ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে কিছু লেখার কথা ভাবতেই প্রথমে মনে হলো যেন এক অন্তহীণ সমুদ্রের তীরে আমি একলা নাবিক । এ সমুদ্রের তল নেই, কূল নেই । এ থেকে মুক্তা তুলে আনার সাধ্য কি আমার আছে? এ যেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “কেমনে বর্ণিব তোমার রচনা”। তারপর মনে হলো এ সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার একমাত্র উপায় হলো সুর । “আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাই নে তোমারে।“ তাই সুরের হাত ধরে সহজ ভাষায় কিছু বলার চেষ্টা করবো, যে ভাষার সঙ্গে সবাই একাত্ম হতে পারে । জানি এ বিষয়ে অনেক পন্ডিত ব্যাক্তির অসাধারণ প্রবন্ধ ও গ্রন্থাদি আছে যেমন পন্ডিত রবিশঙ্করের ‘রাগ অনুরাগ’ অথবা কুমারপ্রসাদের ‘কুদরত রঙ্গীবিরঙ্গী’ । তবু বিভিন্ন গুণীজনের সান্নিধ্যে এসে আমি গানকে ও সুরকে যেভাবে অনুভব করেছি, সেই রূপকেই প্রকাশ করার চেষ্টা করবো এই লেখায় । ছুঁয়ে যাবো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন স্কুল বা ঘরাণার ইতিহাস ও কথাকে এবং তারই অংশ হিসাবে বিখ্যাত শিল্পীদের কথাও আসবে । কোন তথ্যগত ত্রুটি বা ভুল থাকলে গুণীজনেরা শুদ্ধ করে দেবেন।
আমার বয়স তখন বছর ছয়েক হবে । খুব হাঁপানিতে ভুগতাম সেই বয়সে । নাচে ভর্তি হয়ে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম হাঁপানির জন্য। হাঁপের টান উঠলে মনে হতো আমার ঐটুকু কাঠির মতো শরীর থেকে প্রাণবায়ু যে কোন সময় বেরিয়ে যাবে । বাবা আমাকে কোলে করে নিয়ে ঘুরতেন । প্রাণপণ পিঠে চাপড় মেরে কষ্ট কমানোর চেষ্টা করতেন । তারপর হাঁপানির ওষুধ খেয়ে একটু তন্দ্রা এলে বিছানায় উঁচু বালিশে শুইয়ে দিয়ে বাবা আলো নিভিয়ে চালিয়ে দিতেন লং প্লেয়িং রেকর্ড ! সেই তন্দ্রার মধ্যে কানের ভিতর দিয়ে যেন মরমে গিয়ে আঘাত করতো এক গম্ভীর মন্দ্র স্বর “জয় মাতে বিমল করো”। মনে হতো কোন স্বর্গ থেকে ভেসে আসছে সেই স্বর! যেমন গম্ভীর গোল আওয়াজ তেমনি শান্তি বা ঠাহরাও সেই আওয়াজে । মনে হতো আমি যেন এক অসীম সুরের গভীরে ডুবে যাচ্ছি। গানের গতি আস্তে আস্তে বাড়তো । শেষে কানে যেতো “তা ধুম তা নানা দানি তা দারে দানি” । বিদ্যুৎ গতিতে যেন ঝিলিক দিয়ে সেই গলা পৌছতো আমার প্রাণের গভীরে । যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় নেচে বেড়াচ্ছি, তালে তালে সুরে সুরে! কি গান, কে বা গায়ক তা বোঝার মতো বয়স তখন হয় নি । কোনদিন বাবা চালাতেন রেকর্ডের উলটো পিঠে “জিন কে মন রাম রাম”। মধ্যরাতের বুক চিরে ছড়িয়ে পড়তো সুরের মূর্ছনা! বাবা লক্ষ্য করলেন গান শুনতে শুনতে আমার কষ্ট লাঘব হয়ে আমি পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ি । তাই নিয়মিত রাত্রে সেই সুরসভা বসতে লাগলো আমার শোয়ার আগে ।
