আমি যে আমিই এটা বোঝাতে গিয়ে আমাকে নানাসময় কম হেনস্তা হতে হয়নি। বিভিন্ন সময়ে ভাড়াবাড়িতে থেকেছি। ভোট দেওয়া যে আমার গণতান্ত্রিক অধিকার এটা যে কবে মাথার ভেতর ঢুকে গিয়েছিল জানিনা। সেই তাড়নায় যখন যেখানে বসবাস করেছি ভোটার তালিকায় নিজের নাম তোলা থেকে শুরু করে নিজের ছবি সমেত ভোটারকার্ড যখন চালু হল তা পাওয়ার জন্য নানাবিধ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। অবশ্যই সবসময় যথেষ্ট নাজেহাল হতে হয়েছে। যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছি।ঘেন্না ধরে গেছে। প্যান কার্ড করতে হয়েছে। করতে হয়েছে আধার কার্ড।
একসময় শুনেছিলাম এইসব কার্ডের বিষয়ে বলা হয়েছিল,মানুষ কি কার্ডের মালা গলায় নিয়ে ঘুরবে? শুনে উল্লসিত হয়েছিলাম। তাহলে আমার জন্য ভাবার কেউ আছেন! সত্যি এত কার্ডের জন্য ঝামেলা করে তা গলায় নিয়ে ঘুরতে হবে? সহ্য হয় না। এখন কি দেখছি? যে কার্ড মানছি না, মানব না বলা হয়েছিল সেই কার্ড না হলে কোথাও কল্কে পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু তাই নয় এক একটি কার্ডের সঙ্গে অন্য কার্ডের সংযোগ নিয়ে করতে হবে নানান কেতা।
কাজেই শেষ অবধি কিন্তু কার্ডের মালা গলায় নিয়েই এখন চলতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে মনে হয় এত সব কার্ডের ঠোকাঠুকির শব্দের লহরী যেন কানে আটকে থাকছে।
প্রতিটি কার্ড তৈরি করতে গিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে যে কত কষ্টে কাগজপত্র দাখিল করে বোঝাতে রয়েছে এই সব কাগজ আমার, যেখানে বাবার নাম তিনিই আমার বাবা। যে ঠিকানা লিখেছি সেখানেই আমি বসবাস করি। দপ্তরে বার বার যোগাযোগ করেছি। বসে থেকেছি। কখন শুনতে পাব আমার কার্ড তৈরি। আমি পেয়ে যাব আমার কাঙ্খিত কার্ড।
ভোটার কার্ড যদি শুধুমাত্র কাউকে ভোট দেওয়ার জন্য করতে হত, তবে সেটা পাওয়ার চেষ্টা আমি কখনোই তেমন জান লড়িয়ে করতাম না। শুধু ভোট দেওয়াই তো নয়, ওই ভোটারকার্ড ও অন্যান্য আরও কার্ড চুল্লিতে ঢোকার আগেও লাগবে শুধু নয়, পরিবারের নিরাপত্তার জন্য পরেও দরকার। আরও নানা ক্ষেত্রে প্রয়োজন। একটার সঙ্গে অন্যটির যোগাযোগ। একটি না থাকলে অন্যটি হবে না। সেই অন্যটি হলে সেটি আবার আরও একটি কার্ড তৈরি করবার কাজে লাগবে।
এইসব কার্ড করতে গিয়ে যেখানে নিজের একটি ছবি তুলে দিতে হয়েছে সেখানে নিজেকে চিনতে পারা যায়। এছাড়া যখনই কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে ছবি তোলা হয়েছে সেটা হাতে নিয়ে নিজেকে চিনতে পারিনি। চোখের সামনে ধরলে নানা রকম ছবি চোখের সামনে ফুটে উঠেছে। সোজা করে ধরলে মনে হত রেসের মাঠের ঘোড়া।উলটো করে ধরলে মনে হত ভূষণের ঠাকুরমা। কখনো বা একটা বাড়ির পলেস্তারা খসা দেওয়াল। কখনোই মনে হবে না যে ওটা আমার ছবি। কখনো মনে হত বহুকাল খেতে না পাওয়া এক খ্যাপাটে ভিখারি।
