সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৪৭)

সালিশির রায়
কিস্তি – ৪৭
শ্রাবণীর কাছই সে শোনে অখিলেশবাবুর নাম। তাদের মতো নির্যাতিতা অসহায় মেয়েদের কথা ভেবে বিভিন্ন মানুষের সহযোগিতায় হোমটা করেছিলেন প্রাক্তন স্কুল শিক্ষক স্বর্গজিৎ ঘোষ। স্বর্গের মতোই তার হৃদয়টা ছিল সুন্দর। হাতে গোনা কিছু শুভানুধ্যায়ী মানুষের সাহার্য্য আর নিজের পেনশনের টাকায় হোমটা চালাতেন। খরচ সংকুলানের পাশাপাশি সমাজ থেকে ছিটকে যাওয়া মেয়েরা যাতে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সমাজের মুলস্রোতে ফিরতে পারে তার জন্য কাঁথাস্টিচ, খেলনা, বিভিন্ন ধরণের গৃহস্থালির জিনিস তৈরির প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতেন। নিজে দুবেলা হোমে এসে সবার খোঁজখবর নিতেন। হোমের মেয়েদের তৈরি জিনিসপত্র বিক্রির জন্য নিয়ে গিয়েছেন বিভিন্ন সংস্থার কাছে।মেয়েদের মনে সাহস যুগিয়ে বিভিন্ন ভাবে তাদের সমাজের মুলস্রোতে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। সরকার তার নিষ্ঠা দেখে স্বীকৃতি দিয়ে স্থায়ী অনুদান বরাদ্দ করে। কিন্তু তারপর তিনি আর বেশিদিন বাঁচেন নি। তার মৃত্যুর পর হোমের কর্ণধার হন তার একমাত্র ছেলে অখিলেশ।
কিন্তু বাবা আর ছেলের আচার আচরণ সম্পূর্ন বিপরীত ধর্মী। তার সঙ্গে অঞ্জলির একদিনই চোখাচোখি হয়েছে। তাতেই গা'টা কেমন গুলিয়ে ওঠে। ততদিনে তো ওই চোখের ভাষা তো তার চেনা হয়ে গিয়েছে। তার উপরে শ্রাবণীর কাছে লোকটার চরিত্রের কথাও জানা হয়ে গিয়েছে তার। মনে মনে ভাবে , এই ধরণের লোকগুলো কি সব জায়গাতেই থাকে। বাবা কি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে হোমটা করেছিলেন আর ছেলে কি করছে ? বাবার সঙ্গে ছেলেকে একেবারেই মেলানো যায় না। হোমের যারা তাকে দেখেছেন তারা সবাই বলেন , দেবতুল্য মানুষ ছিলেন। সত্যিই তাই , অফিস ঘরে টাঙানো রয়েছে তার সৌম্য-সুন্দর ছবি। দেখলেই মাথা নত হয়ে আসে , প্রণাম করতে ইচ্ছে হয়
। শ্রাবণীই সেদিন কথায় কথায় বলেছিল , বাবাকে ভাঙিয়েই তো চলছে। না কবেই তালা পড়ে যেত হোমে।সরকারের অনুদানের টাকা সব আত্মসাৎ করে হোম চালায় মেয়েদের ভাড়া খাটিয়ে। প্রথম দিকে মেয়েদের নিজের দোতলার অফিস ঘরে ডেকে পাঠিয়ে জোর করে ভোগ করে। তারপর অন্যদেরও ডেকে ছেড়ে দেয়।
মেয়েরা প্রথম প্রথম খুব কান্নাকাটি করে। অখিলেশবাবুর হাতে পায়ে ধরে। কিন্ত অখিলেশ এ পর্যন্ত কাউকে রেহাই দেয় নি। বরং নির্মম গলায় বলেছে , তাহলে এই মুহুর্তে লাথি মেরে হোম থেকে বের করে দেব। সরকার যা টাকা দেয় তাতে তো হোমের আলো- জলের খরচাটুকুই হয় না। তোদের গুষ্টির পিন্ডি যোগাতে কি আমি বাড়ির বৌকে লাইনে দাঁড় করাব ? কি করে সব এখানে আসিস জানতে তো আর বাকি নেই। তাহলে অত সতীপনা কেন রে তোদের ? এমন ভাব করছে সব যেন এক একটা গেরস্থবাড়ির বৌ।
ওই কথা শোনার পর আর কথা বলতে পারে না কোন মেয়ে। সামনে চলে আসে অতীত। সত্যিই তো , তারা আর কারো বৌ, মেয়ে কিম্বা মা নয় , তাহলে তাদের সতীত্বেরই বা কি দাম ? আর সেটা খুঁইয়েই তো এখানে আশ্রয় নিয়েছে তারা। নতুন করে আর কি হারাবে তাদের ? এই জাতীয় চিন্তাভাবনাই অসহায় মেয়েগুলোর সব প্রতিরোধ ক্ষমতা কেড়ে নেয়। তাদের আর যে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তাই দিনের পর দিন মুখ বুজে সহ্য করে চলে যৌন শোষণ। হোমের চার দেওয়ালেই চাপা পড়ে যায় তাদের বোবা কান্না।
শ্রাবণী বলে , দিদি তোমারও ডাক এলো বলে।
— ওই ডাকই হবে ওর শেষ ডাক।
— তোমার কি সাহস গো দিদি। তা যদি পারো তাহলে হোমের সব মেয়ে তোমাকে দু’হাত তুলে আর্শিবাদ করবে।
—- শুধু আর্শিবাদ করলেই হবে না। আমার পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। সবাইকে খুলে বলতে হবে নিজের লাঞ্ছনার কথা। তবেই শয়তানটাকে শায়েস্তা করা যাবে।
—- কিন্তু দিদি সবাই যে এই আশ্রয়টুকু হারানোর ভয় পায়। যদি লাথি মেরে বের করে দেয় ?
