• Uncategorized
  • 0

|| ঈশ্বর, ডার‌উইন ও একটি ব‌ই || লিখেছেন মৃদুল শ্রীমানী

জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর। বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন। চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।

ঈশ্বর, ডার‌উইন ও একটি ব‌ই

চার্লস রবার্ট ডার‌উইন প্রথম যৌবনে পারিবারিক অর্থ ব্যয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন সমুদ্র ভ্রমণে। তবে সেটা নেহাত শখের ভ্রমণ ছিল না। এই সমুদ্র যাত্রা ডার‌উইনের জীবনকে বদলে দেওয়া একটা ঘটনা। শুধু ডার‌উইনের নয়, সারা পৃথিবীর শিক্ষিত আর জিজ্ঞাসু গ্রহিষ্ণু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেওয়া একটা ঘটনা ছিল এই সমুদ্রযাত্রা। ডার‌উইনের এই সমুদ্র যাত্রাটা একটা সাধারণ ছেলের মধ‍্য থেকে একজন প্রতিভাধর যুগন্ধর বিজ্ঞানীকে বের করে আনল। যাত্রা শুরুর তারিখটা ছিল সাতাশে ডিসেম্বর, ১৮৩১। জাহাজ ভাসল প্লিমাউথ সাউণ্ড বন্দর থেকে। ডার‌উইনের তখন বাইশ বছর বয়স। ছাব্বিশ বছর বয়সী ক‍্যাপ্টেন রবার্ট ফিটজরয় বাইশ বছরের রবার্ট ডার‌উইন কে সঙ্গী হিসেবে পছন্দ করলেন ক্লান্তিকর, একঘেঁয়ে সমুদ্র যাত্রায় একটা ভদ্র পরিবারের সমবয়সী যুবককে পাশে পাবেন বলেই। জাহাজের নাম এইচ এম এস বীগল।
 ডাক্তারবাবুর মেজোছেলে চার্লস। ডাক্তারবাবুর নাম রবার্ট ওয়ারিং ডার‌উইন। আর চার্লসের মায়ের নাম সুসান্না ওয়েজ‌উড। সে ছেলের আট বছর বয়সে তার মা মারা গেলেন। তিনটি বড় দিদি মা হারা ভাইকে আগলে রাখত। বাবা ডাক্তার। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রোগী দেখেন। অশেষ ধৈর্য নিয়ে রোগীর অভিযোগ শোনেন। রোগীকে পরীক্ষা করেন। কোনটা রোগীর বানানো কথা, আর কোনটা সত্যি, তা যাচাই করে রোগ নির্ধারণ করেন। তারপর ঔষধ নির্বাচন। বাবার কড়া পর্যবেক্ষণ প্রণালী ছোটো থেকেই চার্লসের মনকে তৈরি করে দিয়েছিল।
পিতামহ এরাসমাস ডার‌উইনও ডাক্তার ছিলেন। তার উপর তিনি ছিলেন কবিমনের মানুষ। আর মুক্ত চিন্তার পথিক। ফরাসি বিপ্লবের আগের যুগের মানুষটি ১৭৯৪ থেকে ১৭৯৬ সালের মধ্যে জুনোম‍্যানিয়া অর দি লজ় অফ অরগানিক লাইফ নামে একটা ব‌ই লিখেছিলেন। নাতি চার্লসের জীবনে এই পিতামহ এরাসমাসের খুব বড়ো একটা প্রভাব আমরা দেখতে পাব।
