মুক্ত গদ্যে সুশীল নাগ

কবিতা বিষয়ক মুক্ত গদ্য

গতানুগতিক ভাবনার বাইরে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে নিজেকে জীবনের দিকে যখন ফিরে তাকাই তখন আশ্চর্য সব অনুভূতি আমাকে আবিষ্ট করে। আমি সেই অনুভূতির ঢেউয়ের দোলায় নেচে উঠি, ভেসে যেতে থাকি বিশেষ থেকে নির্বিশেষের দিকে, বাস্তব থেকে পরাবাস্তবতায়, এমন কিছু বোধের জন্ম হয় যা সত্যিই তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। কিছু একটা ‘চমৎকারিত্ব’ আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। কোন একটা দৃশ্য, শব্দ, বাক্য, টুকরো অভিজ্ঞতা, কিম্বা ধ্বনির মিশ্রণে নির্মিত একটা বোধ যা আমার সমগ্র সত্তার ভিতর অদ্ভুত এক আলোড়ন সৃষ্টি করে, আমাকে মুগ্ধ করে, আবার কখনও বিক্ষুব্ধও করে। অর্থাৎ জীবন নদীর বাঁকে কুড়িয়ে পাওয়া অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় এমন এক বোধের যা প্রচলিত অর্থকে ডিঙিয়ে আমাকে এক অর্থহীনতার দিকে টেনে নিয়ে যায়, আমি তখন প্রায় হত বিহ্বল অবস্থায় চূর্ণ বিচূর্ণ হতে থাকি। স্থানিক আমি রুপান্তরিত হই চিরন্তনের ইশারায়। বদলে। যেতে থাকি জীবন নদীর বাঁক থেকে বাঁকে। পৌঁছে যাই ধরা থেকে অধরা এক অস্তিত্বের সন্ধানে অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে। তখন জীবনটাই হয়ে ওঠে একটা আর্ট। ক্ষণিকের রূপলীলার মাঝে পেয়ে যাই অরূপের সন্ধান। প্রকৃতির ছন্দসুর, লেখা ও রেখায় তখন ফুটে ওঠে শাশ্বত এক পলাতক সৌন্দর্যের বর্নময় বিন্যাস। তুচ্ছের ভিতর ধ্যানের আবহ।
একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। বড় ছুটিতে দুর্গাপুর থেকে গ্রামের বাড়িতে গেছি, কিছুদিনের জন্য বিশ্রাম নিতে। আমাদের গ্রামের বিন্যাসটা খুবই সুন্দর। একদিকে চুর্ণী নদীর উপর চুর্ণী ব্রিজ, রেল স্টেশন, প্রায় এক’শ ফুট উঁচু এই স্টেশনটি অন্য যেকোনো রেল স্টেশনের চেয়ে দেখতে সুন্দর। নিচে প্রবাহিত নদী দৃশ্যে জীবনের উপমা। একদিন বিকেলে ট্রেনের অপেক্ষায় প্ল্যাটফর্মে বসে আছি হথাৎ-ই আমার চোখ পড়লো স্টেশনের নাম লেখা সাইনবোর্ডের উপর। অস্তগামী সুর্যের আলোটা বোর্ডের উপর পড়ে অদ্ভুত এক রহস্যময় দৃশ্যের জন্ম হ’ল, অস্তগামী পশ্চিমের সেই ঢলে পড়া সূর্যের প্রতিফলিত আলো। তখন স্টেশনে যাত্রী সমাগম প্রায় নেই বললেই চলে, আমি একা বসে আছি একটা ফাঁকা বেঞ্চে তখনই আমার অবচেতন মন থেকে দুটি পংঙক্তি বেরিয়ে এলো। যা আমার কাব্য গ্রন্থ ‘নৈঃশব্দের স্রোতে কেন এত কোলাহল’-এ স্থান পেয়েছে।

পংঙক্তি দুটি এই রকম ঃ

‘ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছি
প্ল্যাটফর্মে নির্জন রং জ্বলছে।’
‘প্ল্যাটফর্মে নির্জন রং জ্বলছে।’ এটা তর্কশাস্ত্র সম্মত কোনো বাক্য নয়। কল্পনার হাত ধরে বেজে ওঠা কয়েকটি শব্দ বা ধ্বনি যা অভিজ্ঞতার রঙে রঞ্জিত, এমন এক অভিব্যক্তি যা বাক্য মধ্যস্থ অর্থকে ডিঙিয়ে আমাদের অন্য কোথাও পৌঁছে দেয়। এমন অধরা অভিব্যক্তিতে আমরা ভাঙি গড়ি এবং বেজে উঠি। এর চেয়ে বেশি কী কবিতা!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।