এর জন্য আমি কাউকে দায়ী করব না। একবার দপ্তরের একজনকে আআর দুঃখের কথা বলে ফেলেছিলাম। তিনি অবাক হয়ে আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,‘দেখুন আমাদের ক্যামেরা কখনও মিথ্যে বলে না।’ কিল খেয়ে সেটা হজম করতে হল।
আমার রেশন কার্ড নেই। রেশন কার্ডের কথা মনে পড়লে সেইসব দিনের দুঃস্বপ্নের ছবি এখনও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন স্কুলে পড়ি। তখন রেশন থেকে যে চাল দেওয়া হত তা খাওয়া যেত না। ভাত ফুটে ওঠার গন্ধ নিয়ে কত সুন্দর কথা বলা হয়ে থাকে। কবিতায়। সাহিত্যে। সেটা মনে হয় ১৯৬৫-৬৭ সালের কথা। যে চাল রেশন থেকে আনা হত তা উনুনের হাড়িতে ফুটে উঠলে বিশ্রি গন্ধে টেকা যেত না। ওই গন্ধটা পরে পেয়েছি পার্কসার্কাসে পশুর ঝোলানো চামড়ার গা-ঘেসা রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করার সময়।
তখন খোলা বাজারে চাল কেনা সবার পক্ষে সম্ভব ছিল না। যারা কিনত তাদের বাড়ির ছেলেদের আমরা বড়োলোকের ছেলে বলতাম। অনেক মানুষেরই ওই ভাত খেতে অসুবিধা হত। কি করে যে ওইসব দিনে ওই ভাত খেতাম তা ভাবলে এখনও গা গুলিয়ে ওঠে।
বাড়ির বড়োদের মুখে বিষণ্ণতার ছাপ। যখন খেতে অসুবিধা হত তারা বলত, খেয়ে নিতে। বলত মনে কর ওটাই বাসমতি চাল।ওই কথায় কোনো রসিকতা ছিল না। ছিল ব্যথা।কষ্ট।
মাঝে মাঝে রেশনে চাল পাওয়া যেত না। বিকল্প চাল বেরিয়েছিল,বলা হত কাওন চাল। ওই চালের খিচুড়ি আর পায়েস খুব ভালো হত। তখন ওই চাল সস্তায় পাওয়া যেত। তখনই বুঝতে শিখেছিলাম গরীবের জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যায়। সেই কাওন চালের দাম এখন এককিলো একশো টাকার উপর।
মাইলো বলেও একটা পদার্থ এসেছিল। সেটার খিচুড়িও বাড়িতে খেয়েছি। এইভাবে টেনেটুনে চলেছে দিন।
আমাদের বাংলার মাস্টারমশাই গৃহস্থ মানুষ। তাঁর ছেলে আমার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত।তিনি মাঝেমাঝেই চিন্তিত মুখে আমাদের ক্লাসের সবার দিকে তাকিয়ে বলতেন, ‘চাইলের মন চল্লিশটাহা। হাত-পা বেন্ধে মাথার উপর।’
তাঁর কণ্ঠস্বর ওই বয়সেও আমাকে ছুঁয়ে যেত। আমার বাবার মুখ ভেসে উঠত চোখের সামনে। ভাই বোনেদের জন্য বাবা কি করে জুটিয়ে আনছে খাবার! মা যখন রান্না করছে তখন কি ভাতের মন ভালো করা সুগন্ধের বদলে বাজে গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে বাতাসে?
