সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (ইতিহাস কথা পর্ব – ১১)
by
·
Published
· Updated
শ্রীরামপুরের কথা
মিশন প্রেসঘরে আগুন লেগে সমস্ত অক্ষর পুড়ে খাক। এদিকে সব শুনে কলকাতায় মাথায় হাত কেরীসাহেবের। সারা কলকাতা ঘুরেও অক্ষরের ছাঁচ না পেয়ে রীতিমতো মুখ থুবড়ে পড়লো প্রেস। অসংখ্য বই আর পাণ্ডুলিপি পুড়ে নিঃস্ব অবস্থা একেবারে। অথচ এককথায় হাল ছেড়ে দেবার পাত্রও নন মিশনারীর সাদা চামড়ার সাহেবরা। খোদ শ্রীরামপুরেই একটা অক্ষর নির্মাণের কারখানা খোলাবার চিন্তাভাবনা করলেন তাঁরা। মিশন প্রেস প্রতিষ্ঠার সময় অক্ষর নির্মাণে কেরীসাহেব সঙ্গে পেয়েছিলেন ইংরেজ কোম্পানির মুদ্রণ বিভাগের কর্মচারী বৈদ্যবাটীর শ্রী পঞ্চানন কর্মকারকে। প্রথমে ছাপার জন্য বাংলা অক্ষর তৈরি করতে মোক্ষম ছোটাছুটি করতে হয়েছিল মিশনারীদের। বিলেত থেকে ছাপার অক্ষর ও ছেনি তৈরি করে এনে বই ছাপাতে খরচ বিস্তর। ঠিক সেই সময়েই দেখা হয় পঞ্চানন কর্মকারের সাথে। সৌজন্যে কোলব্রুক সাহেব। প্রেসের জন্য অক্ষর তৈরির বায়না গেছিল পঞ্চাননের কাছেই। হরফ পিছু এক টাকা চার আনা দরে অক্ষর নির্মাণ করে কেরীসাহেবের হাতে তুলে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার কিছুদিন পরেই (১৮০৩/০৪ সালে) শ্রীরামপুরে দেহ রেখেছিলেন পঞ্চানন। তাই অগ্নিদগ্ধ প্রেসের আবার জীবনদান করতে যে সহযোগিতার প্রয়োজন, কিভাবে তা সম্ভব এই নিয়েই আকাশ পাতাল ভেবে চললেন কেরী, মার্শম্যান সাহেবরা। উপায়ও এসে গেল আকস্মিক। বৈদ্যবাটী থেকে আনা হল পঞ্চানন কর্মকারেরই শিষ্য মনোহর কর্মকারকে। অক্ষর নির্মাণে তিনিও পারদর্শী। গুরু পঞ্চাননের হাত ধরেই কাজ শিখেছেন। তাঁর কয়েকজন বিশ্বস্ত সহকারী নিয়ে শ্রীরামপুরে থেকেই তিনি শুরু করলেন অক্ষর তৈরির কাজ। তত্ত্বাবধানে রইলেন উইলিয়াম ওয়ার্ড সাহেব। এবার আর নির্দিষ্ট কিছু হরফ নয়। একেবারে অক্ষর তৈরির কারখানা খোলবার বন্দোবস্ত করে ফেললেন মিশনারী সাহেবরা। এরপর আবার নতুন ভাবে একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াতে আরম্ভ করল শ্রীরামপুর মিশন প্রেস। ছাপা হল নতুন বই। শুধুমাত্র বাংলাই নয়। বিভিন্ন ভাষায় বাইবেল ছাপানোর জন্য প্রস্তুত হল গুজরাটি, কর্নাটী, তেলেগু, মারাঠা অক্ষরের ছাঁচও।
এর পরপরই রেভারেন্ড কেরীর ইচ্ছেয় রেভারেন্ড মার্শম্যান সাহেব গেলেন ডেনমার্ক। উদ্দেশ্য ডেনমার্করাজের কাছে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য পৃষ্ঠপোষকতা দাবী করা। ডেনমার্ক পৌঁছে কোপেনহেগেনে রাজার দরবারে দেখা করলেন তিনি। শ্রীরামপুরে গঙ্গাতীরে একটি কলেজ নির্মাণের নক্সা ও অনুষ্ঠানপত্র সঙ্গে ছিল তাঁর। রাজাকে সমস্ত কাগজপত্র দেখিয়ে অনুমতি চাইলেন কলেজের জন্য। সব দেখেশুনে রাজাও অনুমতি দিলেন। রাজি হলেন পৃষ্ঠপোষকতার জন্যও। সেইদিনই সুদূর কোপেনহেগেনে বাঙালীর চোখের আড়ালে নির্মাণ হয়ে গেল পরবর্তীতে বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পীঠস্থান শ্রীরামপুর কলেজের ভিত। যদিও কলেজ ভবন তখনই নির্মাণ করা সম্ভব হল না। তাই সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী হতে হতে আরও বছর পাঁচেক পরে আমরা কলেজ প্রতিষ্ঠার সোনালী দিনটায় (১৮১৮ সাল) হাজির থাকব।
