্রোন হলেন অদ্বিতীয় আচার্য। এই আনন্দ সংবাদ কাকে জানাবেন? প্রিয় সখা দ্রুপদকে। দ্রুপদ রাজা হয়েছেন, সখা হিসেবে তাকে তো অভিনন্দন জানান উচিত। দ্রুপদের সভায় গিয়ে দ্রোন বললেন, বন্ধু চিনতে পারছ? আমি তোমার বাল্য সখা দ্রোন। এ কি কোন কটু কথা। দ্রুপদের কি হল কে জানে। চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে গেল। ভুরু কুঁচকে কর্কশ কন্ঠে বললেন, কে তুমি? তোমার বুদ্ধি সুদ্ধি, কান্ড জ্ঞান আছে বলে মনে হয় না৷ কারণ তুমি প্রথমেই আমাকে সখা বলে পরিচয় দিয়েছ। নির্বোধ। আমি রাজা, তোমার মতো শ্রহীন দরিদ্রের আমি সখা হতে যাব কোন দুঃখে। তোমার সঙ্গে বাল্যকালে যে সখ্য ছিল, উহা কেবল খেলার ও পড়ার স্বার্থের জন্য। শোন ব্রাহ্মণ, দরিদ্র কখনো ধনীর, মূর্খ কখনো পন্ডিতের, ক্লীব কখনো বীরের সখা হতে পারে না। মানুষের অহংকারই শত্রু তার বীজ, এই বীজ থেকে মাথা তুলবে একটি ধ্বংস বৃক্ষ, ভূমি হবে করুক্ষেত্র। ভেতরে জ্বলছে আগুন। বুকে বাজছে দামামা প্রতিশোধ। কিভাবে নেবেন এই ব্রাহ্মণ। কৃপাচার্যের গৃহে আশ্রিত। উপার্জন শূন্য। ব্রাহ্মণের চিরাচরিত বৃত্তি অবলম্বনে দারিদ্র্য ঘুচবে না, সেই কারণেই অস্ত্রবিদ্যা আয়ত্ত করে ক্ষত্রিয় হতে চাই লেন। ভীষ্ম সসম্মানে তাকে রাজপ্রাসাদে বরন করে নিলেন। রাজ পুত্রদের অস্ত্রবিদ্যা যুদ্ধবিদ্যা দান করবেন। অভাব কিছু রইল না। কিন্তু অন্তরের জ্বালা! স্ত্রীর সামনে বন্ধু দ্রুপদের কাটা কাটা কথা দুহাত বিস্তারিত করে বাল্য বন্ধুকে আলিঙ্গন করতে গিয়ে ছিলেন, কিন্তু হয় নি। আচার্য দ্রোন তার ছাত্র রাজপুত্রদের বললেন, হে নিষ্পাপ শিষ্যবৃন্দ, আমার একটি বিশেষ আকাঙ্ক্ষার কথা আজ তোমাদের জানাই। তোমাদের অস্ত্রশিক্ষা সম্পূর্ণ হলে আমার সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে। তোমাদের মধ্যে কে কে সমর্থ উঠে দাড়াও। এই ভাবে সমস্ত শিষ্যদের ডেকে বললেন আমার শিক্ষা শেষ। এই বার গুরুদক্ষিণা। কী দেবে আমাকে?

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।