সাপ্তাহিক টুকরো হাসিতে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায়-সাতচল্লিশ

টুকরো হাসি – সাতচল্লিশ
বিয়েবাড়ির খাবার
ঝন্টা ফটকার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কি হল তোর? সেই থেকে মুখটা তালের বড়ার মতো করে বসে আছিস কেন? কি হয়েছে?’
ফটকে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, ‘তুই কি হতে দেখলি আমার? কিচ্ছু হয়নি।’
‘বললে হবে কিস্সু হয়নি। মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে, ভূতে এসে তোর দু’গালে চেটে দিয়ে গেছে।’
‘আমি চললাম। তোর এই ফালতু বকওয়াজ ভালো লাগছে না।’
হাত ধরে ফটকেকে টেনে বসাল ঝন্টা। বলল, ‘কোথাও কিচাইন হয়েছে? পাওনা দিচ্ছে না? তো চল তোর সঙ্গে গিয়ে কেসটা সালটে দিয়ে আসি।’
ফটকে বলল, ‘সেসব কিছু না। জানিস আমাদের কপালটাই খারাপ। সেই যে কবে করোনা শুরু হয়েছে তারপর থেকে আজ অবধি একটাও বিয়ের নিমন্ত্রণ পেলাম না।’ একটা বিড়ি এগিয়ে দিল ঝন্টার দিকে।
‘আমাদের তো কেউ নিমন্ত্রণ করে না। আমরা তো এমনি এমনি যাই।’ কথাটা বলে ঝন্টা ফ্যাক করে হাসল।
ফটকা বলল, ‘সেটাও তো যেতে পারছি না। দেখছিস তো কেমন একটা নিয়ম করে দিয়েছে। করোনার জন্য ৫০ জনের বেশি বিয়ে বাড়িতে যাওয়া যাবে না। আমরা লোকের চোখে তো গুনতিতে ৩০০ জনের মধ্যেও আসি না। গেলেই বাড়ির লোক তো হয়ত করোনার ভয়ে আমাদের ছোঁবে না। তাই নিজেরা ঘাড়ধাক্কা না দিলেও লুকিয়ে পুলিশ ডাকবে।’
ঝন্টা বলল, ‘সেটা ঠিক বলেছিস। আমাদের পিছনে পুলিশ তো সারাদিন তক্কে তক্কে আছে। নজর রাখছে। একটা সুযোগ পেলেই সোজা লকাপে ঢোকাবে।’
ফটকা বলল, ‘এই রকম হলে মন ভালো থাকে বল? কদিন ধরে দেখছি চোখের সামনে বিয়েবাড়ির খাবার ভেসে উঠছে। মাছ,মাংস,বিরিয়ানি,মিষ্টি,আইসক্রীম আরও কত কী।’ দুঃখ দুঃখ মুখ করে খানিকক্ষণ বসে রইল ফটকা। বলল ‘মাইরি ভাবলে জিভটা কেমন লক লক করে ওঠে। জিভ বেচারাকে কতদিন ভালো খাবার দিতে পারি না ভাব।’
ঝন্টাও খানিক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘তুই ঠিক বলেছিস। আমাদের পক্ষে দিনকাল খুবই খারাপ হয়ে গেছে। যে বাড়িওয়ালার হয়ে দু’টো ডাক্তার আর পাঁচজন নার্সকে পাড়ায় করোনা ঢুকতে দেব না বলে এলাকা ছাড়া করলাম তারাও তাদের বাড়ির অনুষ্ঠানে ডাকল না!’
‘তবেই বোঝ লোকগুলো কি বেইমান। কাজের জন্য টাকা দিয়েছে বলে কি ভদ্রতা বলে কিছু নেই?’ ফটকা ফোঁস করে উঠল। বলল, ‘করোনাটা কতদিন থাকবে বলত? আমাদের বোধহয় আর বিয়েবাড়ির খাবার জুটবে না। আমার মাঝে মাঝে কেমন মনে হয় জানিস?’
