|| ভিত্তোরিও দে সিকা || জন্মদিনে স্মরণলেখায় মৃদুল শ্রীমানী

ভিত্তোরিও দে সিকা: জন্মদিনে স্মরণলেখ
বাইসাইকেল থিফ সিনেমাটা দেখেছিলাম। খুব ভালো লেগেছিল। ভিত্তোরিও দে সিকা’র ওই একটি ফিল্মই আমি দেখেছি।
আর ওই একটি ফিল্ম দেখেই পরিচালককে আমি অন্যতম বিশ্বসেরা জেনেছি।
১৯০১ সালে আজকের দিনে এই ইতালিয়ান কুশলী পরিচালকের জন্ম। তিনি জন্মেছিলেন ইতালিতে। প্রয়াত হয়েছিলেন ১৩ নভেম্বর, ১৯৭৪ সালে। ফ্রান্সে। বাইসাইকেল থিফ ছবিটা মুক্তি পেয়েছিল ইতালিতে, ১৯৪৮ সালের ২৪ নভেম্বর তারিখে। জীবনে ফিল্ম তৈরি করে বিস্তর সম্মান পেয়েছিলেন ভিত্তোরিও দে সিকা। তবে তার মধ্যে এই বাইসাইকেল থিফ ছবিটি ১৯৪৯ সালে বিদেশি ভাষার ফিল্ম হিসেবে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পায়, আর ১৯৫০ সালে পায় বাফতা পুরস্কার। সেরা ছবি নির্বাচিত হয়। মনে করা হয় পুরো ফিল্ম ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ পনেরোটি ছবির মধ্যে এই বাইসাইকেল থিফ অন্যতম।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। সেপ্টেম্বর মাসের দুই তারিখে। ছয় বৎসর একদিন ধরে চলা এই সাংঘাতিক যুদ্ধটি শুরুও হয়েছিল সেপ্টেম্বর মাসেই। সেটা ১৯৩৯ সাল। এই যুদ্ধে পরাজিত পক্ষে ছিল জাপান, জার্মানি আর ইতালি। অবশ্য ইতালির ফ্যাসিস্ট একনায়ক বেনিতো মুসোলিনি ( ২৯.০৭.১৮৮৩ – ২৮.০৪.১৯৪৫) কে পার্টিজানরা হত্যা করলে ইতালি নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। জার্মানির নিষ্ঠুর চূড়ামণি একনায়ক ত্রিশ এপ্রিল, ১৯৪৫ তারিখে বাঙ্কারে ঢুকে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। দিশাহারা ইতালি পরাজয় স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করেছিল ওই ১৯৪৫ সালের ২ মে তারিখে। আর নাৎসি পার্টি ছন্নছাড়া হয়ে যায় ১৯৪৫ সালের দশ অক্টোবর তারিখে। কিন্তু যুদ্ধ সমাধা হয়েছিল জাপান আত্মসমর্পণ করলে। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসের ৬ ও ৯ তারিখ জাপানের হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে পর পর পারমাণবিক বোমা ফেলে বিস্ফোরণ ঘটায় আমেরিকা। এতে জাপান পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। এর পরেই শেষ হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। পরের বছর ১৯৪৬ সালে “লাদ্রি দে বিসিক্লেট” নামে উপন্যাস লিখেছিলেন লুইজি বারতোলিনি (০৮.০২.১৮৯২ – ১৬.০৫.১৯৬৩)। সেই গল্প থেকে বাইসাইকেল থিফের চিত্রনাট্য তৈরি করলেন সাতজন মানুষ, তার সর্বাগ্রে ছিলেন পরিচালক ভিত্তোরিও দে সিকা নিজেই।
ছবির সিনেম্যাটোগ্রাফি ছিল কার্লো মন্টুওরির দায়িত্বে। সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন এরাল্দো দা রোমা। মূল গল্পের লেখক লুইজি বারতোলিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত রোম শহরে একজন গরিব মানুষের গল্প লেখেন। যুদ্ধ অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনে। আর গরিব মানুষের জীবন জেরবার হতে থাকে। এই পরিস্থিতির কারণে মানুষ অনেক সময় নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হয়।
বাইসাইকেল থিফ সিনেমার অন্যতম মূল চরিত্র আন্তোনিও রিকি ( রূপদান: ল্যামবারতো ম্যাজিওরানি) ছিলেন হদ্দ বেকার। এই বেকার লোকটি একদিন শহর জুড়ে পোস্টার টাঙাবার কাজ পেয়ে যায়। সেই আকালের দিনে এই সামান্য কাজটুকু পেয়েও আন্তোনিও খুশি। কিন্তু তার তো একটা সাইকেল দরকার। সাইকেল থাকলে পোস্টার লাগাতে সুবিধা। কিন্তু এত প্রয়োজনীয় সাইকেলটি চুরি যায়। সাইকেল খুঁজে বের করতে না পারলে আন্তোনিওর পোস্টার লাগানোর কাজটা টিঁকবে না। কাজের সুযোগ না থাকলে অবধারিত অনাহার। আন্তোনিও আর তার বালক পুত্র ব্রুনো ( রূপদান : এনজো স্টাইওলা) শহর তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে বাইসাইকেলটি। সাইকেল খুঁজতে খুঁজতে পিতা পুত্র সমকালীন ইতালির অব্যবস্থার চেহারাটা দেখতে পায়। সামান্য সাইকেল, তাও মানুষ চুরি করছে। চোরকে প্রটেকশন দিচ্ছে প্রতিবেশীরা। পুলিশ অসংবেদনশীল আচরণ করে পরিস্থিতির গভীরে না গিয়ে হাত গুটিয়ে থাকছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত রোমের এই সামাজিক অর্থনৈতিক ক্লিন্নতা দেখাতে গিয়ে আসলে পরতে পরতে ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নষ্টামির মুখোশ ধরে টানাটানি হয় লাদ্রি দি বিসিক্লেট উপন্যাস আর তার চলচ্চিত্রায়ণ বাইসাইকেল থিফএ।
