T3 || কোজাগরী || বিশেষ সংখ্যায় শম্পা সাহা

বর
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা ।পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদের জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে সসাগরা পৃথিবী।রাত তখন একেবারে পূর্ণ যৌবনবতী ।চাঁদ এসে থেমেছে মাঝ আকাশে ।মিটিমিটি তাকিয়ে দেখছে, এক সুন্দরী লাবণ্যময় নারী, তার হাঁটু ছাপিয়ে এক মাথা কোঁকড়া চুল, নানাবিধ সোনার গহনা, সোনার মুকুট, লাল বেনারসি,নানান আভূষণ যুক্ত এক অপূর্ব দেবী মূর্তি যেন!
বরাভয় আর ধান্য ভর্তি সুবর্ণ ঘট নিয়ে, শ্বেত বৃহদাকার পেঁচকের পিঠে চেপে উড়ে বেড়াচ্ছেন এক গৃহস্থবাড়ি থেকে আরেক গৃহস্থবাড়িতে।প্রতিটি বাড়ির জ্যোৎস্নালোকিত, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ঝকঝকে তকতকে উঠোনগুলি আল্পনায় সজ্জিত। চাঁদের আলোয় সেগুলি অনেক বেশি সাদা মনে হচ্ছে!
বাড়ির ভেতর থেকে ধুপ ধুনোর গন্ধ উঠেছে আকাশের দিকে। চারিদিকে জ্বাল দেওয়া গুড়ের সুবাস, ফল ,মিষ্টি, কর্পূর, চন্দনের গন্ধে এক স্বর্গীয় আবহ!
ছোট-বড়, কাঁচা-পাকা, সব বাড়ির ভেতরেই জ্বলছে আলো! সদরে প্রদীপ, প্রতি বাড়ির ঠাকুর সিংহাসনেই আসনা মা লক্ষ্মীর মূর্তি, যার সামনে রাখা নানাবিধ মনোগ্রাহী রসনাতৃপ্তিকর মিষ্টান্ন ও ভোগ।
বাড়ির ছেলেপুলেরা আতশবাজি পুড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছে, মাঝের ঘরের ঢালা বিছানায়। কর্তারাও এখন বিশ্রাম নিতে ব্যস্ত ।সারাদিন খাটাখাটনি তাদেরও কম যায়নি! যদিও বাড়ির ভেতরের সব ব্যবস্থা গৃহিণীরাই সামলায়, কিন্তু যোগান তো বাইরে থেকে তাদেরই দিতে হয়েছে!
তাই এখন দুচোখ এক করে একটু ক্লান্তি কাটানোর প্রচেষ্টা ।শুধু সব বাড়ির মহিলারা, বিশেষত এয়োস্ত্রীরা রাত জেগে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজবে ব্যস্ত ।খবরদার! ঘুমানো চলবে না! মা লক্ষ্মী এসে দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করবেন
-কে জাগে?
যদি উত্তর না পান, তাহলে কিছু না দিয়ে ফিরে যাবেন ।আর যদি বাড়ির কর্ত্রী জেগে থাকেন তো তার বরাভয় থেকে সম্বৎসরের স্বাচ্ছল্য!
সেই সুন্দরী নারী যেতে যেতে তার অন্তর্দৃষ্টিতে দেখে নিচ্ছেন,কার বাড়িতে লোকজন জেগে আছে আর কার বাড়িতে ঘুমোচ্ছে। সেই বুঝে তিনিও তাঁর আশীর্বাদ বিলোচ্ছেন। এভাবে বেশ কয়েকটা বাড়ি পার করে, প্রায় গ্রামের প্রান্তদেশে এসে পৌঁছলেন।
এ মা! ওই পারের গ্রামের বাড়িগুলোতে নিস্তব্ধতা! আর এদের বাড়িতে উঠোনে আলপনাও নেই, আলো নেই, এমনকি বাড়ির ভেতর কেউ জেগেও নেই। সেই সুন্দরী নারী মূর্তি, একটু ইতস্তত করেন। তারপর হঠাতই চোখে পড়ে, এক বাড়িতে আল্পনা নেই, আলোর রোশনাইও নেই, তবু একটা টিম টিমে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে।
সুন্দরী নারী মূর্তি তার বাহন থেকে নেমে ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেন । ঘরে উঁকি মেরে দেখেন, এক মহিলা বিছানায় শুয়ে। কাশির দমকে ঘুমাতে পারছে না। বারবার উঠছে, বসছে। পাশে একটা ছোট্ট ফ্রক পরা মেয়ে ব্যতিব্যস্ত। বয়স খুব বেশি হলে বছর দশ।দুই পাশে দুই কলা বিনুনি, সবুজ ফিতে দিয়ে বাঁধা।ঘরে আর অন্য কেউ নেই। ঘরের কোণায় কোণায় দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট ।
নারীমূর্তি কৌতুহলী হয়ে ঘরে ঢুকতেই, ভাঙ্গা ঘরের টিমটিমে আলো ছাপিয়ে চারিদিক ঝলমল করে উঠল রূপবতী নারীর রূপের আলোয়। হঠাৎ এই আগমনে, ঘরে মা মেয়ে দুজনেই ভীত সন্ত্রস্ত।মুখে কথা সরছে না।নারী মূর্তি সুমিষ্ট স্বরে প্রশ্ন করে
-তোমরা কারা বাছা? আজও ঘর আঁধার কেন তোমাদের?