‘কি মনে হয়?’ ঝন্টা জানতে চাইল।
‘মনে হয় বিয়েবাড়ির খাবার খেয়ে আমি হাওয়ায় ভাসছি। মাঝে মাঝে ঢেকুর উঠছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। কখনো বেশি খেয়ে ফেলেছি যখন, সেইদিনের কথা মনে পড়ছে। মাথা টাল খেয়ে গেছে। ভাব তো দেখি কী মজা লাগত তখন!’
ফটকের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঝন্টা বলল, ‘আইডিয়া।’
ফটকা ঝন্টার কাছে এগিয়ে বসল। বলল,’শোন বিয়েবাড়ির নিমন্ত্রণ আমরা পাব না এটা ফাইনাল। এবার বল তুই কি চাস?’
‘মানে?’ ফটকা বলল।
‘ওই যে মাথা ঝিম ঝিম, ঢেকুর, টাল খাওয়া এইসব হলে চলবে?’
‘বিয়েবাড়ির খাবার না খেলে সেটা হবে কি করে?’
‘হবে হবে। যা বলব তাই শোন দেখবি কী খেলা হয়। সবকিছু তোর এখনই বোঝার দরকার নেই। শুধু যা বলব করে যাবি।’ ঝন্টা বলল, কেউ নিমন্ত্রণ না করলে আর কি করবি বল? যেটা বলব সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন কর দেখবি মনে হবে বিয়েবাড়িতে জম্পেশ করে খেয়ে এসেছিস। দুঃখ তো আমারও কম নেই। তোকে যা বলব আমিও তো মাঝে মাঝে তাই করি। ’
‘কেমন বন্ধুরে তুই! আমাকে এতদিন বলিসনি?’
‘আমি তো বুঝতে পারিনি যে তোরও একই দুঃখ।’ ঝন্টা বলল।
ফটকে বলল, ‘সে যা হওয়ার হয়ে গেছে। বাদ দে। এখন বল আমি কি করলে বিয়েবাড়ির খাবার খেয়েছি বুঝতে পারব?’
ঝন্টা বলল, ‘শোন আগের দিন রাতে গবাকাকুর ‘হরেককম ভাজা ইন্ডাস্ট্রি’ থেকে একডজন পিঁয়াজি আর একডজন ফুলুরি কিনবি। তারপর বাড়িতে গিয়ে একটা কুড়ি টাকার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বি।’
‘কুড়ি টাকার খেয়ে মানে?’
‘ন্যাকামি করিস না। তোকে কুড়ি টাকার খাওয়ার মানে বোঝাতে হবে?’
ফটকে জিভ বের করে বলল, ‘ভুল হয়ে গেছে বস। ক্ষমা করে দে। এবার বুঝতে পেরেছি। বল তারপর কি করতে হবে?’
‘পরদিন ঘুম থেকে উঠেই সব পিঁয়াজি আর ফুলুরি খেয়ে নিবি। তারপর দশ-বারো গ্লাস জল খাবি। একটা নকশা পাঞ্জাবি গায়ে চাপিয়ে রাস্তায় বেরুবি। তারপর ঘনার দোকান থেকে সস্তার একটা জর্দা পান কিনে চিবুতে থাকবি।’
চোখ গোল গোল করে ফটকা বলল, ‘তারপর?’
‘তারপরে একটা সিগারেট ধরাবি।’
‘তাতে কি হবে?’
‘আগে পুরোটা শোন। পিকচার তো এখনও বাকি। এত অস্থির হলে চলবে?’
‘ঠিক আছে। এই চুপ করলাম। তারপরে কি করব বল।’
‘সিগারেটে টান দিবি দেখবি ভেতর থেকে গুন গুন করে গান আর হরদম ঢেকুর বেরুচ্ছে। তখনই মনে হবে জম্পেশ করে গুছিয়ে খেয়েছিস।’
ফটকা বলল, ‘কি?’
‘বিয়েবাড়ির খাবার।’