সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ১১

মর্তকায়ার অন্তরালে

|| ১১ ||
আর একটু গভীরে গিয়ে বিদ্যাসাগরের ধর্মভাবের খোঁজ আমরা নেবো | সালটা ১৮৮২ | ৫আগস্ট ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দেবএসেছেন বিদ্যাসাগরকে দেখতে বিদ্যাসাগরের বাড়িতে | সেই দিনের সুন্দর চিত্র ধরা আছে শ্রীমহেন্দ্রনাথ গুপ্তের ‘ শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত ‘ গ্রন্থে | আমরা তার অংশবিশেষ নেবো এই প্রবন্ধের প্রয়োজনে | ঠাকুর প্রশ্ন রাখলেন –
( বিদ্যাসাগরের প্রতি সহাস্যে ) – ” আচ্ছা তোমার কী ভাব ? ”
বিদ্যাসাগর মৃদু মৃদু হাসিতেছেন | বলিতেছেন, ” আচ্ছা সে কথা আপনাকে একলা একলা একদিন বলব | ” ২৪
এখানে স্পষ্ট প্রতীত হয় যে নিজের মনোভাবের গুহ্যকথা প্রকাশ্যে আনতে চাননি |
কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে একদিন বিদ্যাসাগর বসে গল্প গুজব করছিলেন | এমতাবস্থায় একটি অন্ধফকির গান গাইতে গাইতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন | ফকিরটির নাম অখিলদ্দিন | বিদ্যাসাগর ফকিরটিকে ডাকলেন এবং আদ্যন্ত বারংবার গানটি প্রাণভরে শুনলেন | নিম্নে গানটির কিছু অংশ উল্লিখিত হলো –
” কোথায় ভুলে রয়েছ ও নিরঞ্জন নিল্লয় করবে রে কে ,
তুমি কোনখানে খাও কোথায় থাক রে মন অটল হয়ে ,
কোথায় ভুলে রয়েছ – |
তুমি আপনি নৌকা আপনি নদী , আপনি দাঁড়ি আপনি মাঝি ,
আপনি হও যে চরণদাসজী , আপনি হও যে নায়ের কাছি ,
আপনি হও যে হাইল বৈঠা |
তুমি আপনি মাতা আপনি পিতা
আপনার নামটী রাখব কোথা , সে নাম হৃদয়ে গাঁথা,
আমার গোঁসাঞ্চিচাঁদ বাউলে বলে সে নাম ভুলব নারে প্রাণ গেলে | ” ২৫
গান শুনতে শুনতে বিদ্যাসাগর চোখের জলে আকুল হলেন | গান শেষ হলে ফকির বিদায়ের সময় কিছু পয়সা দিলেন এবং মাঝে মাঝে আসতে বলে দিলেন |
এই প্রসঙ্গে ফকিরের উক্তিও শোনা দরকার | ফকির বলেছে : ” বিদ্দ্যেসাগর বাবু আমাকে বড়ই ভালোবাসতেন , আর এই গান শুনে খুব খুশি হতেন | তাঁর কাছে অনেক পয়সা পেয়েছি | ” ২৬
গানটির মধ্যে আছে কেবল ঈশ্বরের জন্য আকুলতা | এই গান শুনে বিদ্যাসাগর খুশি হচ্ছেন , চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন – তাহলে বিদ্যাসাগর ঈশ্বর বিশ্বাসী নন , একথা জোর দিয়ে বলব কেমন করে |
এবার ‘বোধোদয়’ এর প্রসঙ্গে আসি | ‘ বোধোদয় ‘ এর প্রথম সংস্করণে নানা পার্থিব জ্ঞানের পরিচয় থাকলেও ঈশ্বরের উল্লেখ ছিল না | বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী বিদ্যাসাগরকে বললেন : ” মহাশয় ছেলেদের জন্য এমন একখানি পাঠ্যপুস্তক রচনা করিলেন , বালকদের জানিবার সকল কথাই তাহাতে আছে , কেবল ঈশ্বর বিষয়ে কোনো কথা নাই কেন ? ” তার উত্তরে বিদ্যাসাগর বললেন : ” যাঁহারা তোমার কাছে ঐরূপ বলেন , তাহাদিগকে বলিও , এইবার যে বোধোদয় ছাপা হইবে , তাহাতে ঈশ্বরের কথা থাকিবেক | ” ২৭
