ছায়াপথ, গুঁড়ো ছাই
সত্যি কথা বলতে কি, শিব ঠাকুর চরিত্র টা আমার দারুণ লাগে। একেবারে বিন্দাস, ভরশূন্য, একক, অসীম, সন্ন্যাসী ও সংসারী! বেশ একটা ক্যাজুয়াল, ডোন্ট কেয়ার ভাব! সাজ পোশাকের পছন্দ দেখো। এতো বড় একজন দেবতা! জমকালো পোশাক পড়তেই পারতেন।
ইন্দ্র, বরুণ, ব্রহ্মা, বিষ্ণু সবাই ঝলমলে পোশাকে, ঝকমকে গয়নাগাটি পরে থাকেন, ব্যাক্তিত্ব ধরে রাখার জন্য। আর আমাদের শিব ঠাকুর! এই সব জবরজং পোশাকের ধার ধারেন না, শুধু লজ্জা নিবারণ এর জন্য, ভালো জায়গায় কোথাও যেতে হলে বড়োজোর ব্যাঘ্রচর্ম, ব্যাস! গলায় দামি হারের বদলে জঙ্গল থেকে একটা মোটা সাপ তুলে নিয়ে জড়িয়ে নিলেন, হয়ে গেলো।একদম সাদামাটা! তিনি উচ্চবর্গীয়দের সঙ্গে মেলামেশা করেননা, বরং উচ্চ বর্গের দেবতা লোকেরা সব যখন হার স্বীকার করেন- তখন তাঁর শরণাপন্ন হন সবাই ; আর তিনি অধঃপতিত নিম্নবর্গীয় ভূত – প্রেতদের সঙ্গে থাকতে ভালোবাসেন।এলিটিজমের তোয়াক্কা না করে অতি সাধারণ প্রেত সহচর নন্দী ভৃঙ্গীর সঙ্গে গাঁজা সেবন করে, নিরাসক্ত নির্লোভ হয়ে শ্মশানে মশানে পরে থাকেন। এইজন্য অনেকে আড়ালে তাঁকে ভূতনাথ বলে ডাকে। আবার সমস্ত পশু সত্ত্বার তিনিই পরিত্রাতা। তাই কেউ বা বলে পশুপতি। যদিও আদপে তিনি এসবের তোয়াক্কা করেন না। এমন “ডাউন টু আর্থ ” দেবতা আর দ্বিতীয়টি নেই। কিন্তু ওই ভাবে চললেও ব্যাক্তিত্ব দেখেছো! কোনো দেবতার সাহস হবেনা তাঁর মুখের উপর কথা বলার।
গাঁজা ভাং খান বটে, তবে তাঁর ক্যারেক্টার নিয়ে কথা বলতে পারবে না। প্রায় সব দেবতার মধ্যেই চরিত্রের অল্প বিস্তর গোলমালের কথা শোনা যায়; কিন্তু শিবঠাকুরের চরিত্রের গোলমালের কথা শোনা যায় না। হ্যাঁ, বরং মানবী থেকে শুরু করে দেবী ও দানবী সবার কাঙ্ক্ষিত তিনি। শোনা যায়, চৌষট্টি যোগিনীর ভৈরব তিনি। এক উতলা প্রেমিকা গঙ্গা দেবীকে তিনি সব সময় মাথায় ধরে রাখেন। সারাক্ষণ। কথা দিয়েছিলেন কিনা!
এই রকম সাদামাটা থাকেন বটে, তাই বলে তাঁর গুণ কি কম? ফাইন আর্টসে ত্রিভুবনে কেউ আছে তাঁর সমকক্ষ?
