গল্পেরা জোনাকি -তে ঋতশ্রী মান্না

শৌর্যদার প্রেমিকা

–“আরে,মহুল না!” ইতিউতি লোকের ভিড়,ছোটখাটো জটলা।সেসবের মাঝখানে এক মহিলা দাঁড়িয়ে পড়ে অবাকচোখে দেখছেন আমাকে।

–“রিনিদি!” আমারও অবাক হবার পালা।

–“কেমন আছিস? কতদিন পর তোকে দেখলাম। কবে এসেছিস? এটা কে,তোর মেয়ে? ভারি মিষ্টি তো!” একটানা এতগুলো কথা বলে ফেলে হাঁপাচ্ছিল রিনিদি।

ক্রীসমাসের ছুটিতে বাড়ী এসেছি। বিকেলের দিকে একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম মেয়েকে নিয়ে। এদিকে একটা ছোট্ট চার্চ আছে। সেই কবে রিনিদির বিয়ের সময় এসেছিলাম। মেয়েকে দেখাতে ইচ্ছে করছিল চার্চটা,তাছাড়া বড়দিনে বেশ সেজে ওঠে চার্চচত্বর। তবে রিনিদির সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাবে ভাবিনি।

রিনিদিকে দেখে কত পুরোনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল…

…দুধের সর দিয়ে কাঁচা হলুদবাটা মেখে আনাজ কুটত রিনিদি। রোদে জামাকাপড় মিলতে বেরোলে মুখে ওড়না জড়িয়ে নিত। ছাদে শীতের হলুদরোদে পিঠ দিয়ে বসে বড়ি দিত জেঠিমা মানে রিনিদির মা।

রিনিদিদের সাদামাটা বাড়ীর সামনে একটা ক্রশচিহ্নের ডিজাইন ছিল,প্রতিবছর ডিসেম্বর পড়লেই বাড়ী রং করাত জেঠু। সবার শেষে রং হত ক্রশচিহ্নটায়।আমাদের ভারি উৎসাহ ছিল ক্রশচিহ্নে কি রং পড়বে সেই নিয়ে। রংমিস্ত্রিদের বাঁশ বাঁধা শুরু হতেইআমরা নিজেরা কল্পনায় ভেবে নিতাম ক্রশচিহ্নের রং। এক একজন একেকরকম রং বলত। শেষপর্যন্ত কার বলা রংয়ের সাথে ক্রশচিহ্নের রং মিলে যাবে,সে উত্তেজনায় টানটান হয়ে থাকত আমাদের ডিসেম্বরের ক’দিন।

প্রতিবছর ডিসেম্বরে পিকনিক করতাম আমরা,রিনিদি আর আমরা সকলে–রিনিদিদের বাড়ীর বাগানে।রিনিদিই রান্না করত।আমরা কেউ রান্না করতে পারতামনা। শতরঞ্চি পেতে দিত রিনিদি,আমরা বসে বসে,ঝুড়ির গায়ে ঘষে ঘষে নতুন আলুর খোসা তুলতাম,ধারালো গ্লাসে করে বাঁধাকপি কুচিকুচি করতাম মহা উৎসাহে।

বড়দিনে পাড়ার সব ছোটদের নিজের হাতে বানানো কেক খাওয়াত জেঠিমা,আর ফুলের মত দেখতে কুকিজ। কেকের থেকেও সেটা বেশি প্রিয় ছিল আমাদের।
রিনিদি একঢাল চুল বাঁধতে বাঁধতে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াত। বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আনমনে বিনুনি বুনে যেত,সেদিন রিনিদি আর রংচটা চুড়িদারগুলো পরতনা। কালো জর্জেটের শাড়িতে সোনালী ফুল,চোখে হালকা কাজল,কপালে কালো টিপ–সেদিন রিনিদিকে অন্যদিনের থেকে অনেক বেশি সুন্দর লাগত।

সন্ধের অন্ধকার নামলে জেঠু উঠে একটা সুইচ অন করত আর ঘরের এককোণে একটা বড় গাছ রঙিন স্টার আর টুনিবাল্বের আলোয় ঝলমল করে উঠত–আমরা ততদিনে শিখে গেছি ওটাকে ‘ক্রিসমাস ট্রী’ বলে।
বাইরে থেকে সাইকেলের বেলের আওয়াজ ভেসে আসত। দরজায় দাঁড়ানো রিনিদির চোখেও তখন আলো। লম্বা,ফর্সা,গালে হাল্কা দাড়ি আর সোনালী ফ্রেমের চশমার এক যুবক ঘরে ঢুকে আসত। তার হাতে একটা বড় প্যাকেট থাকত রঙিন কাগজে মোড়া,রিনিদির জন্য।
জেঠু জিজ্ঞেস করত,”বাড়ীর সবাই ভালো আছে শৌর্য?”
জেঠিমা কেক,কুকিজ আর মিষ্টি আনত চীনামাটির সুদৃশ্য প্লেটে।

আমাদের ভারি কৌতূহল ছিল ঐ রঙিন প্যাকেটকে ঘিরে। কিন্তু রিনিদি আমাদের সামনে মোড়ক খুলতনা কোনোবারই।
ওরা দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকত অনেকক্ষণ। রিনিদির ঠোঁটের কোনে একটা অদ্ভুত হাসি ভেসে উঠত,লজ্জামেশা। ওরা গল্প করত মৃদুস্বরে,কখনও কোনো কথায় হেসে উঠত জোরে জোরে। আমরা কেমন করে যেন বুঝে যেতাম,এখানে আমাদের আর বেশীক্ষন থাকতে নেই।