তখন আমি বাবা মায়ের কাছে থাকতাম না। থাকতাম কাকা,পিসি,ঠাকুরমার কাছে। কিন্তু মনে মনে আমি খেতে বসতাম ভাইবোনদের পাশেই। ওই বিচ্ছিরি ভাত পাতে তুলে দিতে মায়ের নিশ্চয়ই কষ্ট হত। আমি দূরে থেকেও সান্ত্বনা দিতাম সবাইকে। বলতাম,‘নাক বন্ধ করে খেয়ে নাও।পরের সপ্তাহে নিশ্চয়ই ভালো চাল আসবে।’
ওই সময়ে গমের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। রেশনের মাধ্যমে সেটি আমাদের ঘরে আসে। পরিস্কার করে ভাঙালেই আটা। রুটি তখন প্রায় সবার কাছে নতুন। একটা নতুন জিনিস খাওয়ার আনন্দে সবাই খুশি হয়ে খেত।
আমি কখনো রুটি খুশি হয়ে খাইনি। চাল পাওয়া যেত না। পেলেও তা ভালো হত না। ভাতের বদলে রটি খেতে হত তাই খুব রাগ ছিল ওই খাদ্যটির উপর। মনে হত গরীব লোককে ঠকাবার জন্য সেটা আমদানি করা হয়েছে।
আজও আমি রুটি একেবারেই পছন্দ করি না। অনেকে বলত রেশন তুলতে হবে। এই কথাটা শুনলে আমার রাগ ও কষ্ট হত। এটা একটা চালু কথা। তবু শুনে আমার কেমন ভিখিরির মতো লাগত নিজেকে। তবুও যে তা আনতে যাই নি কখনো তা নয়,তবে সেটা আমার কাছে খুবই বিরক্তিকর মনে হত।
লাইনে অনেক লোকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে হত ঠেলাঠেলির মধ্যে। অনেক সময় পরে যখন আমার ডাক আসত তখন প্রথমে ছোট ব্যাগে দিত চিনি,তারপরে চাল,শেষে গম। এই গম যখন ব্যাগে ঢালত তখন নাকে এসে ঢুকত তা থেকে বেরিয়ে আসা ধুলো। ওই ধুলোতে আমার এলার্জি ছিল। তারপর সেই ব্যাগগুলি টেনে বাড়িতে নিয়ে আসা আমার কাছে ছিল অসহ্য।
এই অসহ্য কাজগুলি আমার ভাই,বোন,বাবা,মা সবাইকে করতে হত তবে আমার মতো বিরক্ত কেউ হত না।
তাই বহুদিন থেকে আমার রেশনকার্ডের প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ নেই। নেই কোনো মোহ।এখন একটি রেশনকার্ড করতে গিয়ে কত ঝামেলা তা শুনলে মাথা গুলিয়ে যায়। গরীব,আধা গরীব,গরীবের মতো,স্বচ্ছল এমন নানা মানুষের জন্য নানান কার্ডের ব্যবস্থা। এসব থাক। এতে আমার আপত্তি নেই। সবার কার্ড থাক,সবাই রেশন পাক। ভালো থাকুক।
এই রেশনকার্ড এখন নানান কাজে দরকার। একবার কার্ড করবার জন্য চেষ্টা করতে শুনতে হল,‘আপনি কি রেশন নেবেন? না শুধু পরিচয়ের জন্য?’
এতরকম কার্ড আমার আছে। এখনও কি পরিচয়ের অন্য কিছু বাকি আছে!আমার বরাদ্দের একটা চাল ও অন্যান্য কিছু তো আসে তবে সেইগুলি যাবে কোথায়? গরীব লোকেরা কি পাবে?
কে গরীব? কিসের ভিত্তিতে ঠিক করা হয়। নাম পদবী এইসব দিয়ে?
গরীব হিসেবে যার কার্ড পাওয়ার কথা সে কি পাচ্ছে? যার কয়েক বিঘা জমি আছে,নিয়মিত চাষ হয়,কোল্ডস্টোরেজে আলু রেখে দাম বাড়লে বিক্রি করে বেশি মুনাফার জন্য সে গরীব, শুধু পদবির জন্য? তার জন্য গরীব মার্কা কার্ড বরাদ্দ হবে? একটা বিশেষ নিয়মে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে একদল?
