সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মৌসুমী নন্দী (যাপন চিত্র – ১৩)

যাপনচিত্র

নিয়মের বেড়াজালের বাইরে

মানুষের জীবনটা যদি পাখির মত হত তাহলে হয়তো মানুষে আজকে এর মন থেকে অন্য মনে চরে বেড়ানোর ইচ্ছা হতো না ৷ হয়তোবা এত মন ভাঙাগড়ার খেলা চলত না ৷ নিদেনপক্ষে যদি নদীর মতো হত তাহলেও হয়তো পলিমাটির মতো বুকের ভিতরেও একে অন্যের জন্য ভালোবাসার পরত জ্ন্মাতো ৷ আজো আমরা নিয়ম ভাঙতে পারিনি ৷ আমরা সবসময় অন্যকে কা‌ঁদতে দেখতে অভ্যস্ত ৷ আঙুল তুলতে অভস্ত ৷ যা তোমার উপরে চাপিয়ে দেওয়া হবে তা যদি তুমি এককোণে পড়ে থেকে নির্বিকার ভাবে মেনে নিতে পারো তাহলে তুমি রেহাই পেতে পারো৷ কিন্তু স্রোতের বিপরীতে গিয়ে যদি তুমি প্রতিবাদ করো তাহলে সমাজে ঝড় হয়তো তুলবে কিন্তু সমাজ তোমার এই বেয়াদপী সহজে মেনে নেবে না ৷ পুরুষ হলে তা কখনোবা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসে কিন্তু মহিলা হলে তাকে বদনামের দাগী হতে হয় ৷ চরিত্রের উপর দাগ আসে ,সবার প্রথমে নির্দ্বিধায় মহিলার শুচিতার উপরে কথা ওঠে ৷ বারে বারে মহিলাটাকেই কাঠগোড়ায় দাঁড় করানো হয় তার প্রতিবাদ করার ফল স্বরূপ৷ কারণ মহিলাদের মুখে উপর সত্য কথা বলা বারণ ৷ আজকের দিনেও এই ডিজিটাল যুগে কোনো মহিলার উপরে অত্যাচার হলে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই বাড়ী থেকে সমাজ সবাই মেয়েটিকে বোঝাতে বসবে মেয়েটির চুপ করে থাকাই শ্রেয় ৷ ছোটো থেকেই বাড়ীর মেয়েটিকে শেখানো হয় মেয়েদের জোরে হাসতে নেই , বেশী লাফাতে নেই , পুরো শরীর ঢেকে কাপড় পরতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি ৷ সব কিছু বিধি নিষেধ শুধু মাত্রই মেয়েদের জন্য ৷ কোনো মা তার ছেলে যদি ছোটো থেকেই শেখান মেয়েরা কোনো খেলার বস্তু নয় ,মেয়েদের সবসময় সম্মান দিতে হয় ৷ তাদেরও অধিকার আছে নিজের মতো করে বাঁচবার পোষাক পরার তাহলে হয়তো এত শ্লীলতাহানি বা রোজ মেয়েদের অপদস্থ হতে হতো না ৷
প্রথার বাইরে কিছু ঘটলেই সমাজ একেবারে রে রে আওয়াজ তোলে ৷ মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে দেখলে বা আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে দেখলে সেটা বেয়াদপী বলে মনে ৷
বেশ নিরাপদেই তুমি ঘর সংসার করতে।তোমাকে শিক্ষা দেওয়া হত পুরুষের,দাম্ভিকতা বাড়ানোর জন্য,যার স্ত্রী যত শিক্ষিতা,সে তত দাম্ভিক।তুমি ঘর সামলাবে আর সে বাইরেরটা।এটাই তো হয়ে আসছে।তুমি হঠাৎ পালটে যাচ্ছো কেন? নিজের প্রয়োজনে শিক্ষিত হতে কে বলেছে তোমায়? কোন সাহসে তুমি নিজে চাকরি করে বেকার স্বামীকে প্রতিপালন করছো?কেন সমাজের সব জায়গায় নিজেদের মেলে ধরেছো?
