শিল্প টিল্প করা খুব ঝামেলার জিনিস। করিও না আজকাল। তবে আজ সকাল থেকে যা বৃষ্টি, তাতে খিচুড়ি পাবার কথা। আমার শিল্প পেল। একমাত্র বরের ওয়র্ক ফ্রম হোম। তাকে ছাদের ঘরে পাঠিয়ে ঘন্টা দুয়েকের শিল্পছুটি পাওয়া গেছে। দুপুরে খিচুড়ি চাপালেই হবে। চাল-ডাল সিদ্ধ তো। ও যেমন তেমন হলেও ডিম ভাজা দিয়ে না জমে উপায় নেই। ঐ রান্নায় আমি দ্রৌপদী।
সাধে কি আর বলে, ‘ তুমি যাও বঙ্গে কপাল যায় সঙ্গে ‘ সাড়ে দশটা নাগাদ ফোন। ট্রু কলার এ সুচিত্রা। কে সুচিত্রা? কোন সুচিত্রা?
– অ পূর্বা দি, আমি নতুনপাড়ার সুচিত্রা গো। চিনতে পারছ না? ঈশিতার মা। তোমার কাছে পড়তো ঈশিতা, মনে পড়ল?
তিনজন ঈশিতার কথা মনে পড়ছে। এ কোন জন, কে জানে! একটু খেজুর করতে হল।
– হ্যাঁ হ্যাঁ কেমন আছে ও? কি করছে এখন? গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হল?
– ভাল আছে গো তোমার ছাত্রী। সে তো চাকরি করছে এয়ার ইন্ডিয়ায়। পুনেতে থাকে এখন। শোনো না, আমার এক বৌদি এসেছে। ফিরেই যেত আজ। বৃষ্টির জন্য আটকে গেছে বেচারী। তোমার বাপের বাড়ির মানুষ। কথায় কথায় বলল তোমার কথা। শুনেছে তুমি এদিকেই থাকো। আমরা যাচ্ছি কিন্তু একটু পরে।
সব্বনাশ! এ ভরা বাদরে কিভাবে সাদরে বরণ করব অতিথি? বরকে তো এখন ভূমিকম্প হলেও নড়ানো যাবেনা একচুল। উপায়! মনে পড়ল গত সপ্তাহে ভুবনেশ্বর থেকে এসেছিল পোড়া ক্ষীরের সন্দেশ। তিনিই এনেছেন। অফিসের কাজে গিয়েছিলেন দুদিনের জন্য আর কাস্টার্ড আছে। ড্রাই ফ্রুট টুট মিশিয়ে চালিয়ে দেব। মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয়ে আবার শিল্পকুঞ্জে ফিরলাম। এক ফুটের একটা বাঁশের টুকরো ছিল। সেটাকে ফ্লাওয়ার ভাস এর রূপ দেবার চেষ্টা। প্রাইমার লাগিয়ে লতাপাতার পেন্সিল স্কেচ কমপ্লিট। মুশকিল হচ্ছে রাউন্ড শেপ এর জন্য রংটা একেবারে বেশি চাপানো যায় না। শুকিয়ে নিতে হয় বারবার। সে সময়টায় রংটং মেলানোর এক্সপেরিমেন্ট করি। প্রায় শেষ হল ব্যাপারটা যখন ঘড়িতে দেখি বারোটা পাঁচ। সেকি! দুয়ারে অতিথি তাহলে কবে, কখন? এর পরে কি পোড়া ক্ষীরে কাজ চলবে! দেশের মানুষ বলে কথা। সাড়ে বারোটা বেজে তিন মিনিটে টিংটং। সুচিত্রাকে চিনেছি, সাথে মোটাসোটা মহিলা – মুখ চেনা খুব। নাম মনে করতে পারছিনা।
– ও মনি দি, চিনতে পারছ না তো! আমি রিমি গো। সঞ্চিতা দের পাশের বাড়ি।তুমি কিন্তু একদম একইরকম আছ।
– আরে হ্যাঁ রিমিকে চিনব না, তা হয়! আয়, আয় বোস। কতদিন পরে দেখা।
সুচিত্রা ঢুকল না। ছেলে রয়েছে বাড়িতে। শাশুড়ি শ্বশুরকেও দুপুরে ভাত বেড়ে দিতে হবে। বলল,
– তুমি একটা টোটোতে বসিয়ে দিও বৌদিকে। এইতো পাশের পাড়া।
ততক্ষণে আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছি। মানে, মনে মনে আর কি। মুখে তো সৌজন্য চালাতেই হবে।
– কাকু, কাকিমা? ও আচ্ছা। বাচ্চারা ? সেইন্ট অ্যাগনেস? বাঃ!
