গল্পে-সল্পে সোনালি

দীপাবলি

প্রদীপ আর পুজোর ফুল থালায় ছিল। থালাখানা হাতে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল কুশি।
পিছনে পুরোনো পাথরের মন্দির। সেও চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
কুশি মন্দিরের উঁচু দালানে দাঁড়িয়ে। সামনে চওড়া চওড়া সিঁড়ি। নেমে যেতে হবে নিচে। তবে মাটিতে রাস্তা। বেশ খানিক দূর গিয়ে তবে কুশিদের বাড়ি।
বাড়িতে ঠাকুমা, আর ভাই আছে। ঠাকুমার বয়স হল অনেক। আজকাল হাঁটতে কষ্ট হয়। হাঁফ ধরে।
ভাই বছর চারেকের ছোট কুশির চেয়ে।

আজ ভূত চতুর্দশী।
বাড়িতে চোদ্দখানা মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখে, কুশি পাশের মন্দিরে এসেছিল আলো দিতে।
তার আলো জ্বালতে ভারি ভালো লাগে।
বাবা কত গান গাইতেন ছোট বেলায়। কুশি শুনতে শুনতে ঘুমোত।
শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তন, গেয়েই চলতেন।
এত মিষ্টি ভারি গলা।
ছোট্ট কুশির বুকের মধ্যে কি যেন উথলে উঠত শুনতে শুনতে।
মনে হত আলোয় আনন্দে ভর্তি হয়ে গেছে ভেতরটা।
সে ঘুমের কি আরাম।

এখন শোবার সময় হলেই বাবার গলাখানা প্রাণপণ মনে করার চেষ্টা করে রোজ কুশি। কত সুর। সুরের ঢেউ যেন।
ভাইটার জন্য কষ্ট হয় ওর।
আহারে। কুশি ত তবু কিছু দিন বেশি পেয়েছে বাবা মাকে। ও কত কম পেল আদর।

বাবা মা নৌকোয় যাচ্ছিলেন যে পাশের গ্রামে মামার বাড়িতে।
হঠাৎ ঝড়ে নৌকোডুবি হল।
সেই থেকে কুশিরা ঠাকুমার সাথে একা।

কুশি বারো পেরিয়ে তেরোয় পা। ভাই নয় হবে।
জন মজুর খাটে ওদের জমিতে দুজন। বেশি কিছু জমি নয়। ওই চাল ডাল যেটুকু হয় ওদের নিজেদের জন্য রেখে অল্পই থাকে বেচবার।
মহাজন প্রশান্ত কাকা নিয়ে যায় এসে।
দরাদরি করার ত কেউ নেই।
নিন মা, বলে ঠাকুমাকে যা দেয়, ঠাকুমা তাই নিয়ে নেন।
বলেন, তবু ত ও নিজে দ্বায়িত্ব নিয়ে তুলে গুছিয়ে নিয়ে যায়। নয়ত সে সবই বা কে করত?
কুশির মাঝেমধ্যে মনে হয় দাম ঠিক দেয় কি?
আবার ঠাকুমার কথা মনে করে চুপ করে থাকে।
ভাবে ভাইটা একটু বড় হলে না হয় হাটে গিয়ে ফসলের দাম জেনে আসতে পারবে। তত দিন, কিছু করার নেই।
ঘরের পিছনে মাচা বেঁধে নিয়েছেন ঠাকুমা। লাউ, কুমড়ো, উচ্ছে লতিয়ে ওঠে।
তরকারি ও হয়। আবার শাক ও।
কুশি শাক ভালো বাসে।
ঠাকুমা বলেন, শাক ভালো বাসি বলতে নেই। দারিদ্র হয়।
কিন্তু ভালোই বাসে কুশি।
ভাবে দরিদ্র ত আছিই। তাই বলে কি আর ভালো জিনিস খাবো না।

পরশু থেকে বড্ড মন খারাপ কুশির।
একে দুর্গাপূজা এলেই তার মনকেমন করে খুব।
বাবা মায়ের সাথে হইচই করার দিনগুলো মনে পড়ে যায়।
মায়ের হাতের লাউয়ের পায়েস, শুক্তো, পটলের দোলমা, পলতা পাতার বড়া, তেলকই।
জিভে জল আসে ভাবলেই।
চালতার টক। জলপাই। শেষ পাতে লালচে কিশমিশ দেয়া পায়েস।
আর চার দিন সকালে লুচি, রাতে পরোটা। আহা বাবার দরাজ গলার হাসি আর সারা দিন গান।
ছলছল চোখে কুশি ভাবে স্বর্গে ছিলাম বুঝি। মাটিতে নামিয়ে রেখে দিয়ে গেল কে ?

