রবিবারে রবি-বার এ মৃদুল শ্রীমানী

মৃত্যুর নিপুণ শিল্প – ১

জীবনের শেষ কবিতাটি ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ১৪ শ্রাবণ তারিখে নিজের পৈতৃক গৃহে মৃত‍্যুশয‍্যায় লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিতাটির একটি নাম আছে, “তোমার সৃষ্টির পথ”। এই কবিতাটি লিখেছিলেন বলাটা তথ‍্যগত দিক দিয়ে যথাযথ হল না। কবি মুখে মুখে বলে গিয়েছিলেন, লিখে নিয়েছিলেন এক ঘনিষ্ঠ আপনজন, রাণী মহলানবীশ, অর্থাৎ বিশ্ববিখ্যাত প্রশান্ত মহলানবীশ মহাশয়ের পত্নী নির্মলকুমারী। রবীন্দ্রনাথের মৃত‍্যুশয‍্যায় লেখা কবিতাগুলি তাঁর প্রয়াণের পর ‘শেষ লেখা’ কাব‍্যগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এই লেখাগুলিকে তাঁর স্বীকারোক্তি বা কনফেশন বললে ভুল হবে না। সমগ্র জীবন যেভাবে যাপন করেছেন, অভিজ্ঞতাগুলি কঠিন স্ফটিকের মতো কেলাসিত হয়ে ধরা পড়েছে কবিতাগুলিতে। শেষ কবিতাটিতে তিনি এক বিচিত্র ছলনার কথা বলেন।
এক ছলনাময়ীর কথাই বলতে থাকেন। কবি বলেছেন, সৃষ্টির সমগ্র পথ এক বিচিত্র ছলনাজালে আকীর্ণ। সেখানে মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ। সেখানে মহত্ত্বকে প্রবঞ্চিত হতে হয়। কবি যেন অনুভব ক‍রেন, সৃষ্টির কাছে মহতের পরম প্রাপ্তি সেই প্রবঞ্চনা। সাধারণ লোকের কাছে এই মহৎ মানুষ বিড়ম্বিত ব‍্যক্তিত্ব বলে পরিচিত। কিন্তু কবির বিশ্বাস কিছুতেই মহৎকে শেষ হিসেবে প্রবঞ্চনা করা যায় না। তার অন্তর চিরস্বচ্ছ। সহজ বিশ্বাসে চিরসমুজ্জ্বল। যে পুরস্কার সে পায়, তা বুঝি শান্তির অক্ষয় অধিকার।
এইসব বাগ্ বিন‍্যাস এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে করে যেতে থাকেন কবি। কবি আদৌ কিছু বলেন কি? না কি, তাঁর চেতনার অন্তঃস্থল থেকে উদ্গীর্ণ হয় তাঁর গোটা জীবনের অভিজ্ঞান।
“তোমার সৃষ্টির পথ” কবিতায় যে ছলনাময়ীর কথা বলেন, তিনি যেন সমস্ত বিশ্বের সৃষ্টিকারিণী। জ‍্যোতিষ্কগুলিও তাঁর পরিচালনাধীন। তিনি তাঁর সৃষ্টির পথ আকীর্ণ করে রেখেছেন বিচিত্র ছলনাজালে। এই কবিতায় বারে বারে ছলনাজাল, মিথ‍্যা বিশ্বাসের ফাঁদ, প্রবঞ্চনা, বিড়ম্বিত, এই ধরনের শব্দগুলি তিনি বলেছেন। আর এই ছলনাময়ীর সঙ্গে কবির খেলা। কবি সরল জীবন চেয়েছেন, কিন্তু দেখেছেন চতুর্দিকে মিথ‍্যা বিশ্বাসের ফাঁদ। লোকের চোখে কবি কুটিল বিড়ম্বিত। ছলনাময়ীর কৌশলে  কবির কোনো গোপনীয়তার সুযোগ নেই। আড়াল নেই। কিন্তু নিজের সহজ বিশ্বাসে জ‍্যোতিষ্কের আলোয় নিজের অন্তরের পথ চিরস্বচ্ছ করে পেয়ে তাকে চির সমুজ্জ্বল করেছেন কবি। উচ্চারণ করেছেন, ‘সত‍্যেরে সে পায় আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে’। ছলনাময়ীর এত রকম ফাঁদ ও প্রবঞ্চনা সত্ত্বেও কবির উপলব্ধি যে, এই ছলনা অনায়াসে সহ‍্য করতে পারলে শান্তির অক্ষয় অধিকার পাওয়া যাবে ওই ছলনাময়ীর হাত থেকেই।