তাঁর নৃত্যকলার কথা বলছিলাম। ওই বিখ্যাত “নটরাজ” পোজটি তো সারা পৃথিবীর লোগো হয়ে গেছে। আর তাঁর “তান্ডব নৃত্য”? যা পরিবেশন করার সঠিক মঞ্চ ত্রিভুবনেও নেই। আর এতরকম যোগ মুদ্রা? সব তো তাঁরই সৃষ্টি। যোগের ব্যাপারে তাঁর ধারে কাছে কে আছে? বিষ্ণুদেব একটা যোগ ভালো করেন। তিনি “যোগ-নিদ্রা” ভালো করেন, ওটাতে পরিশ্রম কম; আরাম বেশি।
এরকম চালচুলোহীন ভবঘুরের মতো থাকলে কি হবে, স্বর্গমর্তের মেয়েরা তাঁর জন্য একেবারে পাগল। তিনি ন্যাকা ন্যাকা সুন্দরী দেবকন্যাদের পাত্তাই দেন না। আর গিরিরাজ হিমালয়ের একমাত্র আদরের কন্যা, অপূর্ব সুন্দরী, ভয়ানক সাহসী দেবী দুর্গা কেও শিবঠাকুর কে পাওয়ার জন্য লজ্জাশরম ত্যাগ করে , নাওয়া – খাওয়া ভুলে বহু বছর কঠিন তপস্যা করতে হয়েছিল।
ভাবা যায় -গৃহিণী, ধনী গিরিরাজ হিমালয়ের কন্যা। বাপের দেওয়া হিমালয়ান সিংহের পিঠে চেপে ঘুরে বেড়ান। কর্তা টি কিন্তু নির্লোভ। তিনি ষাঁড়ে চড়েই তার কাজ সারেন। তিনি চাইলে কি শ্বশুরমশাই বা তাঁর স্ত্রীকে বলে একটা হিমালয়ান সিংহ জোগাড় করতে পারতেন না? আর তাছাড়া তিনি নিজেই তো পশুপতি!যাকে ডাকবেন, কে না করবে তাঁক?যদিও তিনি ওসবের ধার ধারেন না। আপন গরিমায় চলেন। ছেলে মেয়েদেরও বেশি লাই দেন নি। ছেলেমেয়েদের চলা ফেরার জন্য বাঘ, সিংহ, হাতি, ঘোড়া কি জোগাড় করে দিতে পারতেন না? না, তিনি ওরকমটি করেন নি।
ছেলেমেয়েদের মা বড়োলোকের বিটি, সিংহ চড়ে ঘুরে বেড়ান। ভোলানাথ কিন্তু ছেলেমেয়েদের দিলেন একজনকে ইঁদুর, একজনকে পেঁচা, একজন কে হাঁস, একজন কে ময়ূর। অতি সাধারণ বাহন। মা বিএমডাব্লু চড়ছেন চড়ুননা,তো ছেলেমেয়েরা টানা রিক্সাতেই যাবে! কি কনসেপ্ট!
নিজে শ্মশানে মশানে ঘুরে বেড়ান। তবে ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে তিনি “plane living, high thinking” নীতিতে বিশ্বাসী। তাদের কিরকম বানিয়েছেন দেখো। কার্তিক হয়েছে বড় যোদ্ধা, দেব সেনাপতির পদে নিযুক্ত হয়ে স্বর্গের দেবতাদের প্রতিরক্ষা ব্যাপার টা সামলান।
ব্যবসায়ী ও শুভ কর্মের সূচনার রাশ গণেশের হাতে; ধানাই পানাই করেছো কি সব উল্টে দেবে সব।
মেয়ে দুটোও ডাকসাইটে সুন্দরী, মায়ের মতই। কিন্তু মেয়ে হলেও, ছেলেদের মতোই সমান ভাবে তৈরি করেছেন তাঁদের, কোনো ভেদাভেদ করেননি।
সরস্বতী লেখাপড়া,গানবাজনায় ওস্তাদ। সুতরাং জ্ঞান বিদ্যার ডিপার্টমেন্ট এর দায়িত্ব তাঁর হাতে। আর লক্ষ্মী ইকোনোমিক্সে তুখোড়। সুতরাং অর্থদপ্তর তার হাতে।
রূপবতী, গুনবতী, অসুরদলনী জাঁদরেল স্ত্রী দুর্গাদেবী কিন্তু ওরকম ভোলাভালা স্বামীকে যথেষ্ট সমীহ করে চলেন।
ছেলেমেয়েদের নিয়ে বছরে এক দুবার বাপের বাড়ি আসেন, কিন্তু স্বামীর কথা অমান্য করেননা।
