সাপ্তাহিক টুকরো হাসিতে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – চল্লিশ

টুকরো হাসি-চল্লিশ

দু’টো রেডিও বাজুক

একটা রেডিও কিনে বাড়ি ফিরলেন আদিনাথ। এত বছর চাকরি করে অবসর নেওয়ার দিনটায় মন খারাপ ছিল। অফিসে যাতায়াত করে অনেকটা সময় বাইরে কেটে যেত। ঘরে থাকtতেনই বা কতক্ষণ। তাতেও শান্তি নেই।
বাড়িতে টিভিতে যে খবর দেখবেন তার উপায় নেই। যদিও তা দেখতে ইচ্ছে করে না। কত রকম চ্যানেল। একটা খবর এক একজন নানাভাবে বলে। কোনটা যে ঠিক তা বুঝতে গেলে মাথায় তালগোল পাকিয়ে যায়। সেগুলি দেখে যে নিজের মতো করে সাজিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করবেন তার উপায় নেই।
কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যা তা বুঝে ওঠা সহজ নয়। অন্যের বাড়িতে আগুন লাগলে সেটা একজনের কাছে ছোটো ঘটনা, আর নিজের বাড়িতে জোনাকি ঢুকলে আগুন আগুন বলে চিৎকার শুরু করে। কে যে কি বলতে চায় বোঝা যায় না।
এখন শোনা যাচ্ছে নকল ওষুধের মতো ভ্যাকসিনও নাকি নকল। কোথা থেকে কত ভ্যাকসিন এসেছে কেউ হিসেব দিতে পারছে না। আদিনাথ ভাবেন আর নিজের হাত দেখেন। অত যে মাইক বাজিয়ে ঘটা করে হাতে ফুঁড়ে দিল সেটা কি তবে ভ্যাকসিন ছিল না?
ভাগ্য ভালো যে টিভির খবর রমলা দেখে না। এসব শুনলে বাড়ি মাথায় তুলত। কে কোথায় টাকা লুকিয়ে রেখে জেরার মুখে, কে নকল ভ্যাকসিন দিচ্ছে,কারা চাকরি পাচ্ছে না বলে রাস্তায় শুয়ে বলছে না খেয়েই মরবে এসব দেখতে ভালো লাগে না।
রমলা শুধু নাচ,গান আর সিরিয়াল দেখে। একটি মেয়ের দুটি বর। একটি লোকের বউ আর প্রেমিকা। একজন অপরের রান্নায় নুন ঢেলে দিচ্ছে। কেউ তার বউদির আঁচলে আগুন লাগাচ্ছে। নতুন বউ বাড়িতে আসতেই শাশুড়ি অস্ত্র হাতে নেমে পড়েছে ময়দানে। ওফ্‌ তারপর কি খেলা! যেভাবে বউ এগুচ্ছে মনে হচ্ছে এই বউই পরে শাশুড়িকে টাইট দেবে। ওই সময় টিভিতে খবর দেখতে চাওয়া মানে আগুনে ঘি।
রেডিওটা কিনে খুব দোটানায় ছিলেন আদিনাথ। রমলাকে কি বলবেন। এ তো চকলেট নয় যে লুকিয়ে খেয়ে ফেলবেন। সিগারেট ধোঁয়া ছাড়ে, নস্যির বিটকেল গন্ধ। তাই সেগুলির মায়া ত্যাগ করতে হয়েছে। এ রেডিও তো কাঁই না না করে বাজবে। তখন কি হবে?
রেডিও নিয়ে ঘরে ঢোকার পর সেটা দেখে রমলা বলল, ‘এটা তোমাকে অফিসের লোকজন দিল?’
আদিনাথ বেঁচে গেলেন। আজকের দিনে এই সামান্য উত্ত্রটা তাঁর মাথায় আসেনি। বিয়ের পর মাত্র দু’বছর নিজের জন্য কিছু কিনেছিলেন তিনি। তারপর রমলা বলেছে, ‘তোমার কিছু দরকার হলে আমাকে বলবে। যদি মনে হয় কেনা দরকার আমি কিনে দেব।’
এই কথা শুনে আর ইচ্ছে করেনি নিজের জন্য কিছু কিনতে। একবার খুব কাশি হচ্ছিল। তাই মাইনের দিন একটা কাশির সিরাপ কিনেছিলেন।
সেটা দেখে রমলা বলেছিল, ‘বাজে খরচ না করে আমাকে বললেই পারতে। আমি তুলসীপাতা, তেজপাতা,আদা, গোলমরিচ দিয়ে এমন একটা সিরাপ বানিয়ে দিতাম খেয়ে দেখতে পনেরো মিনিটে তোমার কাশি গায়েব হয়ে যেত।’