ওরা কেউ মেনে নিতে পারছেনা,তোমার ব্যতিক্রমী চরিত্রকে।তোমার স্বাধীন চিন্তাকে।ওরা ভয় পাচ্ছে।এরকম চলতে থাকলে সমাজ টা পাল্টে যাবে।কর্তৃত্ব বন্টিত হয়ে যাবে। কিন্তু তুমি তো আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছো।আমার ভয় ওরা আর বেশিদিন তোমাকে আঁটকাতে পারবেনা। শুধু মহিলাদের জন্য নয় ৷পুরুষেদের শেখানো হয় পুরুষ মানে শত দুঃখেও তুমি কাঁদতে পারবে না ৷ বেকার হলে পুরুষের কোনো বিষয়ে কথা বলার সুযোগ্য হয় না ৷মনখারাপ হলেও তা প্রকাশ করা বারণ ৷ পুরুষাকারের অপমান ৷ সমাজ শুধু দেখবে আর সমালোচিত করবে ৷
বারবার তুমি ব্যতিক্রমী দের কথা তুলোনাতো। তোমাকে পড়তে হবে।চাকরি করতে হবে। সংসার টানতে হবে।সব দায় তোমার একার।বোকার মতো নিজের জীবন কে নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করছো কেন? দাও দাও। গলা টিপে দাও। এ সভ্যতা বেকার ছেলের বিয়ে দেখতে অভ্যস্ত নয় এখনও। তুমি ভাত কাপড়ের কথা ভাবো।ছেলেমানুষি করছো কেন? তুমি নিজের স্বপ্ন সত্যি করে দিলে ওদের তোমাকেও ব্যতিক্রম বানাতে হবে। তাই পুরুষ কাঁদলে, চুপচাপ লুকিয়ে যেন কেউ দেখতে না পায় টের না পায় ।তোমার কষ্ট হতে নেই।আর হলেও দেখাতে নেই।
আরে,কেন ভালোবাসছো? পাগল হয়ে গেলে নাকি? তুমি জানোনা,সমাজ কি ভাবে?তুমি “সব পুরুষ ই সমান”, এর তালিকায়। হঠাৎ করে তুমি সযত্নে তোমার ভালোবাসাকে আগলে রাখলে ওরা মেনে নেবে কি করে? ওরা তো তোমাকে ধর্ষক ভেবেই অভ্যস্ত।তুমি প্রেমিক হতে শিখলে কোথা থেকে?
কিছু কাজ তোমাদের করতে নেই।যেমন চাকুরিজীবি স্ত্রীর জন্য রান্না করে রাখা। ঘরের কাজ সামলানো তার অবর্তমানে। এসব তাদের কাজ, তুমি করতে যাবে কেন? খবরদার, কোনোদিন ভালোবেসে স্ত্রীর পায়ে হাত দিয়েছো,তার সেবা করেছো। এরকম করে, তুমি তাদের মানুষ ভেবে ফেলছো। তাদের ভৃত্য ভাবাই চল।তাদের সেবা নেওয়াই চল।তুমি পাল্টাতে গেলে কেন?
কিছু কিছু নিয়ম যা চলে আসছে,তাদের ভাঙতে গেলেই সমাজ মেনে নিতে পারবেনা। সমাজ ভাঙতে ভয় পায়।সমাজ গোঁড়ামিগুলোকে আঁকড়েই তো বেঁচে আছে। পরিবর্তন আমরা সহজে মানতে পারি না ৷ যদি আমরা সবাই আমাদের মনের জানালা খুলে দিয়ে একটু উদার হতে পারি তাহলে হয়তো পৃথিবীতে পাল্টে যাবে ৷ সহজ হবে সম্পর্কের সমীকরণগুলো ৷ আজ এই পর্যন্তই ৷ অনেক অনেক শুভেচ্ছা শুভকামনা রইল সকলের জন্য ৷
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।