হিসেব চলছে জোর কদমে। খিচুড়ি তো চলবেই না। ফ্রিজে ইলিশ আছে জানি। স্টেটাস জানি না। ল্যাজা মুড়ো রেখে দিই শাক দিয়ে হবে বলে। বাকি… হে ভগবান, উদ্ধার করে দাও। সিন্নি, ইয়ে কাস্টার্ড খাওয়াব।
এবারে মনে পড়েছে ভাল করে। কিশোরী বেলায় এই মেয়ে মডেলিং করত। জুতোর, সাবানের, মশা মারা ধুপ, আরো কি কি যেন। লোকাল সিনেমা হলে দেখা যেত ওকে সিনেমা শুরুর আগে। এখনো সেসব করে টরে কিনা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে গিলে নিলাম ।পাঁচ ফুটিয়া আমার ওজন সত্তর কেজি। ও আরো ইঞ্চি দুয়েক কম। পরিধিতে দেড়গুণ তো বটেই।
– কফি খাবি রিমি, নাকি একেবারে লাঞ্চ করব একসাথে ?
– না, না কফি টফি ছাড়ো। একটু জল খাওয়াও। ঠান্ডা দিও না কিন্তু।
দুটো পোড়া ক্ষীর গেল। তা যাক। এমন কত যায়। যাই, এবার ইলিশের ষষ্ঠীপুজো শুরু করি। ঘুষের কথায় আজকাল সাধুসন্তও নড়ে চড়ে বসে ভগবান তো কোন ছার! ভালো পিস ছিল ইলিশের গোটা আটেক। সর্ষে পোস্ত দিয়ে ভাপা ইলিশ বসিয়ে দিলাম। একপাশে বাঁশকাঠি চালের ভাত ফুটছে। ঘরে এসে দেখি রিমি আমার সদ্যসমাপ্ত শিল্পকীর্তি নিয়ে বেশ গদগদ মুখে নেড়েচেড়ে দেখছে।
– মনি দি, এটা নিশ্চয়ই তুমি আঁকলে। কি অপূর্ব হয়েছে গো।
আমিও বিনয়ে বিগলিত হই।
– না, না এ আর এমন কি!
– এটা আমি নিয়ে যাব। তোমার হাতের তৈরি জিনিস। স্মৃতি থাকবে। আবার কবে দেখা হবে তোমার সাথে কে জানে।
এবার ঘাবড়েছি। এ স্বভাব রিমির চিরকাল। ছোটবেলায় পুজোসংখ্যা গুলো নিয়ে যেত। ফেরত আনতে কালঘাম ছুটত। তাছাড়াও প্রচুর কমিকসও হাতিয়েছিল। কতদিন বাদে একটু সৃষ্টি সুখের আনন্দ…আর এ বলে কি!