মেনকা কেঁদে কেটে ভাসালেও না, ঝড়, জল, বন্যা, ভূমিকম্প হলেও না। ভোলানাথ তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে গড়ে তুলেছেন খুব ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং আর মিউচুয়াল রেসপেক্টের এক নিবিড় সম্পর্ক।
আরও কত কি যে কারণ আছে, তাঁকে ভালোবাসার- ইয়ত্তা নেই।
এই সব ইতিউতি ভাবতে ভাবতে, হোয়াটস অ্যাপ খুলে দেখি প্রফুল্ল ম্যাসেজ করেছে একটা। আরও অনেকেই করেছে। আজ রথযাত্রা। করোনার কারণে পুরীর রথযাত্রা উৎসব ছাড়া অন্য কোনো রথযাত্রা উৎসবে অনুমতি নেই এবারেও। আমাদের শহরে বেশ ঘটা করেই রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়। শুধু আমাদের শহরই নয়, দক্ষিণবঙ্গের এই উড়িষ্যা লাগোয়া অঞ্চলগুলিতে জগন্নাথ সংস্কৃতির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
প্রফুল্ল জগন্নাথতীর্থ পুরী শ্রীক্ষেত্রের নানা অজানা কথা লিখেছে ম্যাসেজে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে শ্রীক্ষেত্র কে তীর্থ মর্যাদা দেওয়া হয়। সুতরাং স্বাভাবিক আকর্ষণেই মন দিলাম তার লেখায়।
পুরীতে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর জন্য বর্তমানে তিনটি রথ থাকলেও একসময় পুরীতে রথযাত্রার সময় ছয়টি রথ ব্যবহৃত হত । প্রথম দিকে পুরীর মন্দির এবং মাসির বাড়ি গুন্ডিচা মন্দিরের মধ্যবর্তী স্থানে একটি নদী প্রবাহিত হত । তাই নদীর এই পাড়ে তিনটি এবং ঐ পাড়ের জন্য আরও তিনটি রথ ব্যবহৃত হত, নদী পারাপারের জন্য একটি বিশাল নৌকা থাকত। জগন্নাথ মন্দিরের একসময়কার বিখ্যাত ভজন গায়ক ছিলেন মোহাম্মদ আজিজ । তিনি ভগবান জগন্নাথদেবকে সুমধুর ভজন শোনানোর জন্য বিখ্যাত ছিলেন । যদিও অন্য ধর্মের মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা শ্রীক্ষেত্রে। শোনা যায় যীশু খ্রীষ্ট ভগবান জগন্নাথদেবকে অলক্ষ্যে দর্শন করার জন্য পুরী ভ্রমণ করেছিলেন । এর প্রমাণ পাওয়া যায় পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের ভিতরে মূল মন্দিরের পেছন দিকে থাকা বিশাল আকৃতির অভিষিক্ত ক্রুস ।আবার, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ভগবান জগন্নাথদেব ও ভগবান বুদ্ধদেবের মধ্যে ছিল অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল । জগন্নাথ সংস্কৃতিতে জগন্নাথ কেই বুদ্ধ অবতার হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। এমনকি পুরীতে ভগবান বুদ্ধদেবের অনেক নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায় । যদিও তার অধিকাংশই সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ জয়ের পরে নির্মিত। শিখ সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু গুরু নানকের কাছেও জগন্নাথদেব ছিলেন প্রিয় ।
