Cafe কলামে – আত্মজ উপাধ্যায় (পর্ব – ২৩)

বিবাহঃ নারী পুরুষের যৌনমিলনের অনুমতি? – ১৩

আগেকার দিনে, পৌরাণিক সাহিত্যে, বহু বিবাহের শুরুটা ছিল, পুরুষের শৌর্য-বীর্যের ও সাহসের প্রদর্শন। মহিলারা বাস্তবিক পক্ষেই ধরা হত, পুরুষের অধীন ও সেবাদাসী। এছাড়া, তাদের সামাজিক ভূমিকা কিছু ছিলনা। তারা পতির সেবায় স্বর্গবাস ও পতির সন্তান দেবার অঙ্কশায়িনী বা পরিবারের সকলের সেবা দেবার স্ত্রীর ভূমিকা পালন করত। রাজা বা বিশিষ্ট জনের পরিবারের জন্মালে, বিয়ে হলে সেই পরিবারের সুখ দুখ ভাগ পেত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাজার মেয়েরা নানা রকম শাস্ত্রে, সংগিত ও কখনো যুদ্ধের মহড়াও দিতে পারত। কিন্তু সবার উপরে তাদের সকল শিক্ষা ও শিষ্টাচার শুধু পরি সেবা ও সুখের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য।  স্বয়ম্বর সভা, মহিলার পছন্দের পুরুষকে বিয়ে দেবার ব্যবস্থা হলেও, মহিলারা এক অজানা পুরুষের সাথে ঘর বাঁধতে হত। সে দুর্বল রাজা বা সবল রাজাই হোক। এবং অন্তঃপুরে তার সকল জীবন।

স্বয়ম্বর সভাও মহিলার ইচ্ছার উপর কখনো সমস্যা হত। যেমন মহাভারতে, কলিংগের রাজকণ্যা ভানুমতীর স্বয়ম্বর সভায়, ধৃতরাস্ট্রের পুত্র দুর্যোধন গিয়েছিল। ভানুমতী খুব সুন্দরী ছিলেন। তিনি বিয়ের মালা হাতে স্বয়ম্বর সভার রাজাদের দেখতে দেখতে অবজ্ঞা করে দুর্যোধনকে পাশ কাটিয়ে চলে যান। দুর্যোধন খুব অপমান বোধ করেন। তার মনে হয়েছিল, তিনি ভানুমতীর পানি পাবার যোগ্য নন। তিনি রেগে যান। তিনি এগিয়ে গিয়ে ভানুমতীর হাত চেপে ধরে বলেন, চল, হস্তিনাপুরে যাবে।

এই কান্ড দেখে বাকী রাজারা অস্ত্রশস্ত্র হাতে করে মারমূখী হয়ে উঠেন ও দুর্যোধনকে আক্রমণ করতে উদ্যত হন। দুর্যোধনের একমাত্র বিশিষ্ট বন্ধু কর্ণ, দুর্যোধনকে রক্ষা করতে নামলে ব্যাপারটা মিটমাট হয়। ভানুমতীকে হস্তীনাপুরে এনে দুর্যোধন জোর করে বিয়ে করেন। ভানুমতীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে।

একবার বিয়ে হয়ে গেলে মহিলাদের আর নিজের ইচ্ছার কোন দাম থাকতনা, ফলে স্বামীর ঘর অনিচ্ছাতেও করতে হত। ভানুমতী নীরবে স্বামীর সেবা করেছিলেন, দুর্যোধন তাকে অত্যন্ত ভালবাসতেন, তাদের একছেলে নাম লক্ষন কুমার ও এক মেয়ে হয়েছিল নাম লক্ষণা।

মহাভারতে বহু বিয়ে জোর করে হত। আর যারা জোর করে বিয়ে করতে পারত তাদের সাহসী ও শক্তিশালী মহিলারা ভাবত।

মহিলাদের নিরাপত্তা হিসাবে তেমন কিছু ছিলনা। চরিত্রগত কলঙ্কও ছিলনা। অর্থাৎ, কোন পুরুষ যদি তার কাছে সংগম চাইত, বা জোর করে সংগম করত তাতে তারা দোষী অভিযুক্ত হতনা। যেমন আমরা শ্বেতকেতুর গল্পে পাই। এছাড়াও পঞ্চ (ষষ্ঠ?) সতী ‘সীতা, অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা ও মন্দোদরী’, এনাদের জীবনে একাধিক পুরুষের সংগম হয়েছিল। ধরা হয়, নারীর মাসিক বৃত্ত হয়ে গেলে তারা পবিত্র হয়ে যান।

পরকীয়া বা ব্যভিচারের শাস্তিও ছিল, পশ্চিমীদেশ গুলিতে যেমন ছিল। দেখাযায় সারা পৃথিবীর বিবাহের নিয়মকানুন ও বিধান প্রায় এক। এবং, মহিলারা তাদের স্বামী থেকে অনেক অনেক বয়েসে ছোট। স্বামীদের নানা দোষ গুণ, অংগ প্রত্যংগের খামতি থাকলেও মহিলাদের পছন্দের অপছন্দের জায়গা ছিলনা।