বাড়ী ফেরার রাস্তায় আমরা রিনিদি আর শৌর্যদাকে নিয়ে গল্প করতাম। সেসময়ের ছোট মফস্বল শহরে এমন যাতায়াত দেখা যেতনা সচরাচর।
মিতুল বলত, “শৌর্যদার সাথে রিনিদির বিয়ে হবে। আমার মা-কে জেঠিমা বলছিল সেদিন,আমি শুনেছি।”

কুহু বলত,”বিয়ে হয়ে গেলে তো রিনিদিকে শৌর্যদার বাড়ী চলে যেতে হবে। আমাদের তো আর পিকনিক করা হবেনা তাহলে। আমরা তো রান্না করতে পারবনা।”
চিন্তান্বিত হয়ে পড়তাম সবাই।

কিন্তু আমাদের সব চিন্তা ভুল প্রমাণ করে পরেরবছর আবার পিকনিক হত। রিনিদি আবার রান্না করত।
তারপর আস্তে আস্তে আমরাও অল্প অল্প রাঁধতে শিখে গেলাম।

সেবার বড়দিনের আগে ক্রশচিহ্নে নতুন রং পড়লনা। বড়দিনে রিনিদিও সাজলনা,ঘরে পরার রংচটা চুড়িদারটা পরেই কাজ করে যেতে লাগল। জেঠিমা ফুলের মত দেখতে কুকিজগুলো বানালনা। আমরা শুধু কেক খেলাম। শৌর্যদা এলনা সেবার।

মোটের ওপর সবকিছুই একইরকম চলতে লাগল,শুধু রিনিদিকে হলুদবাটা মাখতে দেখলামনা আর কখনও। ঠা-ঠা রোদে জামাকাপড় মিলতে আসলেও আর মুখ ঢেকে রাখতনা কোনোদিন।

মহিলামহলের সান্ধ্য আলোচনায় মাঝে মাঝে রিনিদির কথা উঠত। শিপ্রাকাকীমা বলতেন”,ভাবলেই কেমন লাগে না,রিনির মত একটা ভালো মেয়েকে এভাবে…”
রুমাবৌদি বলত,”আমি তো রিনিকে বললাম সেদিন,এবার বিয়ের কথা ভাবো। বাবা মা কি আর মাথার ওপর থাকবে চিরটাকাল”…
কৃষ্ণাজেঠিমা বলত,”দুনিয়াটা অসৎলোকে ছেয়ে গেছে আজকাল,বুঝলেন তো।”

তারপর অনেকদিন রংহীন পড়ে থাকার পর বছরের মাঝে হঠাৎ ক্রশচিহ্নে রং পড়ল, শুনলাম,রিনিদির বিয়ে। সেবছর বাড়ীর রং হল ধূসর। আর,সেই ধূসর প্রেক্ষাপট জু্ড়ে যেন এক গোপন রক্তক্ষরণের সাক্ষী হয়ে জেগে রইল একটা রক্তরং লাল ক্রশচিহ্ন।
রিনিদির বিয়ে হয়ে গেল অনেক দূরের শহরের এক পোলট্রি ব্যবসায়ীর সাথে। রিনিদি একটা দুধসাদা গাউন পরেছিল বিয়ের দিন।
খুব সাজল রিনিদি। তবু, রিনিদিকে কালো জর্জেটে যত উজ্জ্বল লাগত,সাদায় তত লাগছেনা–এ আমাদের কারুরই চোখ এড়ালনা।

রিনিদি কালেভদ্রে কখনও সখনও আসত,একাই।রিনিদির বরকে আসতে দেখিনি কোনোদিন।

অনেক রোগা হয়ে গেছে রিনিদি। চোখের তলায় কালি।
আমার মেয়ে চার্চের ভেতরটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। যীশুর বিশাল অবয়বের সামনে অসংখ্য মোমবাতি জ্বলছে,কী অপার্থিব আলোয় ভরে আছে চারিদিক।

–“কেমন আছ রিনিদি?”
আমার প্রশ্নের উত্তরে রিনিদি হাসে।তারপর স্বগতোক্তির মত ফিসফিস করে, “দিনগুলো বড্ড বড় হয়ে গেছে… অপেক্ষা নেই তো।”
তারপর আবারও হাসে। বলে,”আমাদের পোলট্রি ফার্ম থেকে অনেকদূরে দূরে মুরগি সাপ্লাই যায় জানিস।সবরকম,বয়লার,রোডাইল।”
জানতে চাইনি,তবু রিনিদি জানাল।এদিকে মুরগির দর কত,জানতে চাইল। তারপর,পোলট্রি ব্যবসায় কত লাভ আজকাল,সেসব শুনতে শুনতে আমরা পেরিয়ে গেলাম চার্চচত্বর,চার্চের পেছনদিকে গ্রেভইয়ার্ড…

-“আমাদের বাড়ি আসিসনা একদিন।”
আমরা বাড়ির কাছে পোঁছে গেছিলাম হাঁটতে হাঁটতে।
আমিও হাসি,”আসব একদিন।”
তারপর,এক সফল পোলট্রি ব্যবসায়ীর বউ নিপুণ হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে রেখে,আমায় বিদায় জানিয়ে ঢুকে যায় ক্রশচিহ্ন আঁকা ধূসর বাড়িটাতে।

শীতের হিমকুয়াশার মত আবছায়া বিষাদ মেখে নেমে আসছিল সন্ধে … আসলে,প্রতিটি ডিসেম্বরই নীরবে হয়ত বিষাদের ক্রুশে বিদ্ধ হয়…রক্ত ঝরতে থাকে হিমের মতন…

এক পোলট্রি ব্যবসায়ীর বউয়ের বুকেও কি গোপন ক্রুশের ব্যথার মত কোথাও নিভৃতে জেগে থাকে ‘শৌর্যদার প্রেমিকা’?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।