এরমধ্যেই ঘটে গেল আর এক অঘটন। ১৮১৩ সালে হঠাৎ পরলোক গমন করলেন কেরী সাহেবের মুন্সী রামরাম বসু। শ্রীরামপুর মিশন ও বাঙালীদের মধ্যে খ্রীষ্টধর্ম প্রচারে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। প্রেসেও পড়ে থাকতেন রাতদিন। কর্মযোগী মানুষ। স্বভাবতই তাঁর মৃত্যু খ্রীষ্টান বাঙালী সমাজে এনে দিন এক মহাশূন্যতা।
উইলিয়াম কেরীসাহেব ছিলেন উদ্ভিদপ্রেমিক। কলকাতার অন্যপারে হাওড়ায় কোম্পানির বাগানের (বর্তমানে শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন) সুপারিন্টেন্ডেন্ট রক্সবরো সাহেবের মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ বাগানটির দায়িত্ব আসে তাঁর হাতে। গাছপালা নিয়ে তাঁর ছিল সীমাহীন আগ্রহ। বাগানের বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদজগতের সমস্ত প্রকার গাছের একটি তালিকা তিনি ছেপে প্রথম প্রকাশ করেন প্রায় একক উদ্যোগেই। গঙ্গাতীরে কোম্পানির এই উদ্ভিদ বাগানের তখন খুব নামডাক। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মূল্যবান সব গাছ এনে বসিয়েছিলেন প্রথমে বিখ্যাত রবার্ট কিড সাহেব এবং পরে বিখ্যাত উদ্ভিদ বিজ্ঞানী রক্সবরো সাহেব। কোম্পানির সেনাবাহিনীতে মেজর পদ নিয়ে এদেশে এসেছিলেন কিড সাহেব। প্রথম জীবনে সেনাবাহিনী সূত্রে আসাম, ভূটান ঘুরলেও পরে হন জাহাজঘাটার সেক্রেটারি। আজকের ‘খিদিরপুর’ আসলে তাঁর নাম থেকেই (কিডের পুর)। নিজের উদ্ভিদপ্রেমী মনটার প্রশ্রয়ে তিনিই জমি খুঁজে তৈরি করে দিয়েছিলেন ‘অনারেবল ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানিস বোটানিক গার্ডেন, ক্যালকাটা’। লোকমুখে ‘কোম্পানির বাগান’। আর সময়ের চাকায় গড়িয়ে সারা দুনিয়ার গাছসমৃদ্ধ এই বাগান এসে পড়ে আর এক উদ্ভিদপ্রেমী কেরী সাহেবের হাতে। সমস্ত গাছের স্বার্থে অগাধ পরিশ্রম করে তিনিও সাজিয়ে তুললেন বাগানকে। একা প্রায় ৩২০০ প্রজাতির উদ্ভিদ সংগ্রহ করে রোপণ করা তাঁর মতো কিংবদন্তি উদ্ভিদপ্রেমিকের দ্বারাই সম্ভব।
শ্রীরামপুরে রমরম করে চলল প্রেস। ছাপা হল বহু ভাষার বই। সুতরাং সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে সংবাদপত্র ও পত্রিকা ছাপার কথাও চিন্তা করলেন কেরী সাহেব। যে পত্রিকা সাধারণ বাঙালীর ঘরে বাংলা ভাষায় তুলে ধরবে সামাজিক ছবি। গদ্যের সহজ আকারে পরিবেশন করবে খবর। ১৮১৮ সালের ২৩শে মার্চ প্রথম শ্রীরামপুর থেকে কেরী সাহেবের সম্পাদনায় প্রকাশিত হল সাপ্তাহিকীপত্র ‘সমাচার দর্পণ’। এরপরই প্রকাশিত হল আরও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সংবাদপত্র। মার্শম্যান সাহেবের হাত ধরে ছাপা হয় ‘ফ্রেন্ডস অফ ইণ্ডিয়া’ নামক ইংরাজি পত্রিকা। প্রকাশিত হয় দিগদর্শন, পেনী, সাটার ডে ম্যাগাজিনের মতো বিখ্যাত সব সংবাদপত্র। এরপর কেরী সাহেবের হাত ধরেই হিন্দী, তেলেগু ও সংস্কৃত ভাষায় প্রকাশ হয় একাধিক পত্রিকা। এরপরই ১৮১৯ সালে বাবুরাম নামে এক ব্যক্তি ইংরেজ মুদ্রণবিভাগের প্রধান কোলব্রুকের সাহায্যে কলকাতায় প্রথম মুদ্রণযন্ত্র বসান। তারপরই কলকাতার বুকেও ছড়িয়ে পড়ে ছাপাখানা তৈরির উদ্যোগ। বিভিন্ন জায়গায় ডাক পড়ে উইলিয়াম কেরী সাহেবের। তিনিও যত্ন করে, হাতে ধরে শেখাতে থাকেন এতবড় একখানা উদ্যোগের পিছনে লুকিয়ে থাকা সমস্ত চাবিকাঠি। শ্রীরামপুরের হাত ধরেই বই ছাপার বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠে বাঙালী।