আমার মা খুব সুন্দর গান করতেন । তখন মাকে গান শেখাতে আসতেন এক মাস্টারমশাই । তিনি সব শুনে বললেন “শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মধ্যে আছে এক পরম শান্তি যা ঈশ্বরকে পাওয়ার মতো। যারা তা অনুভব করতে পারে তাদের জন্য এক অন্য অলৌকিক দরজা খুলে যায় । আপনি ওকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখান । দেখবেন হয়তো ওর হাঁপানিও সেরে যাবে, দম বাড়বে ।“ বাবা খুব ভয়ে ছিলেন যে হয়তো হাঁপের টান বেড়ে যেতে পারে, কিন্তু এই কথায় ভরসা পেয়ে ঠিক করলেন আমাকে নাচের বদলে গান শেখাবেন । একদিন বাবা তার রেকর্ডের বিশাল সম্ভার খুলে দিলেন আমার সামনে । যেন চিচিং ফাঁকের দরজা খুলে গেলো। বড় বড় লং প্লেয়িং রেকর্ডের কভারগুলো ছিলো খুব সুন্দর । প্রথমেই বাবা দেখালেন সেই রেকর্ড যা আমার মরমে গিয়ে আঘাত করেছিল । এক গুরুগম্ভীর ক্লিন শেভন ভদ্রলোক ধুতি পাঞ্জাবী চশমা পরে গান করছেন । জানতে পারলাম হাতের যন্ত্রটি তানপুরা । উস্তাদ আমীর খান! রেকর্ডের পিছনে সযত্নে লেখা রাগগুলির নাম, সঙ্গতকারের নাম । একপিঠে রাগ হংসধ্বনি বিলম্বিত, দ্রুত ও তারাণা, উলটো পিঠে রাগ মালকৌশ বিলম্বিত ও দ্রুত! তখন সবে ক্লাস ওয়ান । পড়ে ফেললাম লেখাগুলি, কিন্তু কিচ্ছুই বোধগম্য হলো না ।
সেই রেকর্ডের নীচ থেকে বেরলো আর একটি রেকর্ড । সেখানে এক ভদ্রলোক, তাঁর চোখদুটি লাল, ঢুলু ঢুলু, মাথায় জরি লাগানো বিশাল পাগড়ী – যেন আগের দিনের জমিদারের মতো । নিশ্চই অমনই জমকালো গান হবে । বাবাকে বললাম চালিয়ে দিতে রেকর্ডটি । চমকে উঠলাম। সরু, প্রায় মেয়েলী গলায় অতি দ্রুত গায়ন! তার সপ্তকে! অমন চেহারার সাথে একেবারেই মেলানো যায় না । আমীর খানের গান শুনে মনে হয়েছিল সবার গলায় বুঝি অমন মন্দ্র গম্ভীর হবে । আমার সেই ছেলেমানুষী কানে মোটেই ভালো লাগে নি আবদুল করিম খানের গলা ও গায়ন। বাবাকে বলাতে উনি হাঁ হাঁ করে উঠলেন! বললেন “উনি বিখ্যাত উস্তাদ! কি বলছিস তুই! ওনার গানের রস বুঝতে হবে!”
তারপর বেরলো আর একটি রেকর্ড । কভারে বিশাল মোটাসোটা চেহারার বিরাট গোঁফ বাগিয়ে বসে আছেন উস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খান! দেখে মনে হয় কোন কুস্তিগীর। শুনলাম ওনার রেকর্ড! ছোট ছোট করে গাওয়া খেয়াল গান । তাতে অসাধারণ হড়ক তান! আর শুনলাম ঠুংরী! “আয়ে না বালম, ক্যা করু সজনী” কিংবা “কাটে না বিরহ কি রাত”, “প্রেম কি মার কাটার”। আহা কি কাজ, কি দরদ!