তথ্যগুলো অনেকগুলোই নতুন শুনলাম। দীর্ঘ লেখা তথ্য সমৃদ্ধ হলে পড়তে মন্দ লাগেনা। তাই মন দিলাম পরবর্তী অংশে। হুমম্, আমরা অনেকেই জানি প্রভু জগন্নাথদেবকে প্রতিদিন ৫৬ প্রকার ভোগ নিবেদন করা হয়। তবে বিশেষ বিশেষ দিনে ৮৮ প্রকার পদ ভোগ নিবেদন করা হয়ে থাকে এবং বিশেষ বড় বড় উৎসবের সময় এর চেয়েও বেশি ভোগ ভগবানকে নিবেদন করা হয় । এই রীতি জগন্নাথ সংস্কৃতির এক অনন্যতা। প্রভু জগন্নাথ দেবকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে ভোজন রসিক হিসেবে মানা হয়ে থাকে। প্রভু জগন্নাথ দেবের মন্দিরে বর্তমানে যে ভোগমণ্ডপটি রয়েছে এটি প্রকৃতপক্ষে কর্ণাটক রাজার রাজত্বের অংশ, যেটি মারাঠা সাম্রাজ্য কর্তৃক ধ্বংস হয়েছিল। পরবর্তীতে তার অবশিষ্ট কিছু অংশ পুরী মন্দিরের ভোগমণ্ডপ হিসেবে ব্যবহৃত হয় । ‘অবধা’ অর্থাৎ ভগবান জগন্নাথদেবের অদ্ভুত প্রসাদের নাম। যে কেউ তৈরি করে না । নিজে নিজেই এই সুস্বাদু-কৃষ্ণ প্রসাদ তৈরি হয় । সবচেয়ে অবিশ্বাস্য যে, বিশাল আকৃতির চুল্লীতে একটির পর একটি বসানো মাটির তৈরি পাত্রে সব উপাদান দিয়ে বসিয়ে দিলে সবচেয়ে উপরের পাত্রটির ব্যঞ্জন প্রথমে প্রস্তুত হয়। অথচ প্রথা অনুযায়ী বা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে নিচের পাত্রটিই আগুনের তাপে প্রথম পাক প্রস্তুত হওয়ার কথা । যা পুরী মন্দিরের অবিশ্বাস্য এক প্রাত্যহিক ঘটনা ।
গর্ভ মুর হল পুরী মন্দিরের সবচেয়ে আশ্চর্য অংশ। যেখানে ভগবানের সবরকমের মূল্যবান অলংকারসমূহ সংরক্ষণ রাখা হয় । এগুলো রক্ষনাবেক্ষনের জন্য যারা নিয়োজিত থাকে কতকগুলো বিষধর অদ্ভূত সাপ এবং স্বর্গীয় আত্মা ।
অপরদিকে রত্ন মুর নামে মন্দিরে উপরের অংশটিতে একটি অদ্ভূত বৃহৎ চুম্বক শক্তি বিশিষ্ট অংশ রয়েছে । যেটি মন্দিরকে ঝড়ো বা প্রবল দমকা হাওয়ার স্থির রাখতে বা কোন ধ্বংস হওয়া থেকে সুরক্ষা প্রদান করে । এমনকি জগন্নাথ মন্দিরের পতাকা বাতাস প্রবাহের বিপরীতে উড়তে থাকে।
রথযাত্রার সময় জগন্নাথ, বলদেব এবং সুভদ্রা দেবী যখন রথে আরোহন করে তখন প্রভু জগন্নাথদেবের প্রিয় চক্র সুদর্শন জগন্নাথের পাশে না বরঞ্চ সুভদ্রা দেবীর পাশে অবস্থান করেন । তখন জগন্নাথের পাশে ‘মদনমোহন’ বিগ্রহ এবং বলদেবের দু’পাশে ‘রামচন্দ্র’ এবং ‘কৃষ্ণ’ এ দুটি পিতলের বিগ্রহ অবস্থান করেন ।
