|| শাম্ভবী সংখ্যা ২০২১ || T3 শারদ সংখ্যায় অমল বিশ্বাস

১/ অনেকদিন কলমে লিখি না
আমার জীবনবৃত্তান্ত দেখে
অনেক ডিরেক্টর বিশ্রী ঠোঁটে ভেঙচি কাটে,
আর সে কাটলো নাকে।
কম্পিউটারে কম্পোজ করিনি
এটাই হয়তো কারণ,
অবশ্য বিজ্ঞপ্তিতে বারণ ছিলোনা হাতে লিখবার।
সেই জীবনবৃত্তান্তটি
সারারাত্রি তাকে ব্যস্তচিন্তায় জাগিয়ে রাখলো
ঠোঁটে মাখলো হাতেরলেখা।
পরপর দু’দিন অফিস ছুটি,
একটি বাটিকপ্রিন্টের পাতলা সুতির পাঞ্জাবি
আর নীলসুতোর গুটি কিনলো।
অফিস খুলতে ইন্টারভিউ,
শার্ট-প্যান্টে দৈন্যদশার জন্মগত অভিশাপ নিয়ে
ভেঙচিকাটা নাকের সামনে দাঁড়ালাম।
একটি ভারি প্যাকেটের সাথে
হাতেলেখা যোগদানপত্র স্বযত্নে দিয়ে বললেন,
অনেকদিন কলমে লিখিনা।
ক্যালেন্ডারে আস্তেধীরে জন্ম নিলো
এপ্রিলের চৌদ্দ তারিখ,
হিরের নাকফুল তৈরি করতে দিলাম দোকানে।
২/ সময়ের শেষ সঙ্কট
চলো, মাটি খুঁড়ি।
খুঁড়তে-খুঁড়তে শেকড়ের শেষবিন্দু
কতোটা আদিমসভ্যতায় ছিলো,
পুরুষ, না স্ত্রী ছিলো
না পাতায় আচ্ছাদিত লজ্জায়
মানুষ ছিলো
আধুনিক পাথুরে রাস্তায় বিছিয়ে দিই,
সমাজ জানুক।
বর্তমান দেখুক
শোষকের নাটকীয় শেষ অধ্যাদেশ
মানববন্ধনে অত্যাচার;
অন্যদিকে মাইকে জংলি আহ্বান
হা-পিত্যেশ ধর্মের আচার,
অর্জিত পাপের প্রায়শ্চিত্তের অভিষেক
মন্ত্রের উৎকট চিৎকারে
বাতিল নিশ্বাসে বিষাক্ত বাতাস,
মুমূর্ষু মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত।
কী ভয়ংকর রূপ!
কার্পেটের নিচে শ্রমিকের ঠাণ্ডা লাশ
নীল আলোয় ঝলকে উঠে
দামি পতিতার মুখ,
নীতিনির্ধারকের হাতে টাকার বান্ডিল।
শেকড়ের সাথে মিল নেই
হাত-পা ছড়িয়ে থাকা অসভ্য বৃক্ষের,
বিষাক্ত বৃষ্টির জলে
গিলছে পূর্বপুরুষের সনাতন প্রেম;
মানবিক সত্যসভ্যতা নেই
কড়া নাড়ছে সময়ের শেষ সঙ্কট,
চলো, মাটি খুঁড়ি।
৩| ক’দিন বা বয়স!
ক’দিন বা বয়স!
বাবলা ফুল কুড়োতে গিয়ে
খাঁচার হলদে পাখি হয়ে যায়,
আকাশকে খোঁজেনা।
ঠোঁটে রঙ ধরেনি,
ঝরা বকুলের দিকে তাকিয়ে
গাছের প্রতি হিংসে হয়,
নিজেকে দেখেনা।
শৈশব কাটেনি
সন্ধি-বয়সের জ্ঞান না আসতে
তার নাম ‘মেয়ে’ হয়ে যায়,
গোল্লাছুট খেলেনা।
নষ্ট সম্ভ্রমের কথা
মা-পাখি জানতে পেরে বলে
চল্ অন্যলোকে চলে যাই,
সাহচর্য চায়না।
ক’দিন বা বয়স!
সবার সামনে মরে গিয়ে
কীটপতঙ্গের খাবার হয়ে যায়,
কেউ খোঁজ রাখেনা।
৪| নিরালোকে নিঃস্বার্থ সুখ
যদি ফের ফিরতে হয়
তোমার বুকের ঘর কিছুক্ষণ খোলা রেখো,
ভিতরে ঢুকবো না।
আমার শরীর এখন সরস মাটি
ঘাস গজাচ্ছে; তার উপর হাসছে সবুজ বন,
মধ্যবয়সী শ্রাবণমাসের মেঘের জলে
অর্ধেক মন হালকা হয়েছে;
বাকি অর্ধেকে ভালোবাসার বুকের ঘ্রাণ
আর শুকনো কান্নার ছোপ!
সমাধিক্ষেত্রে ধূপের গন্ধ
আর সলতে পোড়া আলোর শিষে
মাঝেমধ্যে কেউ হাতের তালু গরম ক’রে
ছুঁয়ে দিচ্ছে মাটির বুক,
অশরীরী আত্মায় এ’ এক বিরাট প্রাপ্তি
আত্মবিশ্বাসী আশির্বাদ।
ভালোবাসায় দূরত্ব রেখো
যেমন ভরা-পূর্ণিমায় জলের জোয়ারভাটার
চঞ্চলতাকে থামিয়ে দেয় সময়,
মৃত্যু নিয়ে গবেষণায় বাড়ে শূন্যতাবোধ;
ধ্রুবসত্যের সাথে যুদ্ধ
মায়ার সাথে একধরনের মিথ্যে বন্ধন।
এখানে কোনো বৈষম্য নেই;
শরীরচ্যুত স্বাধীন আত্মাদের গল্পকথায়
জাগতিক সুখ-দুঃখের রূপ নেই,
যখন সাদাকাপড়ে মোড়া ঠান্ডা শরীর আসে
আমরা হাততালি দিই;
বোকা লাশবাহকের দল তখন কাঁদে।
ফের যদি জন্মাই
ভুল-আনন্দে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরো না,
হুট করে চলে যাবো কিন্তু।
৫| একাকী একক
মুখ কালো কেনো!
ঘুম হয়নি,
শুধু ঘর, আমি আর অঢেল অন্ধকার।
লালদোপাটি ফুলের মতো
একটি ঝিনুকের বুক খুলতে গিয়েও
সে না খুলে বলেছে কিছুক্ষণ বৃতির মধ্যে থাক,
মুক্তো আহরণ না হয় পরে করা যাবে।
আমার অগোছালো চুলে নিজে চমকে উঠি
কেউ বাঁধতে বলেনা,
আর বুকে সেই একচিলতে কাপড় ঝুলিয়েছি
কেউ উড়িয়ে দিতে বলেনা
ডুমুরের ফুলের মতো এখনও অগোচরে আছি
কল্পনার সমুদ্রদিঘল জলরাশিতে
কোনো প্রেমিক আসেনা।
মুখ কালো কেনো!
জেনে কি লাভ,
একা একা আর কতক্ষন কথা বলা যায়!