—- আর কাউকে বের করতেও পারবে না। এবার ওকেই বেরিয়ে যেতে হবে।
— তাহলে তো সবাই তোমার পাশে দাঁড়াবেই গো। কি করবে গো দিদি তুমি শয়তানটাকে ?
— সে যেদিন করব সেদিনই দেখতে পাবি। সেদিন ফোনে একটু কথা বলার ব্যবস্থা করতে পারবি ?
—- অফিস ঘরে ফোন একটা আছে বটে, কিন্তু বেশির সময় খারাপ থাকে।
—- না না, অফিসের ফোনে হবে না। হোমে কারও মোবাইল নেই ? নাহলে যে প্ল্যানটাই মাঠে মারা যাবে।
— ওহো মনে পড়েছে। সাবিত্রীদির কাছে একটা মোবাইল আছে। ওর এক পাতানো ভাই কিনে দিয়ে গিয়েছে। ওই ভাই সাবিত্রীদিকে বহুবার নিয়ে যেতে চেয়েছে। কিন্তু নিজের কলংকিত মুখ কাউকে দেখাবেন না বলে সাবিত্রীদিই যান নি। ফোনেই ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়। আর কারও তো কেউ খোঁজ খবর নেয় না তাই কারও ফোনের দরকারও হয় না। তবে সাবিত্রীদি আমাকে স্নেহ করেন। আমি বললে একবার দেবে।
— তা হলেই হবে।
— কি হবে গো দিদি বলোই না। আমার যে আর তর সইছে না।
—- বললামই তো সেদিন দেখবি।
এই কয়েকদিনেই শ্রাবণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে অঞ্জলির।
সম্পর্কটা দিদি বোনের পর্যায়ে পৌঁচ্ছে গিয়েছে। অন্যদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। অঞ্জলি লক্ষ্য করেছে সবার চোখে মুখেই কেমন যেন একটা অসহায়তার ছাপ।সে প্রতিজ্ঞা করে যেমন করেই হোক ওই শয়তানটার হাত থেকে এই অসহায় মেয়ে গুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। তাতে তার যা হবে। হবেই বা কি আর ? তার তো আর কিছু হারানোর ভয় নেই। সে শুধু শয়তানটার ডাকের অপেক্ষায় থাকে। তার আগে শ্রাবণীর কাছে তার শিকার ধরার কায়দা কৌশলটা জেনে নেয়।
বেশিদিন অপেক্ষায় থাকতে হয় না তাকে। সেদিন বিকাল বেলা অফিসের বড়দি তাকে ডেকে বলে , শোন গো মেয়ে আজ একবার খাওয়া দাওয়ার পর ছোটবাবু তার দোতলার ঘরে তোমাকে দেখা করতে বলেছে।
— কেন গো , দিদি হঠাৎ আমাকে দেখা করতে বললেন উনি ?