আর যে ব্রাহ্মণ পুরোহিত গ্রামে বা শহরে থাকে সে যেহেতু পদবিতে উচ্চ,অথচ আর্থিকভাবে সচ্ছল নয় তার কিছু পাওয়ার অধিকার নেই!চাকরি করে শেষ সম্বুলটুকু দিয়ে একটা বাড়ি করেছে তাই কেউ ধনী। তার যে সামান্য পেনশনে চলে না। এটা বুঝবার জন্য কোনো সমীক্ষা হয়েছে। যদি বলা হয় কার রেশন চাই না, দেখা যাবে অনেকেই তাতে নাম লেখাবে। বলবে সে চাল বাজার থেকে কিনে খাবে। ওই চাল বন্টন হোক সত্যি যাদের কিছু কেনার ক্ষমতা নেই তাদের মধ্যে।
তবে পরিচয়ের নামে যখন রেশনকার্ড করতে বলা হয় তখন খুব খারাপ লাগে। খবরে যখন জানতে পারি বাইরে থেকে এসে অনায়াসে হাজার হাজার লোক রেশনকার্ড পেয়ে যায়। টাকা দিলেই পাওয়া যায় তাধারকার্ড। এইসব কার্ডের যেন কারখানা আছে। কার বা কাদের নির্দেশে এইসব তৈরি হয়? আপনি জানতে চান শুনবেন এসব চক্রান্ত। এরজন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওসব আসলে সব কথার কথা। বলতে হয় তাই বলা।
এর মধ্যেই দিকে দিকে তৈরি হবে আমলাশোল। ওখানে যত মানুষেরা চিরকাল গিনিপিগ হয়েই থাকবে। তাদের নিয়ে কেবল চলবে চুকিৎ কিৎ খেলা।
কর তো দিতে হয় সবাইকে। একজন ভিখারি বিড়ি কিনলেও যেমন, আর একজন গাড়ি কিনলেও তাই। তবে পাওনার সময় এত টালবাহানা রকমফের কেন? কেউ সবরকম সুযোগ সুবিধা পাবে অন্যরা কেন বঞ্চিত হবে? কত রকম যে রেশনকার্ড তার নানা রকম নাম। সবটা মনেও থাকে না। যে কার্ড পেলে সত্যিই আমার ও আমার মতো অনেক লোকের কিছু আর্থিক সুবিধা হয় ও পরিচয় নির্দিষ্ট হয় সেই কার্ড কেন প্রকৃত লোককে দেওয়া হবে না। কার্ড দেওয়ার সময় আমাদের জন্য কত নিয়মের বেড়াজাল।
অথচ কত মানুষের হাতে দেখি অনায়াসে পৌঁছে যায় সেই রেশনকার্ড যাতে অল্প মূল্যে পাওয়া যায় সব।এইসব কি দেওয়া হয় সবাইকে নিজেদের বশে রাখবার জন্য? তাহলে অন্যরা কি বানের জলে ভেসে এসেছে? আজকাল শুনেছি অপছন্দের লোক হলে তাদের রেশনকার্ড কেড়ে নেওয়াও হচ্ছে। কোনো মানুষ নেই এইসব নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার।
কত মানুষের প্রয়োজন স্বল্পমূল্যের জিনিসপত্র পাওয়ার। তারা অনেকে লজ্জায় মুখ ফুটে কিছু বলে না। শুনতে হবে,মনে তো হয় আপনার কোনো অভাব নেই। আপনার ঘরে তো ফ্রিজ আছে। মাথার উপরে পাখা চলে। আপনি সেই কার্ড নিয়ে যান যেটা শুধু আপনার পরিচয় বহন করবে।
এই কথা বলার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে। আমাদের সেই বোধ আছে যদি দরকার না হয় তবে আমরা তা নেব না। না নেওয়ার কথা বলবার মানুষ আছে অনেক। তবে যে চাইছে তাকে দিতে এত সমস্যা কেন?
