সত্যিই আজব শহর বটে কলকাতা। জঙ্গলে ঘেরা অচ্ পাড়াগাঁ থেকে চোখের পলকে ঝকঝকে নগরী। জঙ্গল সাফ করে বড় বড় রাস্তা। এমনকি খাল বিল বুজিয়ে সে এক মহাযজ্ঞ বটে। কোম্পানিকে একরকম গড়ে তুলতেই হবে মহানগরী। বাংলার নবাব, দেওয়ানের চোখে ধুলো দিয়ে চটজলদি প্রতিদিন বদলে বদলে যায় শহরের রূপ। এমনকি শোনা যায় আজকের বাবুঘাট অঞ্চলের কাছ থেকে একটা প্রকাণ্ড খাল গঙ্গা থেকে আলাদা হয়ে সোজা গিয়ে পড়ত লবনহ্রদে। বর্তমান কলকাতার ক্রিক রো, উল্টোডাঙা তারই পরিচয় বহন করে চলেছে। তো রাতারাতি বুজিয়েও দেওয়া শুরু হল সেই খালও। দিনে দিনে অভিজাত বাবু ও ইংরেজ উমেদারদের ভাঁড়ামির পরিমাণও বাড়তে থাকলো। সুখে দিন কাটাতে হলে সন্তুষ্ট রাখিতেই হবে জমিদারকে। আর তেমন ভাবেই বিলিতি জমিদারের কাছে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদ নেশার মত চেপে বসলো কলকাতার বাবু সমাজের। ‘হুতুম পেঁচার নকশা’, ‘আলালের ঘরের দুলাল’, ‘নববাবুবিলাস’, ‘আপনার মুখ আপুনি দেখ’ এইসব প্রামাণ্য গ্রন্থে সেই সামাজিক পরিস্থিতির কথা বিষদে উঠে এসেছে। তাই দেখা যেত নব্য বাবু সমাজে সবকিছুই ছিল প্রচলিত ধ্যানধারণার উল্টো। সেই পরিপ্রেক্ষিতে লোকে বলতো –
“কলকাতা বলে কথা
আগে বেরোয় হাত পা, শেষে বেরোয় মাথা।”
আবার এমন উদ্ভুত সমাজের বিসদৃশ বোলচাল নিয়ে কথিত ছিল –
“কলকাতার ছিষ্টি, গুড়ে নেই মিষ্টি
তেঁতুলে নেই টক, কলকাতার ঢপ।”
কলকাতার বাবুদের এমন সৃষ্টিছাড়া জীবন উঠে আসত কালীঘাটের বিখ্যাত পটশিল্পেও। প্রথমে হিন্দু দেবদেবীর ছবি দিয়ে পট তৈরির প্রচলন থাকলেও পরে তৎকালীন সামাজিক ব্যঙ্গাত্মক ছবি ফুটে উঠতে শুরু করে সেইসব পটে। তীর্থযাত্রীরা তীর্থের স্মৃতি হিসাবে কিনে নিয়ে যেতেন সেইসকল পট। কলকাতার নব্য সংগঠিত বাবু সমাজে নিজের মর্যাদা তুলে ধরতে বাবুরা রক্ষিতা পর্যন্ত রাখতেন বলে জানা যায়। নিয়মিত যেতেন গণিকার ঘরে। এমনই ছিল আজব কলকাতার হালচাল। সমস্ত বাংলার রক্ষণশীল সমাজ তখন ‘গজিয়ে ওঠা’ কলকাতার নব্য কালচার দেখে বলতো –
“মিথ্যে কথার কিবা কেতা
আজব শহর কলকেতা।”
অথবা
“রাঁড়, ভাঁড়, মিছে কথা
এই নিয়ে কলকাতা।”
এইসব ছড়া থেকে কলকাতার তৎকালীন সামাজিক ছবিটা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। নিজের প্রতিপত্তি ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এইসমস্ত বাবুরা মিথ্যে আর লোকদেখানো গালগল্পের ওপর দিনের সিংহভাগ সময় মেতে থাকতেন। তৎকালীন এইসব চলতি ছড়াগুলো সেই সামাজিক অবস্থানেরই ছবিটা খুব স্পষ্ট ভাবে তুলে আনে আজকের আধুনিক বাঙালী সমাজের সামনে।
ক্রমশ…
চিত্র – কালীঘাটের পটে উঠে আসা তৎকালীন বাবুদের কিছু জীবনযাপনের ছবি।