– ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে ট্রেনের যাতায়াত দেখে মনে হয় কত বেহিসাবি মুহূর্ত যেন শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে আর আসছে।
– রেললাইন গুলো ওদের কেমন বেঁধে রেখেছে, তাই না আরিফ?
– হ্যাঁ, কিন্তু আটকে রাখেনি। হিজবুল গ্রুপ ছেড়েও তার ভয় যে আমায় নিজের মধ্যেই বন্দী করে রেখেছে, আফরোজ! কতো বোমাবাজি আর হত্যা কাণ্ডের সাথে জড়িয়ে গেছি কাশ্মীর কে আজাদ করার অঙ্গীকারে।তোমাকে পাওয়ার পর এখন রক্তের রং যেন ঘন নীল মনে হয়, গভীর।
– এতো বৃষ্টিতে ঝাপসা ট্রেনগুলো যেন দূরত্বকে আকার দিতে চায়। জলছবি আঁকতে চায় আমাদের ব্যবধানের যন্ত্রনার। আরিফ, সেই পোর্ট্রেট আঁকা আর কতটা বাকি?
– আজকাল মন বসে না, ছবিটার চোখের তারায় হাসির আবডালে যে যন্ত্রণার রঙ ফুটিয়ে তুলতে চাই, কিছুতেই হয়না মনের মতো। আফরোজ…..,
– এইই…কি হচ্ছে,..….সবাই দেখছে তো….,
– কোনো কথা নয়, তোমার বৃষ্টি ভেজা বুকে ঝিলাম নদীর কান্না শুনতে পাচ্ছি… কাশ্মীরের উপত্যকার উদাসীন রূপ কেমন ছেয়ে যাচ্ছে ওই রেললাইন পার করে অনেক দূর পর্যন্ত, বৃষ্টির ঝাপসা ওড়না গায়ে।
– আরিফ, এই সুন্দর জীবন ছেড়ে আর ওই হিজবুল মুজাহিদীন এ যুক্ত হয়ো না। আমরা দুজন এক ছোট্ট ঘর বাঁধব এই স্বর্গের শহরে।
– হ্যাঁ আফরোজ, আমি আত্মসমর্পণ করব, কিছু একটা কাজ হয়তো জুটিয়ে দেবে ভারতীয় সেনা আমায়।
পাঁচ বছর পর এক আন্তর্জাতিক শিল্প অনুষ্ঠানে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরষ্কার পেল আরিফের আঁকা সেই পোর্ট্রেট। মঞ্চে পুরষ্কার নিতে এসে কান্না মিশ্রিত স্বরে সে বলল,” পোর্ট্রেটের এই চোখ আমি কিছুতেই পারতাম না ছবিতে প্রকাশ করতে, যদি না সেদিন……, আমার দুহাতের নিবিড় বন্ধনে… আমার আফরোজ.…, ওর দু চোখে তখন এক আসমান ভরা খুশী, আমাদের ঘর বাঁধার স্বপ্ন……, হঠাৎ কোথা খেকে একঝাঁক গুলি বর্ষন ওর ওপর,” একটু থেমে আরিফ আবার বলতে থাকল,” কিছু বোঝার আগেই ওর ওই বাদামী খুশী-ভরা চোখে লাল-হলুদ যন্ত্রণা ছেয়ে গেল… ওর চোখের কোনা থেকে ক’ফোঁটা নীলচে স্বপ্ন গড়িয়ে আমার রক্ত মাখা হাতে এসে পড়ল।
আফরোজের খুব ইচ্ছা ছিল এই পোর্ট্রেটটা যেন খুব জীবন্ত হয়।”
আর একটাও কথা বলতে পারল না আরিফ। ওর আকুল কান্নার প্রতিধ্বনি হতে থাকল লাউডস্পিকারে সারা হল জুড়ে। হাততালি না দিয়ে সকল দর্শক নীরবে উঠে দাঁড়ালো।