দেবগুরু বৃহস্পতির ভাইপো উতথ্যের পুত্র দীর্ঘতমা, তিনি জন্মান্ধ ছিলেন, প্রদ্বেষী নামে এক রূপসী তরুণী ব্রাহ্মণীকে পত্নীরূপে লাভ করেছিলেন। যেমন ঋষি গৌতমের কাছে অহল্যা বয়ঃসন্ধিকাল অবধি থেকে বৃদ্ধ ঋষিকে বিয়ে করেন।

 বড় ভাইয়ের বৌকে ছোট ভাইয়ের বিয়ের প্রচলনও ছিল। যেমন তারা বালীর স্ত্রী, সুগ্রীব বালীকে মৃত মনে করে তারাকে বিয়ে করেন, এনিয়ে দুইভাইয়ের মধ্যে যুদ্ধ হয়। রাবন মারা গেলে মন্দোদরীকে বিভীষণ বিয়ে করেন।

মহাভারতে বহু উদাহরণ আছে, যেখানে পুরুষ সন্তান জন্মদিতে অক্ষম হলে তৃতীয় কোন ব্যক্তির দ্বারা বংশের পুত্রসন্তানের ব্যবস্থা করা।

মহিলারাও বিয়ের আগে, তার পছন্দের মানুষকে প্রলোভিত করে গর্ভ ধারণ করতে পারতেন, যেমন কুন্তী চরিত্রে আছে। এছাড়া সত্যবতী ও শকুন্তলার গল্পেও প্রাক বিবাহে যৌনমিলন পাওয়া যায়।

মহাভারতে ও মনুর নিয়ম অনুসারে আট প্রকার বিয়ে দেখা যায়, ব্রাহ্মী, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য, আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস এবং পৈশাচ। ১। ব্রাহ্ম হল, শিক্ষিত মানুষের সাথে পণ দিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করা, ২।দৈব হল পূজা ও যজ্ঞে কোন মেয়েকে উৎসর্গ করলে সেই মেয়ের সাথে ঋষিদের বিয়ে হয়। যেমন ঋষ্যশৃংগ মুনির সাথে অযোধ্যাপতি দশরথ ও তার প্রধানমহিষী কৌশল্যার প্রথম সন্তান শান্তার বিয়ে হয়েছিল। দশরথ পুত্র সন্তানের জন্য পুত্রেষ্টি/  পুত্রকামাষ্টি  যজ্ঞের পুরোহিত ছিলেন ঋষ্যশৃংগ। (দশরথ ও কৌশল্যার মেয়ে হয়ে জন্মালেও অঙ্গরাজ রোমপাদ ও তার মহিষী বর্ষিণী (যে সম্পর্কে কৌশল্যার বোন) তাকে দত্তক নেয়। ঋষি বিভাণ্ডক ও অপ্সরা উর্বশীর পুত্র ঋষ্যশৃঙ্গকে বিবাহ করে শান্তা তার পালক পিতার রাজ্যকে খরামুক্ত করেন।)

৩। ‘আর্য। শব্দটির অর্থ হল ঋষিসম্বন্ধী। মানে বরের কাছ থেকে কিছু নিয়ে কন্যা দান। সাধারণতঃ একটি গরু ও একটি বলদ বা দুইজোড়া বলদ পাত্রের কাছ থেকে পণ হিসাবে নিয়ে মেয়ে বিয়ে দিত। ৪। প্রাজাপত্য হল ধর্মানুষ্ঠান করে পাত্রকে ধনরত্ন দিয়ে খুশি করে কন্যা দান। ৫। আসুর বিবাহ  হল কন্যার অভিভাবকদের অর্থদান দিয়ে কন্যা বিয়ে করা, ৬।গান্ধর্ব-বিবাহ হল কন্যার যে পাত্রকে পছন্দ সেই পাত্রের সাথে বিয়ে দেওয়া বা পাত্র পাত্রীর মধ্যেকার কোন প্রণয়কে বিয়ে আখ্যা দেওয়া। ৭। রাক্ষস বিবাহ। কন্যাকে পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তুলে নিয়ে বিবাহ করা। কিছুটা পালিয়ে বিয়ে করার মতোই। যেমন—শ্রীকৃষ্ণ ও রুক্মিণীর বিবাহ। ৮। পৈশাচ বিবাহ – যখন চুরি করে কোনও মানুষ ঘুমন্ত, নেশা বা মানসিকভাবে অসমর্থ কোনও মেয়েকে প্ররোচিত করে, তখন তাকে পৈশাচ বিবাহ বলে। এটি মনুস্মৃতিতে একটি ভিত্তি এবং পাপ কাজ হিসাবে নিন্দা করা হয়। আধুনিক যুগে একে ডেট রেপ বলা হয় এবং বেশিরভাগ সভ্য দেশে এটি একটি অপরাধ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।