 নয় বছর বয়সে চার্লস পড়তে গেলেন অ্যাংলিক‍্যান শ্রুসবারি স্কুলে। সেটা ১৮১৮ সাল। ১৮২৫ সাল অবধি ওখানে পড়বেন। সেকালে ইংল্যান্ডের স্কুলে ছোটবেলা থেকেই ধ্রুপদী সাহিত্য অবশ‍্যপাঠ‍্য ছিল। আর বিজ্ঞানপাঠকে বেশ একটু সন্দেহ ও অবিশ্বাসের চোখে দেখা হত। মনে করা হত বিজ্ঞানের চর্চা মানবমনের সুকুমার বৃত্তিগুলিকে নষ্ট করে দেয়। ডাক্তারের নাতি ও ডাক্তারের ছেলে চার্লস কিন্তু বিজ্ঞান বিষয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন। বিশেষতঃ রসায়নে প্রগাঢ় আকর্ষণ ছিল তাঁর। তবে সে আগ্রহ মোটেও ব‌ইয়ের ধরাবাঁধা গৎএ নয়। চার্লস খেয়াল খুশির চর্চা চালাতেন রসায়নাগারে। সেটা দেখে প্রধান শিক্ষক মোটেও খুশি ছিলেন না তার উপর। আর সহপাঠীরা তাকে গ‍্যাস বলে খ‍্যাপাতো।
 ছেলে চার্লসের উপর বাবা ওয়ারিং ডার‌উইনও খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি দেখলেন, ছেলের ষোলো বছর বয়স হল, তবু সে সিরিয়াস হয়ে উঠল না। কেবল বন্দুক হাতে পাখি শিকারে বেরিয়ে সময় নষ্ট করে। বাবা ধরেই নিয়েছেন, ছেলেটা আর মানুষ হল না। তবু পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে ছেলেকে ডাক্তার বানাবার চেষ্টা করলেন বাবা ডাঃ রবার্ট ওয়ারিং ডার‌উইন।
 মেডিসিন নিয়ে পড়তে পাঠিয়ে দিলেন স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেটা ১৮২৫ সাল। মেডিসিন নিয়ে পড়তে গেলেও চার্লস মনের খুশিতে এতোল বেতোল পড়াশুনা ধরলেন। সদ‍্যোজাতা ধরণীর পাথুরে দেহটা কিভাবে গড়ে উঠল, আর কেন কিভাবে সেই পাথর ঠাণ্ডা হতে হতে ভিতরে নানা রকম রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলল, এ নিয়ে চার্লসের আগ্রহ ছিল। আর আগ্রহ ছিল তখনো অবধি বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদকে একটির থেকে আরেকটি কে আলাদা করে চেনা, বা বর্গীকরণের আধুনিক পদ্ধতি, সেটি আয়ত্ত করা। আর দক্ষিণ আমেরিকার পাথর, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের বৈশিষ্ট্য শেখা। এই শেখার কাজে চার্লসের শিক্ষক ছিলেন জন এডমন্ডস্টোন। তিনি ছিলেন একজন মুক্তিপ্রাপ্ত দক্ষিণ আমেরিকান ক্রীতদাস। এডমন্ডস্টোন তাঁকে আরো শিখিয়েছেন কেমন করে পাখির দেহ মিউজিয়ামে সংরক্ষণ বা স্টাফ করতে হয়।
 চার্লস রবার্ট ডার‌উইন এডিনবরায় পেয়েছিলেন আরেক রবার্টকে। তিনি রবার্ট এডমন্ড গ্রান্ট। এই গ্রান্ট ছিলেন ফরাসি জীববিজ্ঞানী জাঁ ব‍্যাপটিস্ট ল‍্যামার্ক এর শিষ্য। আর স্পঞ্জ বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। গ্রান্টের সঙ্গে চার্লস সমুদ্রের তীরে বেড়িয়ে বেড়াতেন, আর সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণীর শরীর সংগ্রহ করতেন। গ্রান্ট ভাবতেন, আদিম তরুণী পৃথিবীর সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের থেকে ক্রমশঃ জটিল ও উন্নততর প্রাণীর উৎপত্তি ঘটেছে। গ্রান্টের এই ধারণা চার্লসকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