পরবর্তী সংস্করণে বিদ্যাসাগর ‘ বোধোদয় ‘ এ ঈশ্বর বিষয়ক ক্ষুদ্র নিবন্ধ যোগ করে দেন | ওই অংশটুকু ছাড়াও ‘ বোধোদয় ‘ ও ‘ আখ্যান মঞ্জরী ‘র ( ৪র্থ ) একাধিক স্থলে ঈশ্বরের উল্লেখ আছে | সুতরাং নাস্তিকের মতো ঈশ্বরের নাম শুনিলেই তিনি বিরুদ্ধাচরণ করতেন তা কিন্তু সত্য নয় |
‘ বোধোদয় ‘ প্রসঙ্গে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিমত সমান প্রাসঙ্গিক | শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন , ” ঈশ্বর সম্বন্ধে তাঁর কোন অনমনীয় প্রতিকূল ধারণা থাকলে তিনি বিজয়কৃষ্ণের অনুরোধ রক্ষা করে ঈশ্বর- প্রসঙ্গের অবতারণা করতেন না | কারণ যুক্তিবিরোধী বা তাঁর অভিমতের বিরুদ্ধে কোন কথা তিনি কিছুতেই মানতে পারতেন না , অন্তরঙ্গ জনের জন্যও না | ” ২৮
তাছাড়া ঈশ্বরের ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ বিশ্বাসের কথা বিদ্যাসাগরের রচনায় আছে | ‘ ঐশিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস ‘ নামক রচনাটি তারই প্রমাণ | একটি পিতৃমাতৃহীন অনাথ বালক নিজের ভরণ-পোষণের নিমিত্তে লোকমুখে শ্রুত হয়ে এক ব্যক্তিকে বললেন , তার অল্প বয়স্ক পরিচায়কের প্রয়োজন থাকলে তাকে নিযুক্ত করতে পারেন | ব্যক্তিটি জানিয়ে দিল , তার ওইরূপ পরিচারকের প্রয়োজন নেই | বালকটি তখন মৌনভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল | বাকিটা বিদ্যাসাগরের কথায় , ” সে ব্যক্তি বালকের মুখ দেখিয়া দুঃখিত হইলেন , এবং জিজ্ঞাসা করিলেন , ‘ তোমার কি কোথাও কর্ম্ম জুটিতেছে না | ‘ তখন বালক কহিল , ‘ না মহাশয় , আমি অনেক স্থানে চেষ্টা দেখিতেছি , কিন্তু কোথাও কিছু হইতেছে না ; একটি স্ত্রীলোক আমায় বলিয়াছিলেন , আপনকার লোকের প্রয়োজন হইয়াছে , সেইজন্য আপনার নিকট আসিয়াছিলাম , এখন বুঝিতে পারিলাম , তিনি , সবিশেষ না জানিয়াই , ওরূপ বলিয়াছিলেন | ‘
বালকের ভাব দর্শনে , তাঁহার অন্তঃকরণে বিলক্ষণ দয়ার সঞ্চার হইল | তখন তিনি আশ্বাস প্রদানের নিমিত্ত কহিলেন , ‘ তুমি হতোৎসাহ হইও না | ‘ এই কথা শুনিয়া বালক প্রফুল্ল চিত্তে কহিল , ‘ না মহাশয় , যদিও আমি অশন বসন প্রভৃতি সর্ব্ব বিষয়ে অতিশয় ক্লেশ পাইতেছি , তথাপি , একদিনের জন্যও , আমি হতোৎসাহ হই নাই | আমার সম্পূর্ণ আশা আছে , আমি , অচিরে কোনও স্থলে নিযুক্ত হইয়া , আপন ক্লেশ দূর করিতে পারিব | দেখুন এই পৃথিবী অতি প্রকাণ্ড স্থান | ঈশ্বর এই পৃথিবীর কোনও স্থলে , অবশ্যই , আমার জন্য কোনও ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছেন ; এ বিষয়ে আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে , আমি কেবল সেই ব্যবস্থার অন্বেষণ করিতেছি | ” ২৯
ঈশ্বরের ব্যবস্থায় আস্থাশীল না থাকলে বিদ্যাসাগরের রচনায় সহায় সম্বলহীন একটি বালকের মুখ থেকে এই রূপে বিশ্বাসপূর্ণ কথা বের হতো না |
‘ ভূগোলখগোলবর্ণনম ‘র প্রথম শ্লোকে বিদ্যাসাগর লিখলেন :
” যৎক্রীড়াভাণ্ডবদ্ ভাতি ব্রহ্মাণ্ডমিদমদ্ভুতম |
অসীমমহিমানং তং প্রণমামি্ || ৩০
ঈশ্বরে বিশ্বাস ছাড়া কি এইরূপ শ্লোক রচনা সম্ভব ?