মৃত্যু নিয়ে রবীন্দ্রনাথ একেবারে প্রথম থেকেই ভেবেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সঞ্চয়িতা’র কবিতাগুলি সংকলনের ভার নিজে নিয়েছিলেন‌। নিজের যে রচনাগুলি সত‍্য সত‍্যই কবিতা হয়ে উঠেছে বলে তিনি মনে করেছেন, সেগুলিই তিনি সঞ্চয়িতায় চয়ন করেছেন। সঞ্চয়িতার একেবারে প্রথমে “ভানুসিংহের পদাবলী” থেকে ‘মরণ’ কবিতাটি রেখেছিলেন। ভানুসিংহের পদাবলীর কবিতাগুলি ১২৮৮ ব‌ঙ্গাব্দের শ্রাবণ থেকে শুরু করে ১২৯২ বঙ্গাব্দকালীন মুদ্রিত‌। আর সঞ্চয়িতা প্রথম প্রকাশ পেয়েছে ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে। মাঝে মাত্র পঞ্চাশ বছরের ফাঁক। লেখার পঞ্চাশ বছর পরেও যখন মরণ কবিতাকে  সার্থক একটি সৃজন বলে চিহ্নিত করেন কবি রবীন্দ্রনাথ, তখন পাঠকের ঔৎসুক‍্য থাকবে সঞ্চয়িতার এই সর্বপ্রথম কবিতায়। নিজেকে নিয়ে মজা করা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল। ‘জীবনস্মৃতি’তে নিজের কলমে তিনি নিজের পদাবলীকে বিলিতি অর্গানের টুং টাং বাজনা বললেও, সঞ্চয়িতার একেবারে প্রথমে ‘মরণ’ কবিতাটিকে জায়গা দিয়ে তার গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন। ওখানে  রাধা কৃষ্ণের প্রেম অভিসারের অনুষঙ্গে নিজের কথা বলেছেন। মাধব এবং শ‍্যাম, দুজনে পৌরাণিক বিচারে একই অস্তিত্ব হলেও ‘মরণ’ কবিতায় দুটির পার্থক্য গড়ে মরণের সঙ্গে শ‍্যামকে অভিন্ন দেখেছিলেন।
বৈষ্ণব পদাবলীর পরিশ্রমী পাঠক শ্রীরাধার অভিসার যাত্রার পদগুলি জানেন। অভিসারে যাবেন বলে রাধার কতরকম প্রস্তুতি। বনের অন্ধকার পথে কাঁটা এবং খোঁচা থাকতে পারে। পথ বৃষ্টিতে কাদায় পিছল থাকতে পারে। তাতে যেন বাধা বলে ধৈর্য অপনীত না হয়, সেজন্য মাটিতে কাঁটা পুঁতে কলসির জল ঢেলে কাদা করে অনুশীলনে মেতে ওঠেন শ্রীরাধিকা। নিজের পায়ের নূপুরগুলি যাতে বেজে উঠে সমস‍্যা না তৈরি করে, তাই কাপড়ের টুকরো দিয়ে সেগুলিকে বাঁধেন। এমনকি সাপকে কিভাবে বশ করলে সে আর কামড়াবে না, সেই কৌশল‍ও শিখেছিলেন ভক্ত বৈষ্ণবের রাধা। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাধা বলছেন, “ভয়বাধা সব অভয়মূর্তি ধরি / পন্থ দেখায়ব মোর”। এই কবিতা যেন ‘তোমার সৃষ্টির পথ’ কবিতায় জ‍্যোতিষ্ক আলোয় চিরস্বচ্ছ, চির সমুজ্জ্বল পথ খুঁজে নেবার কথা মনে করিয়ে দেয়।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।