এডিনবরায় আরেকটা জিনিস হয়েছিল। চার্লস ছোটোবেলার পাঠ পেয়েছিলেন অ্যাংলিক‍্যান স্কুলে। অ্যাংলিক‍্যান মানে ক‍্যাথলিকপন্থী, অর্থাৎ গোঁড়া। সে সময়ে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলি, যেমন অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, এগুলিতে অ্যাংলিক‍্যান মতবাদের প্রাধান্য ছিল। অন‍্য ঘরাণার ছাত্রদের সেখানে ঠাঁই হত না। কিন্তু এডিনবরায় সেই কড়াকড়ি ছিল না। এখানে কিছুটা মুক্তচিন্তার পরিসর জুটেছিল। গ্রান্ট ছিলেন একজন র‍্যাডিকাল, বা যুক্তিবাদী, সংশয়ী ও প্রশ্নশীল মানুষ। শাস্ত্রকে তিনি বিনা বিচারে মেনে নিতে চাইতেন না। যাঁরা পুরোনো ধাঁচের খ্রীস্টানি আর তার গোঁড়ামিকে মেনে নিতে পারত না, অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে তাঁরা কোণঠাসা হয়ে যেতেন। এঁদের অনেকেই এসে জুটেছিলেন এডিনবরায়। আর যাই হোক, এডিনবরায় সে সময় বিজ্ঞান পড়ার খুব ভালো পরিবেশ ছিল। এখানে নবীন মনের চার্লসের উপর উঁচু ক্লাসের র‍্যাডিকাল বা প্রশ্নশীল, যুক্তিবাদী ছাত্ররা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। এই ছাত্রদের সংস্পর্শে এসে চার্লস শুনলেন, মানুষের মুখের গঠনের যে অ্যানাটমিগত বৈশিষ্ট্য, তাতে ঈশ্বরের কোনো অবদান নেই। এই ছাত্ররা আরো বলাবলি করতেন যে, মানবমনের যে নানারকম দিক, তার সবগুলোই জীবজন্তুর মধ‍্যেও দেখা যায়। এই ধরণের আরেকটি আলোচনা সেখানে চলত যে, মানুষের খুলির ভিতর যে মগজ বা ঘিলু নামে রক্ত মাংসে তৈরি জিনিসটা আছে, মানুষের মন হল তার‌ই ক্রিয়ার ফল। এই জিনিসটা সামাজিক জ‍্যাঠামশায়দের পক্ষে হজম করা সম্ভব হত না। চার্লস ডার‌উইন এইসব ধারণাকে মনে মনে গ্রহণ করলেও তিনি জানতেন চার্চ ও সমাজের রীতিপ্রকৃতি এইসব ধারণাকে মেনে নেবে না। তিনি জানতেন, তাঁর পিতামহ এরাসমাস ডার‌উইন ট্রান্স মিউটেশন নাম দিয়ে আসলে ইভলিউশনের কথা বলতেন। আরো বলতেন, ঈশ্বরের ইচ্ছায় মানুষের সৃষ্টি হয় নি, আর এমন সব মতবাদ পোষণ করার জন‍্য তিনি গুণী পণ্ডিত হলেও, সামাজিক অবহেলা ও অবজ্ঞার পাত্র হয়েছিলেন।  চার্লস আরো লক্ষ করেছিলেন, সেই গুণী মানুষটি, যিনি একসময় ক্রীতদাসত্বের জীবন কাটাতে বাধ‍্য হয়েছেন, সেই জন এডমন্ডস্টোন কতো মানসিক বৈভবের অধিকারী। ঈশ্বর তো এঁকে দাস হিসেবে সৃষ্টি করেন নি। সভ‍্যমানুষ  কুৎসিত নিয়মে  এমন একজন গুণী মানুষকে দাস বানিয়েছে।
 এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে তরুণ ডার‌উইন অনেক কিছুই শিখলেন, কিন্তু যে জিনিসটি পড়ে জীবনে সফল হবার জন্য বাবা তাঁকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন, সেই চিকিৎসা বিদ‍্যাটুকু তিনি পড়লেন না। অ্যানাটমির ক্লাস চার্লসের ভাল লাগত না। তখনো ক্লোরোফর্মের মতো চেতনানাশক পদার্থ তৈরি হয় নি। তা তৈরি হবে ১৮৩১ এর পর। চেতনানাশক পদার্থ প্রয়োগ না করে যে শল‍্যচিকিৎসা, তাতে রোগীর অবর্ণনীয় কষ্ট চার্লসকে বিরক্ত করত। ছেলে চিকিৎসা বিদ‍্যা বাদ দিয়ে অন‍্য নানারকম বিষয়ে মাথা ঘামাচ্ছে দেখে, বাপের বেশ রাগ হল। রবার্ট ওয়ারিং ডার‌উইন ধরেই নিলেন তাঁর ছেলে চার্লস একেবারেই বয়ে যাচ্ছে। ছেলের উচ্ছন্নে যাওয়া ঠেকাতে ডাঃ ওয়ারিং ১৮২৮ সালে বছর  ঊনিশের চার্লসকে কেমব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে বিএ ক্লাসে ভরতি করে দিলেন। ভাবলেন বাপ ঠাকুরদার ঐতিহ্য মেনে ডাক্তার যখন হবি না, তখন পাদ্রি হ।
এবারে একজন গোঁড়া ধর্মভীরু ভদ্রলোক যেমনটি হন, সেই জীবনে ডার‌উইন চলে গেলেন। ঘোড়ায় চেপে এখানে ওখানে ঘোরা, মদ খাওয়া, জীবজন্তু শিকার, এইসব বড়লোকের উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলেদের অভ‍্যাস নকল করতে করতেই ১৮৩১ সালে ডার‌উইন ক্রাইস্ট কলেজে বিএ ক্লাসে চূড়ান্ত ফলে দশম স্থানটি অধিকার করে ফেললেন। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল‌ই। ক্রাইস্ট কলেজে চার্লসের ওই প্রবণতাটা চোখে পড়ে গেল উদ্ভিদবিদ‍্যার অধ‍্যাপক রেভারেন্ড জন স্টিভেনস হেনসলো’র। হেনসলো গোঁড়াপন্থীদের মতো করে উদ্ভিদবিদ‍্যাচর্চায় নাম কিনেছিলেন। আরেকজন অধ‍্যাপক রেভারেন্ড অ্যাডাম সেজ‌উইক যিনি বিশ্বাস করতেন ঈশ্বরেচ্ছায় প্রাণীজগৎ বিকশিত হয়েছে, তিনিও চার্লস ডার‌উইনকে স্নেহভরে লক্ষ করলেন।
ডার‌উইন ওই বয়সেই পড়েছিলেন আলেকজান্ডার ভন হামবোল্ডট এর লেখা দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলের ভ্রমণকাহিনি। দক্ষিণ আমেরিকা যেন চার্লসকে টানছে। টানছে তার সমস্ত ভূপ্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে। এডিনবরার দিনগুলোয় দক্ষিণ আমেরিকার এক ভূমিপুত্র একসময়ের ক্রীতদাস জন এডমন্ডস্টোনকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন চার্লস। তিনি তাঁকে দক্ষিণ আমেরিকার পাথর আর প্রাণীজগৎ নিয়ে প্রাণবন্ত শিক্ষা দিয়েছিলেন। আর হাতে ধরে শিখিয়েছেন পাখির শরীর সংরক্ষণের কাজ। সেই সব মনে ছিল চার্লসের। এমন