পরকাল নিয়ে বিদ্যাসাগর কিছুই বলেননি – এমন ধারণা যুক্তিসঙ্গত নয় | প্রভাবতীর মৃত্যুর পর বিদ্যাসাগর ‘ প্রভাবতী সম্ভাষণ ‘এ প্রভাবতীর উদ্দেশ্যে লিখেছেন : ” বৎসে ! তোমায় আর অধিক বিরক্ত করিব না ; একমাত্র বাসনা ব্যক্ত করিয়া বিরত হই – যদি তুমি পুনরায় নরলোকে আবির্ভূত হও , দোহাই ধর্ম্মের এইটি করিও , যাঁহারা তোমার স্নেহপাশে বদ্ধ হইবেন , যেন তাঁহাদিগকে , আমাদের মত , অবিরত , দুঃসহ শোকদহনে দগ্ধ হইয়া , যাবজ্জীবন যাতনাভোগ করিতে না হয় | ” ৩১
বিরুদ্ধ পক্ষ বলবেন , এ রচনাকৌশল | এ কি কেবলমাত্র রচনা কৌশল ? রচনা সেটাই যেখানে রচনাকারের স্থূল-সূক্ষ্ম ভাবনার প্রতিফলন ঘটে | মৃত্যুর পর পুনরায় স্থুললোকে ফিরে আসার অভিলাসকে বিদ্যাসাগর অস্বীকার করেননি |
রাজা রামমোহন রায়ের দৌহিত্র ললিত চাটুয্যকে বিদ্যাসাগর একবার জিজ্ঞাসা করলেন : ” হ্যাঁ রে ললিত , আমারও পরকাল আছে নাকি ?
ললিত চাটুয্যে বললেন : ” আছে বৈকি আপনার এত দান , এত দয়া , আপনার পরকাল থাকবে না তো থাকবে কার ? ” বিদ্যাসাগর মৃদু হাসলেন | এই হাসি কি নীরব সম্মতি নয় ?