ইতালির এই অসাধারণ চলচ্চিত্রকার আবার বড়মাপের অভিনেতাও ছিলেন। নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ( ২১.০৭. ১৮৯৯ – ০২.০৭. ১৯৬১) র ১৯২৯ সালে লেখা অসামান্য উপন্যাস এ “ফেয়ারওয়েল টু আর্মস” এর চলচ্চিত্রায়ণ করেছিলেন চার্লস ভিদর ( ২৭.০৭.১৯০০ – ০৪.০৬.১৯৫৯)। ১৯৫৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর আমেরিকার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ১৫২ মিনিটের ইংরেজি ভাষার ছবিটি। ওই ছবিতে রক হাডসন, জেনিফার জোনস, এলেইন স্ট্রিটচ এর পাশাপাশি দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন ভিত্তোরিও দে সিকা। যাঁরা হেমিংওয়ের এই উপন্যাসটি পড়েছেন, এবং একই সাথে লেখকের জীবনকাহিনী সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল, তাঁরা জানেন, এই উপন্যাসে লেখকের জীবনের ছায়া পড়েছে। লেখকের নিজেরও একটি ইতালিয়ান কানেকশন ছিল। এই ফিল্মে মেজর অ্যালেসান্ড্রো রিনালডি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ১৯৫৭ সালের অস্কার বেস্ট সাপোর্টিং অ্যাক্টর সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি।
নিজের জীবনকে নিয়ে কম মজা করেন নি ভিত্তোরিও দে সিকা। তাঁর ভিতরে ছিল একটা পাক্কা জুয়াড়ি। জুয়া খেলে বারে বারে সর্বস্বান্ত হতে তাঁর বাধত না। আবার পয়সার দরকারে অনেক অপছন্দের কাজ নিতেও তিনি বাধ্য হতেন। কিছু অর্থ হাতে জমলেই আবার জুয়া আর আবার বিপুল অর্থনাশ। জুয়া ছিল তাঁর প্যাশন। আর এই প্যাশনের কথা গোপন রাখার প্রয়োজনীয়তাও তিনি অনুভব করতেন না। এমনকি, “কাউন্ট ম্যাক্স”, “দি গোল্ড অফ নেপলস” আর “জেনারেল দে লা রোভার”, এই রকম গোটা কতক ছবিতে পাক্কা জুয়াড়ির ভূমিকায় তিনি অভিনয়ও করেছেন।
বিবাহিত জীবনেও খুব অন্যরকম ছিলেন ভিত্তোরিও দে সিকা। ১৯৩৭ সালে নিজের সাঁইত্রিশ বছর বয়সে অভিনেত্রী জিউদিত্তা রিসোনকে বিবাহ করেন তিনি। ওঁদের একটি কন্যাসন্তানও হয়। তার নাম এমিলিয়া। এরপর ১৯৪২ সালে নিজের পরিচালিত একটি রোমান্টিক ফিল্ম “এ গারিবাল্ডিয়ান ইন দি কনভেন্ট” ছবিতে স্প্যানিশ অভিনেত্রী মারিয়া মার্কাডারের সঙ্গে হৃদয় বিনিময় হয় ওঁর। মারিয়া ওই ছবিতে মারিয়েল্লা ডোমিনিয়ানি চরিত্রে ও পরিচালক নিজে নিনো বিক্সিও চরিত্রে অভিনয় করেছেন। বছর বারো ধরে সম্পর্কে থাকতে থাকতে মারিয়ার সঙ্গে হৃদ্যতা অনেক বাড়লে ১৯৫৪ সালে স্ত্রী জিউদিত্তা রিসোনকে ডিভোর্স দিলেন তিনি। এরপর মেক্সিকো চলে গিয়ে ১৯৫৯ সালে মারিয়াকে বিয়ে করলেন তিনি। এই তথাকথিত বিয়ের আগেই অবশ্য মারিয়ার গর্ভে দুটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়েছে। ১৯৪৯ সালে ম্যানুয়েল আর ১৯৫১ সালে ক্রিশ্চিয়ান। কিন্তু ইতালির আইন মারিয়ার সঙ্গে ভিত্তোরিও দে সিকার বিবাহকে স্বীকৃতি দেয় নি। তখন তিনি ১৯৬৮ সালে ফরাসি নাগরিকত্ব নিয়ে পারী শহরে মারিয়ার পাণিগ্রহণ করেন। পরিচয় ও বৈধ বিবাহের মধ্যে মাত্র ছাব্বিশ বছরের ফারাক। আশ্চর্যের কথা এই যে, তিনি প্রেমিকা মারিয়া এবং জিউদিত্তা, তাঁর বিবাহ বিচ্ছিন্না স্ত্রী, দুজনের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতেন। দুটি পরিবারকেই তিনি পোষণ করতেন। প্রথম বিবাহের কন্যা এমিলিয়া যাতে নিজেকে স্নেহ বঞ্চিত না ভাবেন, সেজন্যই তিনি এভাবে দ্বৈত জীবন যাপন করেছেন। তিয়াত্তর বৎসর বয়সে ফুসফুসের কর্কটরোগে হাসপাতালে ভরতি থাকা অবস্থায় ভিত্তোরিও দে সিকার মৃত্যু হয়।