অন্তরঙ্গ মানে
কোনো অমর্ত্য গান নয়
মখমলে ঘাসের ওপর ঝরে পড়া ঘনগহন নীরবতা
তুমি যে দেশে আছো
নিঃশ্বাসের অজুহাতে আমি সেখানে নেই
আমি আছি তোমার
আর্দশ মহাজীবনের কাছাকাছি
শূন্য দশকের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি হলেন
কবি সৌরভ চন্দ্র। অনেকর কাছেই তিনি একজন বাস্তববাদী কবি হিসাবে পরিচিত । কবি তাঁর কবিতায় বাস্তব জীবনের থেকে গভীর অনুভূতি তুলে এনে তাকে ব্যাখ্যা করেছেন বাস্তবের আলোয় ।
কবি সৌরভ চন্দ্রের কবিতায় পরাবাস্তবতা থাকলেও সেটা সীমিত, কবির মৃত্যুবিলাসিতা থাকলেও কবি কখনই নৈরাশ্যবাদী ছিল না ।
কবি সৌরভ চন্দ্রের জন্ম ১৪ জানুয়ারি, ১৯৭৯ সালে । তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর পাশ করেন। তিনি অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান নিয়ে বিভিন্ন গবেষণামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কিন্তু এসবের বাইরে যা থাকে তা হল কবি ব্যক্তি মানুষ হিসাবে কেমন ছিলেন পরিচিতদের কাছে ।
যেখানে কবি নিজে মনে করতেন-
“একজন খুনী যদি খুব ভালো কবিতাও লিখে ফেলে তাহলে তা ছাপানোর মানে যেতে পারে না।”
এই মতবাদকে সামনে রেখেই কবি নন্দনের বুকে এক নজির স্থাপন করেন । দিকপাল ও বিশিষ্ট
কবিদের নষ্ট মানসিকতা, নারীদের প্রতি আসক্তি ও মানসিক নোংরামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন । বহু মানুষকে একজোট করে লকডাউনের মধ্যেই গঠন করেন ” বাংলার লেখক ও শিল্পী মঞ্চ” ।
কবি সৌরভ চন্দ্র একজন কবিই নন, তিনি একজন নিপুণ সংগঠকও ছিলেন । আমাদের প্রত্যেকের মাঝে ছিলেন ‘এক বিনি সুতার মালা’ ।
সমকালীন কবি সঞ্জয় গুহঠাকুরতা কথায় –
‘ কবি সৌরভ চন্দ্র হল একটি চলমান কবিতা গাড়ি,পিঠে ব্যাগ নিয়ে কবিতার জন্য সারা শহর দাপিয়ে বেড়ায় ।’
কবি কৌশিক চক্রবর্ত্তীর সঙ্গে নন্দনে একদিন কথা প্রসঙ্গে উঠে আসে সৌরভ দার নাম।
সৌরভদা তখন আমাদের মাঝে বহালতবিয়াতে হাসির ফোয়ারা ছোটাচ্ছে । কৌশিকদা খুব অবাক দৃষ্টিতে সৌরভদার দিকে তাকিয়ে বলেছিল –
” এই মানুষটা কবিতা গুলে জল খায়,
কবিতা চিবিয়ে পেট ভরায় দুপুরে , কবিতার জন্যই এর জন্ম, রাতে বাড়ি গিয়ে কবিতা মেখে ভাত খেয়ে হয়ত বই এর মধ্যেই মুখ গুঁজে বসে থাকে ।”
সেদিন কবিতার জন্য জন্ম বলেছিল কৌশিক দা,
কবিতার জন্যই যে মৃত্যু হবে সৌরভদার সেটা ভাবিনি কোনোদিন।
সৌরভদাকে নিয়ে লিখতে বসে আজ আমার হাত কাঁপছে। এমন কোনো প্রতিবেদন দাদার জন্য আমাকে লিখতে হবে বলে ভাবিনি।
সৌরভ চন্দ্র দার কবিতার দিকে চোখ দিলে দেখা যাবে তাঁর কবিতা খুবই সহজভাবে লিখিত। কিন্তু এগুলো সহজবোধ্য মনে হলেও এই ভাবনায় অন্তর্নিহিত হয়ে আছে রাজনীতি ও সমাজনীতির মতো গভীর বোধের বিষয়গুলো। কিছু কিছু কবিতা ভাবনা শূন্য দশকের কবিতাগুলোর মধ্যে নিজস্বতার রেখাপাত করেছে মনের গহীনে ।
এইতো সেদিনের ঘটনা বলে মনে হয়, যখন প্রতি মধ্যরাতে সৌরভদার ফোন আসত । দাদার ঘনিষ্ঠ মহল জানে সৌরভদা প্রিয় ফোনগুলো রাত একটার পরেই করে । যাই হোক, বেশির ভাগ সময়ই কবিতা চর্চাই হত । দাদা অনর্গল বলে যেতেন ষাট থেকে আশির দশকের হারিয়ে যাওয়া কবিদের কবিতা।
নিজের কবিতাও পাঠ করতেন ।
তাঁর মধ্যে একটি লাইন এখন মনে পড়ছে ভীষণ রকম-
“জীবন তো নয় যেন জলে ভাসা ফাতনা ।”
একদিন আমি বিশ্বাসঘাতকতায় জ্বলছি , রাত্রে সৌরভদা শোনালেন-
“কতদিন এক বোতলের মদ খেয়েছি ,
কতদিন শালা এক মাগিতে শুয়েছি,
আর আজ
এই অন্ধকারে আমাকে ডেকে এনে
পিছন থেকে ছুড়ি মেরে দিলি!