– হ্যাঁ… তা রিমি আসলে কি ওটা তো এখনো কমপ্লিট হয়নি; আর একটু টাচ আপ লাগবে।
– তুমি করো না। আমি তো আছি সন্ধ্যা পর্যন্ত।
সারসে কাম! আমার শিল্পীসত্ত্বা অস্তমিত। মানবীসত্ত্বা জেগে উঠেছে।
– দিতে পারলে তো ভালই হত, আসলে হয়েছে কি জানিস…
আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রিমি বলে,
– তুমি জানো না আমার জন্মদিন আজ? ভুলে গেছো ? সুচিত্রা তো পায়েস ও বানিয়েছে আমার জন্য। আবদার করে চাইছি আজকের দিনে, আর তুমি…
ওর জন্মদিনের খবর আমার জানার কথা, কি জানি! কিন্তু আমি এবার মরীয়া।
– শুনবি তো পুরোটা। ওই বাঁশের টুকরোটা আমার বরের এক কলিগ আমায় দিয়েছে। মানে ঠিক দেয়নি, আমি চেয়ে নিয়েছি। গতমাসে ওরা মনিপুর গিয়েছিল সাইটের কাজে। ফেরার সময় কি ঝামেলা। মনিপুর পুরো লকডাউন। কি অবস্থা! একটা গাড়ি স্পেশাল পারমিশন করে দিল। আসার সময় গেস্ট হাউসের মালিক বাড়ীতে তৈরি কিছু খাবার সাথে দিয়েছিল। ওই বাঁশটার মধ্যে মাংস ছিল। ওটা নাকি ওভাবেই রান্না হয়। তবে কিসের মাংস জানিনা। ওরা তো শুয়োর কুকুর বেড়াল সব খায়।
– ইসস! এঁটো জিনিসটা তুমি নিলে?
– না, না ধুয়ে নিয়েছি তো। কেন থালা বাসন মেজে আবার সাজিয়ে রাখি না আলমারিতে?
– তা ঠিক। তুমি যখন বলছ ভালো করেই ধুয়েছ নিশ্চয়ই।
– তবে আরেকটা কথা আছে। যেখানে ওরা ছিল সেখান থেকে এয়ারপোর্ট সাত আট ঘন্টা লাগে, বুঝলি। ওই ছেলেটা আবার ঝাল মাংস খেয়েছে গাড়িতে। আর যায় কোথায়! ভাগ্যিস লোকজন কম আর পাহাড় জঙ্গলের রাস্তা। ঐটা দিয়েই ও আর কি… মানে ঝর্ণা থেকে জল নিয়ে… পরিষ্কার তো হতেই হয় তাই না! আর একবার না, মোট ন ‘ বার গাড়ি থামাতে হয়েছিল। আমি তো তখন জানতাম না। এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম ওদের পিক আপ করতে। তখন দেখি ওটা ওর হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে। চাইলাম। ও দিয়েও দিল। পরে আমার বর বলে এই কাণ্ড।
– ও মনিদি ! ইহঃ! উঃ! ও বাবাগো! তোমার বেসিন কোথায়? ডেটল সাবান আছে তো?
সতেরো বার হাত ধুয়েও বেচারী শান্তি পায়নি। খাওয়াও হল না ভালো করে। ইলিশ কি আর চামচ দিয়ে খাওয়া যায়!
” Everything is fair in love and war” সনাতন প্রবাদ বাক্যটিতে একটু সংযোজন করলাম।
” Everything is fair with art and peer”
বাঁশগুলো ছোট করে কাটিয়ে বাগানের এক পাশে একটা ফেন্সিং করেছি। তার একটা টুকরো হাতে এসেছিল।
রাত ন’টায় বর বাবাজি নিচে নামলেন। সারা ঘরে নিকোটিনের গন্ধ ছড়িয়ে গেল।
– উফ! সারাদিন খেটেখুটেও শান্তি নেই আমার। একিউট অ্যাজমা আমার এটাও তোমার খেয়াল থাকে না! কটা খেয়েছ, কটা খেয়েছ অ্যা?
– আরে, মাত্র দুটো। দুপুরে খাবার পর আর এখন একটা।
– বাপরে! এত মিথ্যে কথা! পরের জন্মে তো মানুষ কেন চারপেয়ে ও হবে না। অ্যামিবা হয়ে ঝুলে থাকবে ইন্টেসটাইনে নয়তো ব্যাঙের ছাতা হয়ে আমার বাগানে ফুটবে। তোমার এই অফিসের কাজ আর শিল্প এক জিনিস নয় বুঝলে!
মানুষটাকে হাঁ করিয়ে রেখে বাথরুমে ঢুকে যাই। সামান্য হলেও পাপ তো হয়েছে। ধুতে হবে। ভাগ্যিস রিমির সাথে দেখা হয়নি ওর!