|| সাহিত্য হৈচৈ – সরস্বতী পুজো স্পেশালে || দেবেশ মজুমদার
by
·
Published
· Updated
সরস্বতী পুজোই ছিল আমাদের ভালোবাসার দিন
ঘুড়ির মেলার পর যখন মনখারাপ করা দুপুর গুলো কেটে যেত ক্লাস রুমে। আকাশ জুড়ে উড়ে বেড়ানো রঙিন ঘুড়ি গুলো যখন ভ্যানিশ হয়ে যেত। একটু একটু করে বেলা বড়ার সাথে সাথে কমতে শুরু করত হাড় কাঁপানো শীতের প্রকোপ ঠিক তখনই আচমকা বসন্ত পঞ্চমীর চাঁদ জানান দিত স্বরসতী পুজার কথা। ছোটবেলার স্বরসতী পুজো এক মহাকাশ অনন্দ নিয়ে হাজির হত আমার কাছে। প্রস্তুতি শুরু হত বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই। স্কুলের মাস্টার মশাইদের তত্বাবধানে ঘর পরিস্কার করা হত। আগের বছরের ঝুলপড়া স্বরসতী বিসর্জন দিয়ে নিয়া আসা হত নতুন ঠাকুর। তারপর পুজোর দিন সকালে স্নান করে পড়ে ফেলতাম বাক্স থেকে বার করা নতুন জামা। তারপর গুটি গুটি পায়ে ছোড়দির সঙ্গে হাজির হয়ে যেতাম স্কুলে। পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে প্রাসাদ খেয়ে বাড়ি ফিরতাম। আজও ভুলতে পারিনি ফালি করে কাটা নারকেল কুল আর শাখাআলুর গন্ধে মাখা প্রসাদের স্বাদ।
তারপর যখন হাইস্কুলে দায়িত্ব এসে পড়ল পুজোর, প্রার্থনা কক্ষে চলত ঘণ্টায় ঘণ্টায় মিটিং। প্যান্ডেল আমরা নিজের হাতেই করতাম। কত রকমের ফর্দ আর তার হিসেব সব ফসিল হয়ে গেছে। থার্মোকল, বাঁশ, কাপড়, আর রঙ বেরঙের কাগজের সে এক আশ্চর্য কারখানা। প্যান্ডেলের কি রঙের হবে তা নিয়ে চলত আলোচনা , আলপনা করা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হত রাগারাগি। অতিরিক্ত টাকা চেয়ে মনমালিন্য হয়ে যেত স্যারের সথেও। বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে বিশেষ করে গার্লস স্কুলে গিয়ে আমন্ত্রণ জানানোর আপেক্ষা থাকত সারা বছর জুড়েই। অপেক্ষার প্রহর কেটে একে একে পৌঁছে যেতাম সেই স্কুল গুলিতে। একটু চোখাচোখি বা বিশেষ কাউকে দেখার অভিলাষে। পুজোর দোহাই দিয়ে চলত ক্লাস ফাঁকি। কেমিস্ট্রি বা ফিজিক্সের জটিল তত্বগুলি সরিয়ে দিয়ে মেতে উঠতাম পুজোর অনন্দে। নিজের মতন করে সাজানোর আর্জিগুলো নিয়ে কথা বলতে পারতাম ক্লাসে সবথেকে ভয় পাওয়া স্যারের সঙ্গেও। এই সময়টায় স্কুলের দেওয়াল পড়ত নতুন রঙের প্রলেপ। বাগানের গাছগুলোকে ছেঁটে ঘাসগুলোকে চেঁচে তুলে দেওয়া হত উৎসবের আবেশে। নতুন করে সেজে উঠত স্কুল চত্বর। ওয়াল ম্যাগাজিন ভরে উঠত সরস্বতী পুজো নিয়ে লেখা নতুন কবিতা ও গল্পেতে। আলমারিতে সযত্নে গোছানো শাড়ি আর পাঞ্জাবীগুলো বেড়িয়ে আসত ওই একদিনের জন্য। ছোট ছোট প্রাইমারি স্কুলের মেয়েরা মায়ের পড়ানো বড় শাড়িটা কোনরকমে গায়ে জড়িয়ে খুব সাবধানে পথ চলত। পশ্চিমের ভ্যালেন্টাইন ডে সোশ্যাল মিডিয়ার হাতে ধরে এদেশে পৌঁছানোর আগে সরস্বতী পুজোই ছিল আমাদের ভালোবাসার দিন। আজও প্রেমের উদযাপনের সাক্ষী হতে পুজোর দিনে শহরে সেজে উঠে রকমারি শাড়ি, শালোয়ার, আর পাজামা পাঞ্জাবিতে। স্কুল কলেজের পাশাপাশি ভিড় জমে শহরের পার্কগুলিতেও। হাউসফুল থাকে সংস্কৃতি লোকমঞ্চ, আইনক্স ও সংস্কৃতি মেট্রোও। এই