সাধারণ মানুষের সার্বিক অবস্থা সুন্দর ভাবনার মধ্য দিয়ে ভালো রাখার ইচ্ছেটুকু সহসা প্রকাশ পায় না। পায়নি কোনোদিন। যা কিছু দিয়েছে তার বিনিময়ে শুধু ভোট নয় নিয়েছে শান্তিতে বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও।
এখন করোনাকালে তো পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে একজন সোনার দোকানের মালিক একজন শিল্পী তারা বাধ্য হচ্ছে বাজারে সবজি,মাছ বিক্রি করতে। করোনাকালে এমন অবস্থা যে, যত দিন যাচ্ছে সব দিক থেকে মানুষ শুধু বঞ্চিত হচ্ছে। একদিকে যেমন চাকরি হচ্ছে না, তেমন যার চাকরি আছে তা্রও যাওয়ার মুখে। অনেকের এই সময়ে স্বল্প মূল্যে সমবন্টনের মাধ্যমে খাদ্য পাওয়ার উপায় কেন থাকবে না? কেন সস্তায় রেশনের চাল পেয়ে তা নিয়ে বাড়িতে রান্না করে খাওয়া যাবে না। মানুষকে প্রলোভনের হাতছানি দিয়ে কেন বাধ্য করা হবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সস্তার ভাত খাওয়ার জন্য? রেশনকার্ড পেতে এত দুর্গম গিরি,মরু পার হতে হবে কেন? অসংখ্য বঞ্চিত মানুষের হাহাকার যেমন শোনা যায় তেমন এমন মানুষও আছে যারা চিৎকার করে না। তারা যদি কখনো একটি রেশনকার্ডের জন্য প্রার্থনা করে তবে বুঝতে হবে তার সত্যিই প্রয়োজন। মঞ্চ থেকে বা যন্ত্রপাখির জানালা দিয়ে সবটা বোঝা যায় না। এর জন্য তেমন প্রতিনিধির সমবেদনার মন নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে অভয় দেওয়া দরকার।
আমি একবার রেশনকার্ড দেখেছিলাম অনেকের হাতে। সেবার ভোটের কাজে বসিরহাট কলেজে একরাত থেকে পরদিন যাবতীয় মালপত্র নিয়ে গিয়ে উঠে বসলাম একটা ম্যাটাডোরে।
ওই অঞ্চলের খানা-খন্দে ভরা রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে তো চলছেই। গাড়িতে বসে টাল খাচ্ছি। পথ যেন শেষ হতে চায় না। আমরা যাচ্ছি হাসনাবাদের প্রত্যন্ত গ্রামে। সন্ধ্যার অন্ধকারে হাজির হলাম। সারারাত প্রায় না ঘুমিয়ে খুব ভোরে উঠতে হল। যদিও সব গুছিয়ে রেখেছিলাম রাতেই।
ওই ভোরে হাঁটতে হাঁটতে হাজির হলাম দিগন্তবিস্তৃত একটি মাঠে। দেখলাম অনেক দূরে যেন দলবেঁধে আসছে মানুষেরা। একটি ছেলে ছাগল নিয়ে ভোরেই মাঠে বেরিয়েছিল। ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এত মানুষ এই ভোরে মাঠে কেন? কি করছে?’
যেন বোকার মতো কথা বলে ফেলেছি। ছেলেটি হেসে বলল, ‘এমা জানোনি? আজ ভোট আছে না? বাংলাদেশ থেকে সব ভোট দিতে আসতিছে। এসে গ্রামে গ্রামে থেইকে যাবে। তাপ্পর ভোট দিয়ে কাল চইলে যাবে।’
ভোট দিতে আসছে!ছেলেটির কথা শুনে কেমন ধাঁধা লাগল। এসব কুড়ি পঁচিশ বছর আগের কথা।