দেখ কেমন ভেসে যাচ্ছে আমাদের পরিচিত নগর।”
সৌরভদা পিতৃহারা হবার পর থেকে একটা নিরলস যন্ত্রণায় ভুগতেন সারাক্ষণ , সেটা কাউকে বুঝতে দিতেন না কোনোদিন ।
বড্ড চাপা স্বভাবের মানুষ ছিলেন ।
তাঁর ‘বাবা’ কবিতাটি পড়লে সে ধারণাই জন্মায় ।
বাবা
সৌরভ চন্দ্র
( কাব্যগ্রন্থ : ‘ধর্মকুকুর’ )
এই গাছটাকে কিছুতেই আমি অতিক্রম করতে পারি না আমি যত বড় হই, তার দ্বিগুণ বড় হয়ে যায় এই গাছ আমি যত দুঃখ পাই তার দ্বিগুন একে স্পর্শ করে দেখি একেকদিন রাত্তিরে, অনেক রাত্তিরে বাড়ি ফেরার সময় জানি
এই গাছ আর আমার বাবা ছাড়া কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করবে না ।
চিরকালই দাদার বঞ্চিতদের প্রতি টান ছিল বেশি। তাই সারাজীবন তরুণ কবিদের উত্থানের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। দাদার অকাল প্রয়াণের পর তাঁর বাল্য বন্ধু রাজীব কান্তি রায় লিখছেন নিজের টাইম লাইনে- “তুই অভিমানে চলে গেলি। এটা আত্মহত্যা, আমি জানি। আসলে তোর মতো বোকা’দের এই স্বার্থপরের দুনিয়ায় থাকার যোগ্যতাই নেই।”
কবি সৌরভচন্দ্র সর্বোপরি একজন মানবিক কবি ছিলেন । নিজের ভালো মন্দের বিচার না করে চিরকাল নিজেকে নিয়োগ করেছিলেন মানব সেবায়।
আর সেটাই তাঁর মৃত্যুর কারণ হল বলে মনে করেন তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল । ৯ ই এপ্রিল কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়কে করোনাকালীন অবস্থায় শিশুমঙ্গল হাসপাতাল থেকে স্থানান্তরিত করা হয় এম. আর. বাঙ্গুর হাসপাতালে। কবি নিজেই সব দায়িত্ব নেন এ কাজের।
১০ ই এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়।১১ এপ্রিল তাঁর স্মরণসভা হয় বাঙ্গুর হসপিটালে, তাঁর বিদেহী দেহকে সাক্ষী রেখে। সৌরভদার সাথে উপস্থিত ছিলাম আমি, কবি প্রদীপ গুপ্ত, কবি ভাষ্কর চট্টপাধ্যায়, কবি ফাল্গুনী ঘোষ, কবি বিশ্বজিত ও আরো অনেকে । এই ঘটনার পরে পরেই সংক্রমিত হয় সৌরভদা । আমার সাথে দাদার শেষ দেখা হয়েছিল ১১ এপ্রিলে। আর কবির অন্তিম যাত্রায় দেখা হয় ৫ মে বাঙ্গুর হসপিটালে ।
ঠিক যেখানে ছেড়ে এসেছিলাম শেষবার, সেখানেই।
কবি সৌরভ চন্দ্র আর নেই , শোক জ্ঞাপন করেছেন কবি ও সাংবাদিক অমিত গোস্বামী, তিনি লিখছেন –
“প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিস্পর্ধী কবি ছিল সৌরভ। কবিতার কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে ওঠা স্বর আবর্তিত হয়ে উঠেছিল তাকে ঘিরে। রাজনৈতিক উদারতায় দাঁড়াত সে সকলের পাশে। নিজে খুব ভালো কবি হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রলোভনকে জয় করে সে এগিয়ে ছিল প্রকৃত নেতার মত। তার এই অকালপ্রয়াণ তরুণদের কবিতা আন্দোলনের পক্ষে বড় ক্ষতি হয়ে উঠল। এ ক্ষতি পূরণের নয়।”
লিখছেন তার শেষ সময়ের সাথী কবি প্রদীপ গুপ্ত –
“আমার মনে হয় সৌরভ যদি অন্য কিছু না করে শুধু কবিতাই লিখতো তাহলে ওর কলম বাংলা সংস্কৃতিকে আরও কিছু উজ্জ্বলতা উপহার দিতে পারতো। কিন্তু ও যে মানুষের পাশে দাঁড়াতেই মানুষের জন্ম নিয়েছিলো।”
যে মানুষটি অসংখ্য মানুষের বিপদে ঝাপিয়ে পড়ত তাঁর শেষকালে সঙ্গী ছিলেন গুটিকতক
বাল্যবন্ধু, রাজীব দা , ছায়াসঙ্গী মৈদুলদা , লেখক ভাস্কর চট্টাপাধ্যায় ও পরিবারের কয়েকজন ।
এই দীর্ঘ আঠারো দিন লেখক ভাস্কর চট্টাপাধ্যায়
সৌরভদার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত ছিলেন ।
সব শেষের পর ভাস্করদা লিখে জানিয়েছেন –
“ধণাত্মক ভঙ্গিতেও ঋণাত্মক কথা বলা আর অদ্ভূত নীরবতায় সোজা সাপ্টা প্রতিবাদ করার রূপক হয়ে নবীন প্রজন্মের কাছে ধ্রুবতারা হয়ে থাকবে সৌরভ চন্দ্র । অটুট ভরসা ও অনন্ত স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে সৌরভ থেকে যাবে অসংখ্য অক্ষর যাপকদের হৃদয়ের মণি কোঠায় ।”