আদিনাথের কিছু বলার ইচ্ছে হয়নি। মনে মনে ভেবেছেন আমাকে বলতে হবে কেন। ক’দিন ধরে হ্যাং গ্যাং করে কেশে যে পাঁজর ব্যথা হয়ে গেল তা শুনতে পায়নি! একই ছাদের তলায় থেকে এসব নজরে পড়েনি? এ কথা কাকে বলবেন? বোঝার মতো মানসিকতা আর নেই। রমলা এখন মেয়ে জামাই, ছেলে বউমা নাতি নাতনি নিয়ে ব্যাস্ত। এখন বাড়িতে তিনি কেমন আছেন একথা জানতে চাওয়ার বান্ধব নেই।
রমলা এখন যত কথা বলে সব প্রয়োজনের কথা। কথা শুরু করলে আর থামতে চায় না। বলেই চলে। রমলার মুখের কথার কোনো রিমোট তো তাঁর হাতে নেই যে অন্য কথা শোনা যাবে। রমলা এক লাইনের কথা একশো লাইন করে শোনাবেই।
রেডিওর সঙ্গে এখন ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে আদিনাথের। খবর শুনবার সময় বিরক্তিকর মুখগুলি দেখতে হয় না। রমলা জানে এটা আদিনাথ নিজের টাকা দিয়ে কেনেননি। তাতেই খুব খুব খুশি। নিজের শান্তির বিনিময়ে এই অসত্যটুকু বলতে হয়েছে।
তিনি রেডিও নিয়ে ভালোই আছেন। যেটা শুনতে ভালো লাগে না সেখান থেকে চলে যান অন্য কোথাও। পুরোনোদিনের গান, নাটক এসব শুনলে মনে হয় সেই বয়স ও সময়টাতে চলে গিয়েছেন।
এরই মধ্যে মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ে রমলা। বলে, ‘আমার তো খেয়াল ছিল না বাড়িতে নুন নেই। সবার কাজ আছে। সবাই তো তোমার মতো শুয়ে বসে থাকে না। চট করে দোকান থেকে নুন এনে দাও। না অলে আজ নুন ছাড়াই সব খেতে দেব তোমাকে।’
এত কথা বলার দরকার ছিল না। তিনি চিরকালের বাধ্য স্বামী।
রেডিও আগেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মনে মনে শচীন কর্তাকে বললেন, দাদা একটু যেতেই হচ্ছে।
বিকেলের দিকে আবার রমলা এল। রেডিও বন্ধ করলেন আদিনাথ।
রমলা বলল, ‘আমাদের বউমার মেজো বোনের বিয়ে। ওরা আজ আসবে নিমন্ত্রণ করতে। দাড়ি কামিয়ে একটু ভদ্র ভাবে থেক। ভিখিরির মতো চেহারা নিয়ে সবার সামনে এসো না। বলে গেলাম।’
রমলা ঘরে ঢুকতেই রেডিওটা চট করে বন্ধ করে দিয়েছিলেন আদিনাথ। রমলা বেরুতেই সেটা চালাবার আগেই আবার ঘরে ঢুকল। বলল, ‘তোমার পাজামা পাঞ্জাবি বের করে রেখেছি। এখন তো ছোটোদের হাতেও মোবাইল। ওরা যখন তখন ছবি তুলছে। মুখটা ঠিক করে রেখো। এইরকম তুবড়ে রেখো না যেন। ছবি বউমার আত্মীয়দের মধ্যে ভাইরাল হলে সবাই দেখবে একটা খনখনে বুড়ো আমার পাশে। সবাই বউমাকে বলবে এ মা তোর শ্বশুর এইরকম?’
একটা সুন্দর হিন্দি গান হচ্ছিল। ওই গানের সঙ্গে মনে পড়ছিল বন্ধুরা মিলে সিনেমা দেখার দিনগুলির কথা।
ওই গানের এভাবে ছন্দপতন হল! রেডিওর দিকে তাকালেন আদিনাথ। সেদিকে নজর পড়তে ঘুরে দাঁড়াল রমলা। বলল, ‘কি ব্যাপার বল তো? আমি ঘরে ঢুকতেই তুমি রেডিও বন্ধ করলে কেন?’
আদিনাথা বললেন, ‘বাজ পড়ার সময় রেডিও চালিয়ে রাখা ঠিক না।’
‘তোমার কি মাথাটা একেবারে গেছে? তুমি বাজ পড়তে দেখলে কোথায়? কি সুন্দর ঝকঝকে দিন। বউমার বাপের বাড়ির লোকজন দেখে বুঝেই বাইরে বেরোয়। তোমার মতো কাছাখোলা কেউ না। আর একটা কথা শুধু এখনই না, খেয়াল করেছি আমি ঘরে ঢুকলেই তুমি রেডিও বন্ধ করে দাও । কেন বল তো?’
আদিনাথ বললেন, ‘আমি চাই না যে একসঙ্গে দু’টো রেডিও বাজুক।’
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।