ভোট শুরু করলাম সময় মতো। নিয়ম মেনে। তখনও ভোট দেওয়ার সচিত্র পরিচয়পত্র হয়নি। বেশ চলছিল। সাড়ে তিনটের সময় একজন হোমগার্ড এসে জানাল,‘বাইরে প্রচুর লোক। সবাই আগে ভিতরে আসতে চাইছে। আমরা দু’জনে আটকাতে পারছি না। আপনি বাইরে এসে দেখে যান।’
বললাম, ‘বাইরে গিয়ে চিৎকার করে বল যে, অফিসার আসছেন। সবাই লাইনে দাঁড়ান।’ ভাবলাম অফিসার বলায় যদি কাজ হয়।
একটু পরে বাইরে গিয়ে দেখি প্রচুর লোক। লাইনে ঠিক করে দাঁড়াতে বললাম। এতক্ষণ যারা ভোট দিতে এসেছিল তাদের দেখতে দেখতে চোখ সয়ে গিয়েছিল। লাইনে যারা দাঁড়িয়ে এদের তেমন দেখতে নয়। কেমন অচেনা মনে হল। আগেরদিন রাতেই কুপন তৈরি করে রেখেছিলাম। একনম্বর কুপন দিলাম বিশাল লাইনের একেবারে শেষ লোকটিকে। কুপন দেওয়া যখন শেষ করলাম দেখি দেড়শোজনকে বিলি করা হল।
ফিরবার পথে বন্ধুদের কাছে শুনে বুঝলাম ওই অঞ্চলের সব বুথেই একই অবস্থা।
ওই লাইনের লোকেরা যখন ভোট দিতে এল নাম জিজ্ঞাসা করলাম। নির্ভুল বলল। বাবার নাম, ঠিকানা তাও নির্ভুল। অতএব ভোট দাও। প্রমাণ হিসাবে দেখাল ওদের হাতে রাখা সাদা ধবধবে নতুন রেশনকার্ড। দেখে মনে হয় যেন গতকালই তৈরি করা হয়েছে।
আমাদের কিছু বলার ছিল না। তবে মনটা বিষণ্ণ হয়ে ছিল। আমরা যে অঞ্চলে ভোট নিয়েছি লাইনে দাঁড়ানো লোকগুলি যে ঐ অঞ্চলের নয় তা আন্দাজ করতে পারলেও আমাদের কিছু করার ছিল না। ভোটার লিস্টের নামের সঙ্গে ওদের রেশনকার্ডের নাম মিলে গিয়েছিল বাবার নাম অবধি!
সেবার প্রার্থী জিতেছিলেন বিপুল বিপুল ভোটে।
তখন মনে হয়েছিল একটা রেশনকার্ড,ভোটারকার্ড,প্যানকার্ড,আধারকার্ড করতে গিয়ে আমাকে কেন কাগজের বোঝা নিয়ে ঘুরতে হয় নিজেকে নানান প্রমান দিয়ে বোঝাবার জন্য!
যে ধবধবে সাদা রেশনকার্ড সেদিন ছিল সবার হাতে তার ভিতরটা কত কালো। এই কার্ডে যাবতীয় খাদ্যদ্রব্য আমাদের এখান থেকে নিয়ে তা চলে যায় অন্যত্র। আমাদের এখানে দিকে দিকে তৈরি হয় আমলাশোল। হঠাৎ কখনো কোনো সন্ত্রাসবাদী বা দুষ্কৃতী ধরা পড়লে দেখা যায় তাদের কাছে পাঁচটা পাসপোর্ট বিভিন্ন নামে। পাওয়া যায় অনেকগুলি সিমকার্ড। বিদেশি টাকা, আগ্নেয়াস্ত্র। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তো এত কিছু দরকার নেই চাহিদা তো সামান্য। তা পেতে আমাদের এত হয়রানি কেন? বাংলাদেশে যাওয়ার সময় একটা পাসপোর্ট করতে যে কি ঝামেলা হয়েছিল তা আমি ভুলব না। তখন এক লেখক বন্ধু সাহায্য না করলে সেটা হত না। সেটাকে রিনিউ করাতে গিয়ে যে হাঙ্গামা সব শুনে আর ইচ্ছে হয় নি। কোথায় বা যাব আর, এই করোনাকালে। অথচ কত সহজে অভিযুক্তরা এই আছে শহরে, হঠাৎ চলে গেল অন্য কোনো মহাদেশের এক দ্বীপে। তাদের কাছে এসব যেন অতি সহজ। বাড়ি থেকে বেরিয়ে গলির মাথায় ছোটনদার দোকানে গিয়ে চায়ের আড্ডায় বাসার মতো।
অপরাধী বলে সনাক্ত করা লোকের জন্য সব আছে। আমাদের জন্য আছে অযথা হয়রানি। যার তুলনা নেই।