বড়দি মুখ টিপে হেসে বলে , এই দেখ , সে আমি কি করে বলব ? গেলেই জানতে পারবে।
হাসে অঞ্জলিও। আর মনে মনে বলে , তোমার ছোটবাবু কি বলেন তা আজকের পর থেকে গোটা দুনিয়া জেনে যাবে। দেখই না খেলা। মনের ভাব গোপন রেখে বলে, বেশ তাই যাব। অঞ্জলি ভেবে পায় না, বড়দিও তো একজন মেয়ে। তাহলে একজন মেয়ের লাঞ্ছনার কথা জেনেও কি করে ওভাবে মুখ টিপে হাসতে পারেন ? আসলে শয়তানের সঙ্গে বেশিদিন থাকলে মানুষ আর মানুষ থাকে না।
সেও তার কর্মপদ্ধতি ঠিক করে ফেলে। শ্রাবণীকে ডেকে বলে , ডাক এসেছে রে। যা দেখি এবার একবার সাবিত্রীদির কাছে মোবাইলটা নিয়ে আয়। দেখিস আর কেউ যেন টের না পায়।
— বেশ গো দিদি বেশ , কেউ টেরটি পাবে না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্রাবণী ফেরে মোবাইল নিয়ে। ততদিনে সাংবাদিকদের কাছে সে মোবাইলের ব্যবহার পদ্ধতি কিছুটা শিখে ফেলেছে। বিভিন্ন প্রয়োজনে বার কয়েক ফোন করার সুবাদে একটা নম্বরও ততদিনে মুখস্থ হয়ে গিয়েছে তার। ব্লাউজের ভিতর থেকে মোবাইলটা বের করে তার হাতে দেয় শ্রাবণী। সে বলে , তুই এ দিকটা একটু লক্ষ্য রাখ। কেউ এলেই আমায় আওয়াজ দিবি। আমি চট করে ফোনটা করে আসি।
— ঠিক আছে দিদি, তুমি নিশ্চিন্তে যাও।
মোবাইলটা নিয়ে অঞ্জলি দ্রুত স্নান ঘরের দিকে চলে যায়। একবারের চেষ্টাতেই পেয়ে যায় খাসবার্তার সাংবাদিক সুস্মিতকে। সমস্ত কথা খুলে বলে তাকে। শুনেই সুস্মিত যেন আঁতকে ওঠে — আঃ এতবড়ো ব্যাপার। হোমের আড়ালে এভাবে অসহায় মেয়েদের দিয়ে যৌন ব্যবসা চলে আসছে বছরের পর বছর ভাবাই যায় না।
— আমিও অবাক হয়ে গিয়েছিলাম শুনে।
— বিরাট খবর , ঢি–ঢি পড়ে যাবে দেশ জুড়ে। ঠিক আছে তুমি তোমার পরিকল্পনা মতো এগোও। আমরা বাইরে রেড়ি থাকব। তুমি কেবল চিৎকার করে আওয়াজটুকু একবার দিও, তারপর যা করার আমরাই করব।
— ঠিক আছে, তাই হবে। বলে ফোন কেটে দেয় অঞ্জলি।
ফোনটা শ্রাবণীর হাতে দিয়ে বলে -- যা ফিরিয়ে দিয়ে আয়। মনটা খুব ফুরফুরে লাগে অঞ্জলির। শয়তানটার ওই কীর্তিকাহিনী শোনার পর থেকেই কি করে সাংবাদিকদের তা জানাবে ভেবে পাচ্ছিল না সে।
ভাগ্যিস সাবিত্রীদির ফোনটা ছিল। তার উপরে একেবারেই লাইনটা যে পেয়ে যাবে তাও ভাবতে পারে নি। না হলে তো কিছুই করতে পারত না সে। তাকেও মেনে নিতে হত যৌন শোষণ। যাক বাবা আর কোন দুশ্চিন্তা নেই। তাই শ্রাবণী ফিরতেই সে বলে, আয় ঘুটিং খেলি। কতদিন খেলি নি। তোর সব দান মনে আছে ?
তার কথা শুনে মুখের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে শ্রাবণী। বেশ কিছুক্ষণ পর বলে , তোমার সাহস বলিহারি দিদি। শয়তানটার ডাক যার কাছে যেদিন প্রথম এসেছিল সেদিন তার হাত-পা ভিতরে সেঁধিয়ে গিয়েছিল, আর তুমি কিনা বলছ ঘুটিং খেলার কথা ? তুমি জানো, শয়তানটা একটা বিষধর সাপ। ফনা যখন তুলছে তখন ছোবল মারবেই।
— কিন্তু আমি যে বেদে রে , ওর বিষ দাঁত উপড়ে কেমন তুর্কি নাচন নাচায় দেখ।
— একটু ভুল বললে, বেদে নয়গো ওটা বেদিনী হবে।
— ওরে আমার মাস্টারিনীরে, এলেন আমার ভুল ধরতে।
পিঠোপিঠি দুই বোনের মতো হাসি ঠাট্টায় মেতে ওঠে দুজনে। তখন ওদের দেখে কে বলবে সব হারিয়েছে ওরা।
ক্রমশ