একটা দিন একান্তে গল্প করার সুযোগ হাতছাড়া করে নে কেউই। আদিকাল থেকেই আবহমান স্রোত বয়ে চলেছে এই শহরে। ‘মিউনিসিপ্যাল গার্লস স্কুল’, ভারতী বালিকা বিদ্যালয়, ‘রানীস্কুল’, ‘বর্ধমান বিদ্যার্থী গার্লস স্কুল’, বা ‘হরিসভা হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়’-র মতন গার্লস স্কুলগুলোর সামনে সাইকেল, মোটর সাইকেলে ভিড়ে আটকে পরে জনতা। আর বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল বয়েজ’, ‘সি এম এস’ ‘রামকৃষ্ণ’ রাজস্কুল’ বা ‘টাউন স্কুল ’-র গেটের বাইরে তখন ঢাকাই জামদানি বা ওপাড়া সিল্কের আঁচল ওড়ে ফাগুনের অকাল আগমনে। উইমেন্স কলেজটা কো -এড হয়ে যাওয়ার অনুমতি পায় এই একটা দিনের জন্য। গোলাপবাগের বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সংস্কৃত বিভাগ ছাড়া অন্য বিভাগগুলিতে পুজো না হলেও বিভিন্ন হস্টেল গুলো আপাদমস্তক সেজে ওঠে গোলাপ, ডালিয়া আর নানা রঙের সিজন ফ্লাওয়ারে। থিম পুজোর আদলে সেজে উঠা হলঘরগুলোতে বিভিন্ন রূপে বিরাজ করেন দেবী। সকাল সকাল পুজো হওয়ার পর হয় আরতি। পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্রের উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে মুঠো মুঠো ফুল-বেলপাতা এসে পড়ে মঙ্গলঘটের উপরে। তেমনি আরালে অলক্ষ্যে অনেক ফুল বর্ষিত হয় অনেক প্রিয়জনের উপরেও। অনেকের কাছে একসঙ্গে থাকার এক যৌথ কামনা নিয়ে। আবার অনেকের কাছে সত্যি না হতে পারা একতরফা প্রেমের জমে থাকা শূন্যতা নিয়ে। হস্টেলগুলোতে এক চমৎকার প্রথা রয়েছে পুজোর পরেরদিন। গার্লস হস্টেল থেকে তত্ত্ব নিয়ে যাওয়া হয় বয়েজ হস্টেলে। পুজোর রাত থেকেই শুরু হয়ে যায় তত্ত্ব সাজানোর পালা। বিয়েবাড়ির মত সাজানো হয় সে তত্ত্ব। তত্ত্বে দেওয়া হয় প্রসাদ , ফুল, থাকে বইও। পুজোর পরের দিন সে তত্ত্ব নিয়ে বাজনাসহ শোভাযাত্রা যায় বিভিন্ন হস্টেলে। হস্টেলের মুখে তাদেরকে অভ্যর্থনা করা হয় ফুল ছুড়ে। তত্ত্ব আসে রাজ কলেজ , আর্ট কলেজ , ডেন্টাল এবং মেডিকেল কলেজ থেকেও। তত্ত্বপর্ব মিটতে মিটতে সন্ধে গড়িয়ে যায়। দ্বিতীয় দিনে সমস্ত হস্টেল মিলে তারাবাগের ‘সৃষ্টি ’ মঞ্চে ছাত্র সংসদ আয়োজন করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। যে ছাত্রটির খুব ভালো নাচতে পারে কিন্তু সময় তাকে সেই সুযোগ করে দেয়নি , সেই সুযোগই তাকে এনে দেয় ওই সৃষ্টির মঞ্চ, হলেই একটা সন্ধ্যের জন্য। অনেক কবি ,লেখক , হারিয়ে যাওয়া গায়ক, স্বপ্ন আর জমে থাকা অভিমান সবাই মুক্তি পায় ওই বসন্ত পঞ্চমীর সন্ধ্যায়। এ ভাবেই জীবন চলে। গোলাপবাগের আর্কাইভে থেকে যায় পাস আউট হয়ে যাওয়া প্রত্যেকটা ব্যাচের সরস্বতী পুজোর সন্ধ্যা। ২ বছর পর ওই ছাত্ররা চলে যায় তাদের সযত্নে লালিত স্বপ্নগুলোকে সত্যি করার জন্য। তাদের স্মৃতিতে থেকে যায় হস্টেলে কাটানো বসন্তপঞ্চমীর সন্ধ্যার টুকরো টুকরো মন্তাজ। রাত বাড়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়। মাঘমাসের শুক্লা পঞ্চমীর চাঁদ ম্লান হয় আবার একবছরের অপেক্ষাকে দাঁড় করিয়ে।