সময় অধ‍্যাপক হেনসলো খবর আনলেন, একটি জাহাজ দক্ষিণ আমেরিকায় পাড়ি দিচ্ছে। জাহাজের নাম এইচ এম এস বীগল। ক‍্যাপ্টেন রবার্ট ফিটজরয়। ছাব্বিশ বছরের সুঠাম অভিজাত তরুণ। জাহাজ চলেছে ওদিকপানে ইংল‍্যাণ্ডের ব‍্যবসা বাড়ানোর পথ তৈরি করতে। ঘরের পয়সা খরচ করে বীগল জাহাজে সেই যাত্রার সঙ্গী হলেন চার্লস ডার‌উইন, পরবর্তীকালের মহাবিজ্ঞানী। ক‍্যাপ্টেন রবার্ট ফিটজরয় তাঁর থেকে বয়সে বছর চারেকের ছোট চার্লসকে বুকে টেনে নিলেন। সুশিক্ষিত এই ছাত্রের সংশ্রবে তাঁর দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ক্লান্তি দূর হবে। জাহাজের ক‍্যাপ্টেন চার্লসকে উপহার দিলেন চার্লস লায়েল এর প্রিন্সিপলস্ অফ জিওলজি, আর লণ্ডন চিড়িয়াখানার বিশেষজ্ঞরা কিভাবে মৃতপশুর দেহ সংরক্ষণ করেন, সেই নিয়ে নোটস। ১৮৩১ সালের সাতাশে ডিসেম্বর এইচ এম এস বীগল প্লিমাউথ সাউণ্ড বন্দর থেকে পৃথিবী ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ল। ডার‌উইন তখন বাইশ বছরের নবীন যুবা। ভেসে পড়ার সময় স্থির ছিল, জলযাত্রাটি হবে বছর দুয়েকের। কিন্তু তা গিয়ে ঠেকল পাঁচ বছরে। অবশ‍্য এই পাঁচ বছরের পুরো সময়টা ডার‌উইন জাহাজে থাকেন নি। তিনি জাহাজে ছিলেন মাত্র আঠারো মাস। আর বাকিটা তিনি ফিল্ড ওয়ার্ক করেছেন। তারমধ‍্যে ছিল বিস্তর পশুপাখি নজর করা ও তথ‍্য নথিভুক্ত করা, ফসিল বা জীবাশ্ম কুড়িয়ে আনা। বীগল জাহাজ লণ্ডনে ফিরেছিল ১৮৩৬ সালের অক্টোবর মাসের দুই তারিখে।
ভ্রমণের কালে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন ডার‌উইন। উঠতেন পাহাড়ে। লক্ষ করতেন জমি জেগে উঠছে। প্রবল কল্পনায় টের পেতেন, ভূঅভ‍্যন্তরের শক্তি ঠেলে তুলছে জমিকে। ১৮৩৫ সালের ১৫ জানুয়ারি তিনি দেখেছেন মাউন্ট অসর্নো আগ্নেয়গিরি লাভা উদ্গীরণ করছে। তার মাসখানেক পরে চিলির ভ্লাদিভিয়ায় ফেব্রুয়ারির কুড়ি তারিখে জঙ্গলের মাটিতে ঘাসে শুয়ে থাকতে থাকতে তিনি ভূমিকম্প টের পেয়েছেন। মহাদেশ জাগছে, মাথা তুলছে। প্রকৃতির আরো শক্তি জুটেছে তার সাথে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী মরে গিয়ে গড়ে তুলছে প্রবালদ্বীপ। যা ছিল সমুদ্র তীরের কাদাভূমি, মহাদেশিক শক্তি তাকে ঠেলে তুলে উঁচু বেলে পাথরের পাহাড় করে দিয়েছে, আর তার ভিতর ধরা পড়ে রয়েছে সেদিনের মহীরুহের জীবাশ্ম। সময়রেখার গভীরে গিয়ে চিন্তা শুরু করেন ডার‌উইন। এরপর এলেন গ‍্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে। এখানে দেখলেন সামুদ্রিক ইগুয়ানা আর দৈত‍্যাকার কচ্ছপ। আর