তাও মুখ কালো করলে চলে না। ঠাকুমা বুড়ো মানুষ। বচ্ছরকার দিনে একটু ঘি দেন পাতে। দুটি কুমড়ো ফুল ভাজা। মাছ দিতে বলেন পাড়ার জেলে বৌকে কিছু চাল ডাল দিয়ে। বিকেলে খাবার জন্য মোয়ার পাক দেন কত কষ্টে।
ভাই ঢাকের আওয়াজ শুনে চণ্ডীমণ্ডপে দৌড় দেয় চকচকে চোখে। তার হাত ধরে টানে।
আয় আয়, শিগগিরই। দেখবি চল কুমোরকাকা চক্ষুদান সেরে ফেলেছে।

এই সব সেরেই বিজয়াদশমী আসে। আর তারপরই দিনগুলো ছোট হয়ে যায় ঝপ করে।
সন্ধ্যে নামে বিকেল হতে না হতে।
হিম পড়ে।
কুশির কানে ভাসে মায়ের গলা।
ও সোনা মা, দাঁড়া, দাঁড়া। কান গলায় চাদর না পেঁচিয়ে মোটে বেরোবে না। নতুন হিম পড়ছে। ঠাণ্ডা লাগতে কতক্ষণ।

ভাইটাকে জড়িয়ে রাখে কুশি।
আহা ছোট মানুষ।
কোথায় গেলো মা ওকে রেখে যে।
এখন ত কুশিকেই ওকে দেখে রাখতে হবে।

তার মধ্যে পরশু রাতে শোবার সময় চমকে গেল কুশি।
বিছানা পাতছিল চাদর ঝেড়ে। ভাই পাশে বালিশ হাতে দাঁড়িয়ে ছিল।
বিকেলে মাঠ থেকে খেলা সেরে ফিরে ইস্তক ওর মুখখানা কালো।
জিগেস করতে কেমন খ্যাঁক খ্যাঁক করে সরে গেছিল।
এখন চাদর হাতে পাশ ফিরতে থাকা কুশির কনুইটা ওর গায়ে লাগা মাত্র, আহ বলে উঠলো জোরে।
কি রে কি রে?
অনেক ঝটাপটির পর কুশি জামাটার ফাঁক দিয়ে দেখল পেটের কাছে চামড়া উঠে ঘা দগদগে হয়ে আছে।
চেপে ধরে জিগ্যেস করতে গাঁইগুঁই করে ভাই বলল , বড় দোতলা বাড়ির ছেলে খোকনের
হাতে গরম চুন হলুদের বাটি ছিল। পা মচকে গেছে খেলার সময় তাই ওর মা করে দিয়েছেন, পায়ে সেঁক দেবার জন্য। হঠাৎ হাসতে হাসতে বাটিটা ভাইয়ের গায়ে ঠেসে ধরেছে।
আঁতকে ওঠে কুশি।
উফ!! এ যে সাংঘাতিক লেগেছে! চামড়া অব্ধি উঠে গেছে!
কেন রে কি করেছিলি ?
চিক চিক করে ওঠে ছোট মানুষের চোখের কোন। বুজে আসা গলায় বলে, কিচ্ছু না।
এমনি। মজা করে ওরা। ও কিছু না। বাদ দে। তোকে এত দেখতে কে বলেছে ?
ভেঙে আসা বুকের ব্যথা নিয়ে কুশি দেখে রুক্ষ কর্কশ গলার ভাই কেমন অচেনা হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে। শক্ত হয়ে ওঠা চোয়াল নিয়ে ছিটকে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে ছেলেটা।
চোখ দিয়ে ধারায় জল পড়ে কুশির। চীৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। পোড়ার যন্ত্রণাটা টের পায় নিজের শরীরে।
বিনা কারণে ? বিনা কারণে, নাকি মজা করার জন্য একটা শিশু মানুষের গায়ে ছ্যাঁকা দিয়ে পুড়িয়ে দিলো ?
কেন না ওর মা বাবা কেউ নেই যে ওকে বাঁচাবে, শুধু এই জন্য ?
অসম্ভব রাগের একটা শিখা মাথার মধ্যিখান অবধি জ্বলতে জ্বলতে উঠে যেতে থাকে মেয়েটার।
ভিতর থেকে নিঃশব্দ চীৎকার করে কেউ, কেউ শুনতে পাচ্ছ না? বিনা অপরাধে নিরীহ প্রাণ কষ্ট পেলে কেউ শোন না তার কান্না? তবে কেন বাড়ির বাইরে যাবার সময় বাবা কেবলই বলে ভয় পেও না, ঠাকুরের কাছে রেখে গেলাম ?