জগন্নাথের সম্মুখে নৃত্য প্রদর্শনের জন্য একদল সেবিকা থাকেন। যাঁদের দেবদাসী নামে অভিহিত করা হয় । সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল এসব সেবিকারদের ৯ বছর বয়সেই বিয়ে হয় স্বয়ং জগন্নাথের বিগ্রহের সঙ্গে । এঁরা নিজেদেরকে ভগবানের কাছে উৎসর্গ করে শুধুমাত্র এ নির্দিষ্ট সেবা নৃত্য প্রদর্শন করে । প্রতিদিন এই দেবদাসীরা দিনের কিছু বিশেষ বিশেষ সময়ে ভগবানের সামনে তাঁদের নৃত্য প্রদর্শন করে থাকেন । নৃত্য প্রদর্শনের সময় তাঁরা দর্শকদের দিকে তাকাননা । তাঁদের সকল মনোযোগ ভগবানকে কেন্দ্র করে । তাঁদের জন্য পুরুষ সঙ্গ নিষিদ্ধ । এই রীতি।
এরকম নানা কারণে জগন্নাথ তীর্থ পুরী সারা বিশ্বের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিস্ময়ের এবং পবিত্র স্থান হিসেবে পরিগণিত হয়ে এসেছে । এখনো মানুষ অবাক বিস্ময় জগন্নাথ এবং জগন্নাথ পুরীর অদ্ভূত সব কার্যকলাপের কথা শ্রবণ এবং স্বচক্ষে দর্শনের অভিলাষ করেন। কথিত আছে, জগন্নাথ কথা শ্রবণ ও প্রচারে পুণ্য অর্জন হয়ে থাকে।
প্রফুল্ল জগন্নাথ ও জগন্নাথ তীর্থ পুরী শ্রীক্ষেত্র নিয়ে অনেক কথা বললেও বোধহয় এটা প্রাসঙ্গিক ভাবে বলতে পারত, জগন্নাথ দেবের আবির্ভাব হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে দ্বাপর যুগের শেষে।
□□
পৌরাণিক এই ঐতিহ্যগুলো আমাদের হিন্দু সংস্কৃতি র সাথে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িত আছে। যাদের স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা আছে। বিশ্বাস ও প্রবাদের বিবাদের এক আশ্চর্য প্রবাহ আছে। এই যেমন
মহাভারতের শকুনি কি সত্যি খারাপ লোক? আর শকুনি যদি খারাপ লোকই হবে শকুনিকে আজও তাহলে পুজো করা হয় কেন? হয়তো অনেকেই জানেনা যে, আমাদের ভারতবর্ষের কেরালার কোল্লাম জেলায়
পবিত্রাশরণে শকুনির মন্দির আছে।
মহাভারতের এক আশ্চর্য বিনির্মাণ শকুনি। মহাভারত অনুসারে শকুনিরা একশো ভাই। শকুনির বোন হল গান্ধারী। শকুনির বাবা সুবল ছিলেন গান্ধার (বর্তমানে আফগানিস্তান) দেশের রাজা। ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্রের জন্য পাত্রী হিসাবে গান্ধার রাজার কন্যা সুন্দরী গান্ধারীকে পছন্দ করলেন। ভীষ্মদেবের চাওয়া! সুতরাং ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে বিয়েও হয়ে গেল গান্ধারীর। যদিও শকুনির এই বিয়েতে মত ছিল না।
কিন্তু কেন? গান্ধার রাজ জ্যোতিষ বিচার করে জানতে পারলেন যে গান্ধারীর বিয়ের পর তাঁর স্বামী মারা যাবে। তাই রীতি অনুযায়ী বৈধব্য দশা কাটানোর জন্য বিয়ের আগে একটা ছাগলের সঙ্গে গান্ধারীর বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এবং অভিশাপ অনুযায়ী ছাগলটি মারাও যায়।