বাবার মন খারাপ হলে কিন্তু বাবা খেয়াল বা যন্ত্রসঙ্গীত না শুনে চুপচাপ শুয়ে পড়তেন এক মহিলার গান চালিয়ে । রেকর্ডের মলাটে দেখলাম তাঁর নাম “আখতারী বাঈ” বেগম আখতার । নাকে ঝকঝক করছে হীরের নথ! আলম্বিত বেণী মাথায়! পরণে জরিদার জমকালো সালোয়ার বা শাড়ী! ডান হাতটি শোয়ানো তানপুরোর ওপর রাখা । ঈষৎ মোটা কিন্তু মিষ্টি গলা মাঝে মাঝে ভেঙে যায়, যেন ছুরির মতো প্রাণে বেঁধে। গানের মধ্যে এক অদ্ভুত মাদকতা, প্রেম, আর্তি, আকুলতা। গানগুলি হিন্দি ও উর্দু মেশানো । “উল্টি হো গঈ যব তকদিরে” “সঈয়া বোলো তনক মোসে রহিয়ো না যায়ে” । সে বয়সে কথাগুলির অর্থ এবং ভাব কিছুই বুঝতাম না । তাই খানিকক্ষণ পর অধৈর্য হয়ে বাবাকে বলতাম অন্য কিছু চালাতে । বাবা বলতেন “এই ঠুংরী আর গজলের রস যে একবার পেয়েছে তার আর কোন গান ভালো লাগবে না রে।“
কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার বুঝলাম সবই হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত হলেও তা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখা । ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরী, ঘজল ইত্যাদি । আবার খেয়াল গায়নে দেখলাম, বিভিন্ন উস্তাদ একই রাগ গাইছেন কিন্তু রাগের চলন এবং গায়ন কিন্তু প্রত্যেক উস্তাদের আলাদা! অনেক তফাত তার মধ্যে । বাবাকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম এর কারণ হল এঁরা আলাদা আলাদা ঘরাণার গায়ক!
অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম “ঘরাণা কি?”
বাবা বলেছিলেন “শাস্ত্রীয় সঙ্গীত হল গুরুমুখী বিদ্যা। অর্থাৎ বই পড়ে কিংবা শুধু শুনে এই সঙ্গীত শেখা যায় না । প্রাচীনকালে যেমন ছাত্রেরা গুরুগৃহে থেকে পড়াশোনা করতো তেমনি ভারতের বিভিন্ন কোণে গড়ে উঠেছিলো বিভিন্ন সঙ্গীতের গুরুগৃহ । প্রাচীনকালে সেই অঞ্চলের কোন পন্ডিত বা উস্তাদ শুরু করেছিলেন এই ঐতিহ্য । তাঁরা সেই অঞ্চলে গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব গায়নশৈলী । তাঁদের সন্তানদের বংশপরম্পরায় তাঁরা শেখাতেন এই গায়নশৈলী এবং সাথে সাথে উৎসাহী শিষ্যদেরও একইভাবে শেখাতেন তাঁরা । অনেক সময়েই ছাত্ররা গুরুকেও ছাড়িয়ে যেতো গায়নশৈলীতে । এই ভাবেই বিভিন্ন ঘরাণা গড়ে উঠেছিলো । শুধু কন্ঠসঙ্গীত নয়, এই অঞ্চলগুলিতে একই ভাবে গড়ে উঠেছিল শাস্ত্রীয় যন্ত্রসঙ্গীত ঘরাণাও । সেই সময়কার রাজা বাদশা এবং সম্রাটরা বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা করে বাঁচিয়ে রাখতেন এই সঙ্গীত ঘরাণাগুলিকে!”
যেন কোন রূপকথার গল্পের মতো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রহস্যের দরজা খুলে যেতে লাগলো আমার সামনে । তারপর থেকে নিয়মিত ড্রয়ার খুলে রেকর্ড ঘাঁটা, রেকর্ডের লেবেল পড়া আর গান শোনা হয়ে গেলো আমার অবসরের প্রধাণ কাজ । সঙ্গীত শিক্ষাও শুরু করে দিলাম লক্ষ্ণৌ ভাতখন্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত হয়ে। কিন্তু মাস্টারমশাই শুধু সা রে গা মা আর পালটা অভ্যাস করতে দিলেন দিনের পরে দিন! অধৈর্য হয়ে পড়লাম! কবে আমি গাইতে পারবো আমীর খান কিংবা বড়ে গুলাম আলি খানের মতো পূর্নাঙ্গ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত? মন বলছিলো কিছুই শিখতে পারছি না এই গান গেয়ে আর পরীক্ষা দিয়ে । কিন্তু বাবা বকুনি দিয়ে বললেন “আগে গলা তৈরী করা, তারপর গান! এতো অধৈর্য হলে ক্লাসিকাল গান হবে?”