প্রথম ধাক্কায় হতভম্ব ভাব কাটিয়ে উঠে অস্ফুটে সেই শায়িতা নারী প্রশ্ন করে
-আমি ফাতিমা আর ও আমার মেয়ে আমিনা। তুমি কে মা?
-আমি মা লক্ষ্মী।তা তোমরা বাছা আমার পুজো করোনি কেন?
-আমরা যে মোছলমান মা
-ও তোমাদের বুঝি পুজো করতে নেই?
-না মা,আমাদের যে পুজো করা হারাম
বলে ভয়ে দুই হাত কানে ছোঁয়ায় ফাতিমা।
আমিনা অবাক হয়ে দেখছে আগত নারীমূর্তিকে।ও শুনেছে বন্ধু বান্ধবীদের কাছে,আজ লক্ষ্মী পুজো।ওদের সবার ঘরে আজ নাড়ু ,মুড়কি,খিচুড়ি ভোগ হবে।পরদিন যখন উমা,লতিকা,লতা খেলতে আসবে,ওদের কোঁচড় ভরা থাকবে নাড়ু ,মুড়কি বা তিলা, কদমা,বাতাসায়।যার ভাগ পাবে আমিনাও,প্রতি বচ্ছরকার মত।ওরা সব খেলুড়ে বলে কথা!
কিন্তু ঠাকুর তো দেখেনি।তাই এখনও ভ্যাবাচ্যাকা! মা লক্ষ্মী চারিপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বলেন
-তা বাছা, তোমাদের এমন অবস্থা কেন ?
কাশির দমক সামলে ফাতিমা বলে
-মাগো তোমাকে যে কি বলতে হয় আমি জানিনা। কিন্তু আমরা বড় গরিব। আমিনার বাপটা মরে যাবার পর থেকে….
আর কথা শেষ করতে পারেনা। কাশির দমকে উপুড় হয়ে কাশতে থাকে।
মা লক্ষ্মী সব বুঝে বলেন
-আহা বাছা!থাক,আর কথা কইতে হবে না।তুমি ভালো হয়ে ওঠো।তোমরা মা মেয়েতে ভালো থাকো।
সঙ্গে সঙ্গে মায়ের আশীর্বাদের আলোয় সারা ঘর আবার আলোকিত হয়ে উঠলো।মা লক্ষ্মী ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে উঠোনে এসে চেপে বসলেন বাইরে অপেক্ষারত সাদা বাহনে।
ওমা !একি! ফাতিমার কাশি নিমেষে উধাও।দুবার ফাতিমা খক্ খক্ করে কাশবার চেষ্টাও করলো।কই!কাশি তো পাচ্ছে না!আর শরীরটাও বেশ তরতাজা লাগছে যে!বেশ অবাক হয় ফাতিমা!আমিনাও শোনে ফাতিমার সুস্থ সতেজ গলা !
-আমিনা!মা রে! আমি ভালো হয়ে গেছি রে মা
-তাই আম্মু!
অবিশ্বাস্য আনন্দে চেঁচিয়ে ওঠে আমিনা
-হ্যাঁ রে মা
ওদের অবাক হবার আরো বাকি ছিল।পরদিন ঘুম ভাঙতে না ভাঙতে,দরজায় ঠকঠক।
- এতো সকালে কে এলো রে আমিনা?
মা মেয়ে মুখ তাকাতাকি করে।
দরজা খুলতেই গোফুর চাচা!একটা কাপড়ের থলি এগিয়ে দেয়।
-এই নাও মা।হাসানের জমানো কিছু টাকা ছিল আমার কাছে।আমি গতকালই বিদেশ থেকে এসেছি।এসেই সব শুনলাম!বড়ই দুঃখ পেলাম।কাল ফিরতে অনেক রাত্তির হয়ে গিয়েছিল, তাই আসতে পারিনি।আজ ফজরের নামাজ সেরেই চলে এসেছি।এই নাও। ফাতিমা টাকার থলিটা হাতে নিয়ে ছলছল চোখে কাকে উদ্দেশ্যে করে যেন মাথা নোয়ায়।