মকিংবার্ড, এখানেই ডারউইনের সেই বিখ‍্যাত ইউরেকা সময়, সেই অসামান্য দৃষ্টি উন্মোচন। এক‌ই অভিন্ন প্রজাতির পাখি দ্বীপ ভেদে আলাদা আলাদা খাদ‍্যাভ‍্যাসের দরুণ ঠোঁটের আলাদা আলাদা গড়ন পেয়েছে। ডারউইন যখন বাড়ি ফিরছেন, তখন তাঁর ৭৭০ পৃষ্ঠা ডায়েরি লেখা হয়ে গিয়েছে। সঙ্গে আরো রয়েছে ১৭৫০ পৃষ্ঠা নোটস, আর ৫৪৩৬টি জীবজন্তুর দেহাবশেষ নিয়ে তৈরি বারোটি ক‍্যাটালগ। আর ভিতরে ভিতরে বদলে যেতে থাকা একটা মানুষ। এখন আর বন্দুক ধরে পাখিশিকারে তার মন যায় না। এখন কলমটাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে ইচ্ছে করে। নিজের ভিক্টোরিয়ান চিন্তার নিগড় থেকে তিনি যেন মুক্তি পেয়ে গেছেন। এখন ঈশ্বর আর পৃথিবীর কলকাঠি নাড়াতে সাহস পান না। সেকাজ করে প্রাকৃতিক শক্তি, যাকে বৈজ্ঞানিক পথে লক্ষ করা যায়, ব‍্যাখ‍্যাও করা যায়।
ইংল‍্যাণ্ডে ফিরে বিদ্বৎসভায় তিনি নিজের দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের তথ‍্য পরিবেশন করলেন। বিষয়ের বৈচিত্র্যে, পর্যবেক্ষণের কৌশলে, চিন্তা ও বিশ্লেষণের গভীরতায় সে বক্তব্য বুধমণ্ডলীর শ্রদ্ধা আকর্ষণ করল। আর সাথে করে যে অজস্র  জীবাশ্ম আর দেহাবশেষ এনেছিলেন ডারউইন, তা বিজ্ঞান জিজ্ঞাসুদের কাছে আদর পেল। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিত সমাজ এই বিপুল সংগ্রহকে মান‍্যতা দিলেন। দিলেন আর্থিক সহায়তা।
ডারউইন তাঁর ডায়েরিটি লিখেছিলেন যত্ন করে। তা ঠিক তারিখ ধরে ধরে নয়। বরং এলাকা ধরে ধরে। সেই ডায়েরিই ব‌ই হয়ে বেরোলো ১৮৩৯ সালে। নাম হল দি ভয়েজ অফ দি বীগল। সে ব‌ই বেশ আদর পেল। কিন্তু ডারউইনের জলযাত্রার ভিতরকথা, আসল অভিজ্ঞান ধরা আছে তাঁর অরিজিন অফ স্পিসিস ব‌ইতে। সে জিনিস ব‌ই আকারে বের করতে ডারউইন সময় নিলেন। বেশ অনেকটা সময়। ইংল‍্যাণ্ডে সে সময় বেশ একটা টালমাটাল চলছে। রাজশক্তি কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে জটিলতা। অ্যাংলিক‍্যানরা গোঁড়া আর প্রাচীনপন্থী। তাঁরা স্থিতাবস্থার পক্ষে। এই পরিস্থিতিতে ডার‌উইন যদি ঈশ্বরকে বেকার বানিয়ে পথে বসিয়ে দেন, প্রমাণসহ দেখিয়ে দেন যে ঈশ্বরের হাতে কিছুই ছিল না, তাহলে তার বিপুল সামাজিক অভিঘাত হবে।