একসময় কৌরবরা জানতে পারে গান্ধারীর বিধবা হওয়ার খবরটা রাজা সুবল গোপন করেছিলেন । বিধবা কন্যার সাথে রাজকুমার এর বিবাহ দেওয়ার চক্রান্ত জানতে পেরে কৌরবরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং গান্ধার রাজ্য আক্রমণ করেন। রাজা সুবল ও তার একশো ছেলেকে বন্দী করে নিয়ে এসে কারাগারে রাখা হয়।শকুনিও ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন।কারাগারে প্রতিদিন মাত্র এক পাত্র অন্ন দেওয়া হত সবার খাওয়ার জন্য। সুবল বুঝতে পেরেছিলেন এই এক পাত্র অন্নে তাঁরা কেউ বাঁচবেন না। তাই তিনি ঠিক করলেন এই বরাদ্দটুকু শুধু শকুনি খাবেন। কারণ রাজা সুবল মানতেন শকুনি তাঁর সব ছেলের চেয়ে বুদ্ধিমান ও কূটনৈতিক ।সে পারবে এই অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে। রাজা সুবল কারাগারে বন্দী অবস্থায় শকুনিকে বললেন,
‘আমি চাই তুমিই বেঁচে থেকে কৌরবদের ধ্বংস কর।আমার মৃত্যুর পর আমার হাড় দিয়ে তুমি পাশা বানাবে।আর এই মন্ত্রপুত পাশা তোমাকে সব খেলায় জেতাবে।’
এরপর একে একে সবাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে লাগলেন।
বাবার মৃত্যুর পর শকুনি বাবার শরীরের হাড় দিয়ে পাশা বানান।
আর এদিকে বন্দী গান্ধার দের এই করুণ পরিণতি দেখে কৌরবরা শকুনি কে মুক্তি দেয়।
শকুনিও ছলে-বলে দুর্যোধনদের সঙ্গে সব ঝামেলা মিটিয়ে নিয়ে কৌরবদের বাড়িতে থাকতে লাগলেন ভাগ্না দুর্যোধনের পরামর্শদাতা হিসাবে।
শকুনি কিন্তু বাবা ও তাঁর ভাইদের মৃত্যুর কথা ভোলেননি। তাঁর বুকে জ্বলত সবসময় সেই প্রতিশোধস্পৃহা। বদলা চাই! বদলা!
এরপর তো সবারই জানা, এই পাশা পারদর্শিতার ফলে যুধিষ্ঠির পাশা খেলায় শকুনির মন্ত্রপুত পাশার কাছে হেরে যায় ।মহাভারতের যুদ্ধ শুরু হয়।অবশেষে ধ্বংস হয় কৌরব বংশ।
মনের জ্বালা মেটে শকুনির। এসব কিছুর পরে একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, শকুনির চরিত্র ছিল কিন্তু নিষ্কলঙ্ক। কোন কিছুর প্রতি তাঁর মোহ ছিল না। শকুনি শিবের ভক্ত ছিলেন। অন্যায়ের প্রতিশোধ নিয়েছিলেন।একমাত্র শ্রীকৃষ্ণ এসব ঘটনা জানতেন।
কেরালার কোল্লাম জেলায়
পবিত্রাশরণে শকুনি মন্দির রয়েছে। একটি সম্প্রদায়ের মানুষ আজও শকুনির পুজো করেন। পরম ভক্তিতে।
□□□
গোঁড়া আর আস্তিকে একটা বেসিক ডিফারেন্স আছে। আস্তিক যে পরমের অস্তিত্বে আস্থাশীল তার সাথে বিজ্ঞানের বৈরিতা নেই। আমি তো তাই মানি। এই যেমন ধরা যাক, বেদের ভাষ্য অনুসারে “একমেবাদ্বিতীয়ম্ ব্রহ্ম” অর্থাৎ তিনি সাকার এবং নিরাকার উভয় রূপেই বিদ্যমান। এখানে আমাদের বিজ্ঞানও বলছে একই কথা- মহাকাশের কৃষ্ণ গহ্বর থেকে ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি। বিগব্যাং থিওরি এবং ব্ল্যাক হোল থিওরি কি তারই প্রমান বয়ে চলছে না?