অনেক রাত হয়েছিল সেদিন ঘুম আসতে। ভাই একটু এড়িয়ে চলছে ওকে এই কদিন।
আজ মন্দিরে আলো জ্বালাতে জ্বালাতেই আড়ষ্ট হয়ে গেছিল কুশি, খোকন আর ওদের বাড়ির আরো এক দল ছেলেমেয়েকে আসতে দেখে। মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে আলো জ্বালছিল তাড়াতাড়ি।
গায়ে পড়েই কথা বলতে এল খোকনের দিদি।
কিরে এখানে যে?
মোম কেনার পয়সা কি করে যোগাড় করলি?
বাপ মা তো নেই, ওই বুড়িটা যে কোন দিন মরবে।
আমাদের পা ধরে পড়ে থাক, যদি দয়া করে ঠাঁই দিই বাড়ির ঝি হিসেবে, খেয়েপড়ে বেঁচে যাবি।
অকস্মাৎ আক্রমণে হতভম্ব হয়ে যায় কুশি।
বচ্ছরকার দিনে এমন কথা কেউ কাউকে বলে?
বুকের মধ্যে কিছু একটা বিঁধে থাকার মত ব্যথা।
হা হা করে হাসতে হাসতে চলে যায় বড়লোক বাচ্ছারা।

কুশির চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে। কিন্তু আগুন জ্বলে চোখে একই সঙ্গে।
লম্বা করে নিঃশ্বাস টেনে নেয় সে।
সব রাগ গুটিয়ে স্থির করে নিতে চায় ভেতরটাকে।
সমস্ত মন দিয়ে ডাক দিতে থাকে নিঃশব্দে।
কে আছো ? কে ? কার কাছে কপাল ঠুকতে বলে বড়রা।
আকাশ, শুনছ ?
এই যে পাশের গাছের ডাল নাড়া দেয়া বাতাস, শুনছ? জল, আলো, মাটি, গাছেরা, পাতারা, শুনতে পাচ্ছ?
আমি ডাকছি।
শুনতে পাচ্ছ ?
আমার কেউ নেই, তাই আমাকে আমার ছোট্ট নিরপরাধ ভাইকে ওরা ছ্যাঁকা দিচ্ছে, পুজোর দিনে এতখানি কষ্ট দিয়ে গেল, বলতে বলতে গেল আমাদের নিজেদের জায়গা থেকে উপড়ে ফেলে দেবে।
কেউ নেই যাদের তাদের জন্য কে থাকো ? এখনো কিচ্ছুটি করবে না ?

কতক্ষণ চোখ বুজে নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মনে নেই কুশির।
বেশ খানিকক্ষণ মনে হয়।
ভেতরের জ্বালাটা কিছু কমে এলে আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে পা চালায়।
বাড়ির কাছাকাছি এসে দেখল রাস্তায় অনেক লোকের জটলা।
ভাই ভিড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল ওকে দেখে।
কোথায় ছিলি রে ? কি কাণ্ড হয়েছে জানিস?

কি ?

আরে একটু আগে খবর এসেছে খোকনের মা, ও বাড়ির জেঠিমা, স্ট্রোক না কি বলে সেই জন্য বাথরুমে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে।
খোকন সাইকেল নিয়ে ওর বাবাকে খবর দিতে যাচ্ছিল তাড়াহুড়ো করে স্টেশনের পাশের ওদের বড় দোকানটায়, বড় রাস্তায় লরির সাথে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে গেছে।
যারা তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেল বলল মাথার হাড়গুলো ভেঙে গেছে সব। চেনা যাচ্ছে না।

হিম হয়ে যায় কুশির ভেতরটা।
হায় হায়। ঠাকুর একি সাংঘাতিক কাণ্ড!

কি রকম বিশ্রী লাগে। আমি কি এত খারাপ চাইলাম ? নিশ্চয়ই সে জন্য নয়।
ইশশ।
বাঁচিয়ে দিও ঠাকুর ।

ভাইয়ের হাত চেপে ধরে বাড়ি ঢোকে কুশি।
দেখে ঠাকুমা দাওয়ায় বসে আছেন।
ওর চোখে চোখ রাখেন রূপোলি চুলের মানুষটি।
মনে রেখ দিদি, অনাথ অসহায়কে মারতে এসে অহংকারী যদি বলে, দেখি তোকে কে বাঁচায়, বাঁচানোর লোক আসেন। কিন্তু থাম ফাটিয়ে বেরিয়ে আসে যে রূপ সেই নরসিংহকে সহ্য করা বড় কঠিন। সেইটে মনে না রেখে মানুষ বিপদে পড়ে চিরকাল।

এসো, ঘরে ঠাকুরের আসনে আলো দিয়েছি।
দু ভাই বোনে প্রণাম করো।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।