 ইংল‍্যাণ্ডে ইতিমধ‍্যেই চার্চের কর্তৃত্ব নিয়ে নানা কোণে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। ডারউইনের পারিবারিক ধর্মবিশ্বাসের শিকড় ছিল ইউনিটারিয়ানিজম এ। এঁরা ধর্ম মানতেন। চার্চকেও মানতেন। তবে গোঁড়াপন্থীদের মতো যুক্তি বুদ্ধিকে শিকেয় তুলে রেখে নয়। যুক্তিসংগতভাবে ধর্মকে যতটা মানা যায়, ততটাই মানা ছিল ইউনিটারিয়ান মতবাদের বৈশিষ্ট্য। তবু ডারউইন ভাবলেন তাঁর পর্যবেক্ষণ সঞ্জাত তথ‍্য ও তার নৈষ্ঠিক নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণ সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেবে। এই সময় চার্লস ব‍্যাবেজ নামে বিখ্যাত গণিতবিদ প্রথম কমপিউটার তৈরি করেছেন। নাম তার অ্যানালিটিক‍্যাল ইঞ্জিন। প্রতিভাধর ব‍্যাবেজ এসময় খ‍্যাতির শীর্ষে। তিনি ঈশ্বরকে  সমস্ত বিশ্বজগতের প্রোগ্রামার বা পরিকল্পক ব‍্যবস্থাপক বলে বর্ণনা করেছেন। আর ডারউইনের মনে ছিল পিতামহ কিভাবে স্বদেশ স্বজাতির কাছে নূতন দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারের জন‍্য ধিক্কৃত ও নিন্দিত হয়েছিলেন। তিনি আরো জানতেন সত‍্যপ্রকাশের জন‍্য জিওর্দানো ব্রুনো ও গ‍্যালিলিও প্রমুখ মহান জ‍্যোতির্বিজ্ঞানীদের দুর্গতির কথা। শাস্ত্রবিরোধী কথা বললে কি কি ধরণের নির্যাতন হতে পারে, ডারউইনের সেই ধারণা ছিল। এইসব উদ্বেগ ডারউইনকে অসুস্থ করে দিত। তাই অরিজিন অফ স্পিসিস বের করতে তিনি সময় নিলেন অনেক।  ১৮৩৬ এর শেষ দিকে অক্টোবরে দেশে ফেরার তেইশটি বছর পার করে, চব্বিশ নভেম্বর, ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হল অরিজিন অফ স্পিসিস।
কিছুদিন প্রেম করার পর, ২৯ জুন ১৮৩৯ সালে ডারউইন বিয়ে করেন সম্পর্কিত বোন এমা ওয়েজ‌উডকে। সেই স্ত্রীকে ভূপর্যটনলব্ধ ধারণা শোনালে তাঁর কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তাও ডারউইনকে সন্ত্রস্ত করেছিল। একবার ভেবেছিলেন মৃত্যুর পর ওই ব‌ই বের করাবেন। হয়তো নিকোলাস কোপার্নিকাসের অরবিয়াম কোয়েলেসটিয়াম ব‌ইয়ের কথা তাঁর মাথায় ছিল। ভেবেছিলেন, মৃত্যুর পর ব‌ই বেরোলে সামাজিক অসম্মান আর নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই মিলবে। সেই আশায় বুক বেঁধে বৌকে চিঠি লিখেছিলেন, আমি মরে গেলে আমার জমানো টাকা থেকে চারশো পাউন্ড দিয়ে তুমি আমার ব‌ইটা ছাপাবার উদ‍্যোগ নিও। যাই হোক, ডারউইনের মৃত্যুর অনেক আগেই অরিজিন অফ স্পিসিস প্রকাশ পেল। লেখকের আশঙ্কাকে সত‍্য প্রমাণিত করে প্রথম দিকে গালিগালাজ ও ব‍্যঙ্গের কোনো ঘাটতি ছিল না। পরে পরে এই ব‌ইয়ের মূল‍্য লোকে বুঝল। সমাজের নানা বিষয়ে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নতি ঘটিয়ে দিয়েছে এই ব‌ই। অরিজিন অফ স্পিসিস তাঁকে গ‍্যালিলিও ও নিউটনের পাশে দাঁড়ানোর মর্যাদা দিয়েছিল।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।