উপনিষদ বলছে প্রতিটি সৃষ্টির মোদ্দা সুর- পরমেশ্বর রয়ি এবং প্রাণ সৃষ্টি করেন। বিষ্ণুপুরাণে এই রয়িই প্রকৃতির উপাদান আর প্রাণ অর্থে পুরুষকার অর্থাৎ নির্ণায়ক সত্বা। তবিজ্ঞানের ভাষাই এই রয়িই হল পদার্থ (Matter)।
ছান্দোগ্য উপনিষদ(৭/১০/১) বলছে পৃথিবী,অন্তরীক্ষ, পর্বত, সমুদ্র, দেব, মানব, পশু পাখি সমস্তই ঘনীভূত। অর্থাৎ এই জগতে যা কিছু আছে সবই সেই রয়ির বিকার। আবার সাংখ্যদর্শন মতে দেহরূপ প্রকৃতি, চিৎ রূপ পুরুষ। অর্থাৎ প্রাণ দ্বারাই জগত পালন পোষণ হয়।
এই রয়ি বা প্রকৃতি অর্থাৎ এই ম্যাটার বা পদার্থের দুটি ভাগ- অজৈব আর জৈব। যাকে শাস্ত্রের পরিভাষায় বলা হয়- স্থাবর ও জঙ্গম। এই জৈব পদার্থ কতকগুলি কোষাণুর মিলিত রূপ। এই কোষাণু বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যাবে সেই পরমেশ্বর পরমাণু! যা পদার্থবিজ্ঞানের পরিভাষায় অ্যাটম। যার ধারণা ঋষি কণাদ জানিয়ে গেছেন সেই বৈদিক যুগেই।
কণা পদার্থবিদ্যার (Partical Physics) পরিভাষায় এই ব্রহ্মাণ্ডে কণাগুলিকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। এই যেমন- এক) ফারমিওন।
বিজ্ঞানী এনরিকো ফারমিনের নামানুসারে এই বস্তুকণা। ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন, নিওট্রিনো ইত্যাদি তিরিশের বেশি কণা এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত।
দুই) বোসন কণা।
বাঙালী বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোসের নামানুসারে এই কণার নামকরণ।
বস্তুকণার মধ্যে যে সব কণা শক্তি আদানপ্রদান করে তাই বোসন কণা। ফোটন কণা এই প্রকার কণার উদাহরণ। যা স্থির অবস্থায় ভরশূন্য, গতিশীল হলেই ভরবেগ প্রাপ্ত হয়। পদার্থবিজ্ঞানের মডেল করতে গিয়ে ১১টি মৌলিক কণা পাওয়া গেল। কিন্তু দেখা গেল এই কণাগুলো ভরবেগ প্রাপ্ত। ফলে গবেষণার পরিসর বাড়ল স্বাভাবিকভাবেই। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী পিটার হিগস ১৯৬৪ সালে আরেকটি কণার অস্তিত্বের প্রমাণ দিলেন। যা ভর সৃষ্টি করে এবং যা বোস-আইনস্টাইন সাংখ্যায়ন তত্ত্বের নিয়মানুগ। তৈরী হল ১২টি কণার মডেল। নাম হল হিগস-বোসন কণা। বিজ্ঞানের পাতায় যা এক যুগান্তরকারী আবিষ্কার।
এদিকে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী লিওন লেডারম্যান একটি পত্রিকায় হিগস-বোসন কণার বর্ণনা করতে গিয়ে তার নামকরণ করলেন গড পার্টিকেল/ঈশ্বরকণা। এক পরমেশ্বর অনিশ্চয়তাময় নিশ্চয়তার অস্তিত্ব। বিজ্ঞানের পাতা যা স্থান করে নিল ঈশ্বরকণা নামে। জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং সতর্ক করেছেন এই অনিশ্চয়তাময় নিশ্চয়তার অস্তিত্বকে ঘিরে। যে সৃষ্টি করতে পারে, সে ধ্বংস করার ক্ষমতাও রাখে। যে ঈশ্বরকণা থেকে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে সেই কণা জগৎধ্বংসও করতে পারে স্বল্প সময়ে।
ক্রমশ •••
(কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়ের জাত্যাভিমানে আঘাত বা আরোপ- এ লেখনীর বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য নয়। যে কোনো প্রকার সাযুজ্য আকস্মিক কিংবা দৃশ্যপট নির্মাণে সংবন্ধিত।)