যাইহোক তর্কে প্রবৃত্ত হওয়ার বাসনা নেই | তবে অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার স্মরণ নিলে তর্কের মীমাংশার বিশেষ সুরাহা হবে | ” বিদ্যাসাগরের পন্থা বিশেষ কোন শাস্ত্রসম্মত অথবা বৈরাগ্য ধর্মাবলম্বী কিনা তাতে বিশেষ সন্দেহ আছে | মানুষের প্রতি অকুণ্ঠ প্রেম , মানববেদনার প্রতি অগাধ সহানুভূতি এবং মানব দুঃখ দূর করিবার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ তাঁকে বৈরাগ্যধর্মী করেনি , বরং তাঁর মানসশক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে | তিনি নাস্তিক ছিলেন কিনা তার যর্থাথ উত্তর দেওয়া দুরূহ | কিন্তু তাঁকে নিশ্চয় বলা চলবে , ‘ হে নাস্তিক , আস্তিকের গুরু | ‘ মানুষই তাঁর ধর্ম , মানুষই তাঁর সাধনা , মানুষ তাঁর আধার এবং আধেয় | পাশ্চাত্য positivist দার্শনিকের মতো মানবতত্ত্বের নির্যাস নয় , মানুষের দুঃখদুর্দশাপূর্ণ কবোষ্ণ স্পর্শই তাঁর কাম্য ছিল | নরের মধ্যে নরোত্তম ও নারায়ণকে তিনি দর্শন করেছিলেন কিনা জানি না | কিন্তু নরদেহই তাঁর কাছে দেবমন্দির ; নরদুঃখ লাঘবের জন্য সর্বস্ব সমর্পণ তাঁর যজ্ঞহবিঃ | বিদ্যাসাগর পরম আস্তিক্যবাদী , কারণ তিনি মানববাদী | মানুষের চেয়ে অধিকতর অস্তিত্ববান্ আর কে ? ” ৩২
রবীন্দ্রনাথের অভিমত অনুরূপ : ” তিনি যে বাঙালি বড়লোক ছিলেন তাহা নহে , তিনি যে রীতিমত হিন্দু ছিলেন তাহাও নহে – তিনি তাহা অপেক্ষাও অনেক বেশি বড়ো ছিলেন , তিনি যর্থাথ মানুষ ছিলেন | ” ৩৩
ইহাই বিদ্যাসাগরের সর্বশ্রেষ্ঠ মূল্যায়ণ | তিনি যর্থাথ মানুষ ছিলেন |
————————————————————–
তথ্য প্রাপ্তি :
১| করুণাসাগর বিদ্যাসাগর , ইন্দ্রমিত্র , আনন্দ পাবলিশার্স , সেপ্টেম্বর ২০১৪ , পৃঃ ৯০ ২| ঐ , পৃঃ ৯০ ৩| ঐ , পৃঃ ৯০ ৪| ঐ , পৃঃ ৫৮২ ৫| ঐ , পৃঃ ৫৮২ ৬| ঐ , পৃঃ ৫৮২ ৭| ঐ , পৃঃ ৫৮২ ৮| ঐ , পৃঃ ২৮ ৯| আমার ভারত অমর ভারত , রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিউট অব কালচার , জুন ২০০৫ , পৃঃ ২০৯ ১০| শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত , ৩য় ভাগ , ২য় পরিচ্ছেদ | ১১| করুণা সাগর বিদ্যাসাগর , পৃঃ ১৯ ১২| ঐ , পৃঃ ২৭ ১৩| প্রসঙ্গ : বিদ্যাসাগর , ন্যাশনাল বুক এজেন্সী , পৃঃ ১৬৮ ১৪| করুণা সাগর বিদ্যাসাগর , পৃঃ ৫৭৮ ১৫| ঐ , পৃঃ ৫৭৫ ১৬| ঐ, পৃঃ ৫৭৫ ১৭| ঐ , পৃঃ ৫৭৫ ১৮| ঐ , পৃঃ ৫৭৫ ১৯| যুগ নায়ক বিবেকানন্দ ( ১ম খণ্ড ) , স্বামী গম্ভীরানন্দ , উদ্বোধন কার্যালয় , পৃঃ ১২৫ ২০| আমার ভারত অমর ভারত , পৃঃ ১৩৮ ২১| করুণা সাগর বিদ্যাসাগর , পৃঃ ৫৯২ ২২| প্রসঙ্গ : বিদ্যাসাগর , পৃঃ ৮৩ ২৩| ঐ , পৃঃ ৮৩ ২৪| শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত তৃতীয় ভাগ , পঞ্চম পরিচ্ছেদ ২৫| করুণা সাগর বিদ্যাসাগর , পৃঃ ৫৭৮ ২৬| ঐ , পৃঃ ৫৭৮ ২৭| প্রসঙ্গ : বিদ্যাসাগর , পৃঃ ১৬৭ ২৮| ঐ , পৃঃ ১৬৭ ২৯| করুণা সাগর বিদ্যাসাগর , পৃঃ ৫৭৯ ৩০| ঐ , পৃঃ ৫৮০ ৩১| ঐ , পৃঃ ৫৮১ ৩২| প্রসঙ্গ : বিদ্যাসাগর , পৃঃ ১৭১ ৩৩| বিদ্যাসাগর চরিত , রবীন্দ্রনাথ |
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।