আমার মন তখন চঞ্চল – দূরে মাইকে শোনা যাচ্ছে লতা, আশা, রফি, কিশোর! যেমন কথা সহজবোধ্য, তেমনি আকর্ষক সুর আর তাল! আমি এমন গান শিখছি না কেন? আবার আসেপাশে বিকেল হলেই শুনি রবীন্দ্রনাথের গান! মাসী পিসি দিদিরা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইছেন। মাও রেকর্ড চালিয়ে তুলে ফেলছে আধুনিক গান সন্ধ্যা, আরতি, মান্না, হেমন্ত অথবা রবীন্দ্রসঙ্গীতে কণিকা সুচিত্রা ইত্যাদি । কখনো বা মানবেন্দ্র, ফিরোজা বেগম, পূরবী দত্তের নজরুলগীতি । কি দারুণ লাগতো! আর আমি সেই সা রে গা মা আর পালটা নিয়ে পড়ে আছি! মায়ের কাছে অভিযোগ জানাতে মা বললেন “শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জানলে সব গান গাওয়া যায়, কিন্তু অন্য কোন গান শিখলে তা হয় না।“ অতএব পড়ে রইলাম সেই সারেগামা আর গলা সাধা নিয়ে । ক্রমে ক্রমে সত্যিই হাঁপের টান কমে এলো, গলার আওয়াজ জোরালো হলো, তাল সুর লয়ের বোধ জন্মালো! আর রাত্রে চলতে লাগলো বাবার রেকর্ড চালানো । কন্ঠসঙ্গীতের সঙ্গে শুনতে লাগলাম পন্ডিত রবিশঙ্করের সেতার, আলি আকবরের সরোদ, আমজাদ আলি খানের সরোদ, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেতার, বিলায়েত খানের সেতার, ব্রিজ ভূষণ কাবরার গীটারে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত! শেষ নেই সেই সম্পদের। কি অপূর্ব সুর মূর্ছনা!
ততদিনে আমার জন্মস্থান আসানসোল থেকে কলকাতায় বদলী হয়ে এসেছেন বাবা । আমিও অনেকটা বড় হয়েছি । দেশে তখন প্রকাশিত হচ্ছে কুমার প্রসাদের কুদরত রঙ্গী বিরঙ্গী! সেই প্রথম শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ঘরাণার চিত্রটি পরিষ্কার হতে লাগলো চোখের সামনে । বিভিন্ন ঘরাণার ইতিহাস, প্রধাণ শিল্পীরা, তাঁদের মধ্যে দান প্রতিদান এবং দ্বন্দ্ব ছিলো সেই লেখার অন্যতম উপজীব্য । অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে প্রতি সংখ্যায় পড়তাম লেখাটি ।
প্রথমেই মনে হলো আমার প্রিয় গায়ক আমীর খানের ঘরাণা সম্বন্ধে জানতে হবে । কি সেই ঘরাণার বৈশিষ্ট, যা মনে এতো শান্তি দেয় আর এতো সমৃদ্ধ যার গায়নশৈলী । পড়তে লাগলাম বিভিন্ন আকর গ্রন্থ, লাইব্রেরী থেকে সংগ্রহ করতে লাগলাম বিভিন্ন বই ।
মূলতঃ উত্তরভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ঘরাণাগুলি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। সেটি ঐ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখা অনুযায়ী । গায়নের ঘরাণাগুলি হলো খেয়াল ঘরাণা, ধ্রুপদ ঘরাণা এবং ঠুংরি ঘরাণা। এছাড়া আছে বাদনের ঘরাণাগুলি, যেমন বিভিন্ন সেতার ও তবলা ঘরাণা ও সবশেষে নৃত্য ঘরাণা ।
প্রথমে বলি খেয়াল ঘরাণাগুলির কথা। প্রধাণ খেয়াল স্কুল বা ঘরাণাগুলি হলো গোয়ালিয়র ঘরাণা, পাতিয়ালা ঘরাণা, জয়পুর আত্রাউলি ঘরাণা, আগ্রা ঘরাণা, কিরানা ঘরাণা, রামপুর সারস্বান ঘরাণা, মেওয়াটি ঘরাণা, ভেন্ডিবাজার ঘরাণা এবং ইন্দোর ঘরাণা । আসলে ঘরাণা এক একটি অঞ্চলভিত্তিক ও আঞ্চলিক বৈশিষ্টসমৃদ্ধ আলাদা আলাদা পথ, সেই একই সঙ্গীতের অরূপরতন খুঁজে পাওয়ার । যে কোন একটি পথ ধরে সাধনা করলেই হলো ।