★ ১৫৩৩ সাল:
বাংলা থেকে মহানামাচার্য বৃদ্ধ অদ্বৈত ঠাকুর পুরীধামে অক্ষয়তৃতীয়ার আগে একটি পত্র পাঠালেন মহাপ্রভুকে। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ভারতীকে। তখন তিনি গম্ভীরায় বাস করছেন। দিব্য ভাবোন্মাদ দশা। কাউকেই চিনতে পারছেন না। মুখে নাম আর চোখে জল— এই তখন সম্বল। গম্ভীরায় ভক্তরা অনেক কষ্টে ধরে রেখেছেন তাকে। ওই সময়েই এই পত্র আসে অদ্বৈতাচার্যের কাছ থেকে। কেবল চারটি লাইন। মহাপ্রভুকে শোনানো হলো। মুহূর্তে কেটে গেল ভাবোন্মাদ অবস্থা। তার স্থির নয়নে আজ আবার বিজলি খেলে গেলো, ঠোঁটের কোনে হালকা হাসি। পরক্ষণেই তার বিরহ, উন্মাদনা আরও বেড়ে যায়। প্রলাপ বকাও শুরু করেন। চিঠিতে লেখা চারটি লাইন এরকম—
“প্রভুকে কহিও আমার কোটি নমস্কার।
এই নিবেদন তাঁর চরণে আমার।।
“বাউলকে কহিও লোকে হইল আউল।
বাউলকে কহিও হাটে না বিকায় চাউল।।
বাউলকে কহিও কাজে নাহিক আউল।
বাউলকে কহিও ইহা কহিয়াছে বাউল।।””
(চৈতন্য চরিতামৃত)
নীলাচলে ভক্ত পরিবেষ্টিত শ্রীচৈতন্যের কাছে এই তর্জা পাঠ করে শোনান জগদানন্দ পণ্ডিত। যা শুনে হঠাৎই উজ্জ্বলকান্তি মহাপ্রভুর মুখাবয়বে নেমে আছে অমনিশা। তাঁর সেই ভাব পরিবর্তন খেয়াল করেন আর এক অন্তরঙ্গ সহচর স্বরূপ দামোদর। তিনি প্রভুর কাছে ওই তর্জার অর্থ জানতে চান। ঈষৎ হেসে মহাপ্রভু বলেন, দেবতার আহ্বান এবং বিসর্জন তোমার মতো শাত্রজ্ঞ পণ্ডিতের তো অজানা নয়। ব্যস। এতটুকুই বলেই থেমে যান। মহাপ্রভু যে আসল কথা গোপন করলেন তা আজ বুঝতে বাকি রইল না স্বরূপ দামোদরের। অজানা আশঙ্কাতে তাঁর হৃদয় কেঁপে উঠল। অদ্বৈতাচার্যের আহ্বানে একদিন ভাগীরথীর তীরে মহাপ্রভুর আগমন হয়েছিল। এখন কি বিসর্জন আসন্ন? আচার্যদেব তাঁর তর্জার প্রহেলিকাময় শব্দের মাধ্যমে কী তারই ইঙ্গিত পাঠিয়েছেন। ‘হাটে না বিকায় চাউল’ অর্থাৎ আর বেশি দিন সাধারণ মানুষ ভক্তি আন্দোলনের রস গ্রহণ করবে না। অবিলম্বে আন্দোলনের রাস্তা থেকে সরে আসার নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন অদ্বৈতাচার্য। তাহলে কী এতদিনের প্রচেষ্টা সবটাই মাঠে মারা যাবে? এই প্রশ্ন শ্রীচৈতন্যদেবকে বড়ই বিচলিত করে তোলে। নতুন পথ কী হবে? কোন পথে এগবে বৈষ্ণব আন্দোলন? এই তর্জা শোনার পর মহাপ্রভু নিজেকে গম্ভীরার মধ্যে গুটিয়ে নিলেন। ভক্তদের সঙ্গে দেখা আর প্রায় করতেন না বললেই চলে। এই ঘটনার অনতিকাল পরে ২৯ জুন (মতান্তরে ১৫৩৪ সালের ১৪ জুন) আকস্মিক এবং অপ্রত্যাশিতভাবেই অন্তর্ধান হলেন শ্রীচৈতন্যদেব।
★ ১৬৯৪ সাল:
জন্ম হলো আর এক মিথের।
শ্রীচৈতন্যের রহস্যজনক অন্তর্ধানের পরবর্তী জীবন সম্পর্কে কয়েকটি বিবরণ থেকে জানা যায় যে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুকে সশরীরে শেষ বার দেখা গিয়েছিল তোটা গোপীনাথের মন্দিরে। তারপর ওখান থেকে জটাজুটধারী সন্ন্যাসীর বেশে তিনি চলে যান তৎকালীন উড়িষ্যার আনোরপুর পরগনার ঘোলা দুবলি নামক গ্রামে।সেখান তিনি থেকে যান বেশ কয়েক বছর। আমাদের অনুসন্ধানে যেটুকু জানতে পেরেছি, এই ঘোলা দুবলি গ্রামটি হল বর্তমান রঘুরাজপুর যা পুরী থেকে 14 কিলোমিটার দূরে ভার্গবী নদীর তীরে অবস্থিত। রঘুনাথপুর গ্রামটি তার পটচিত্র, চারুশিল্প এবং অন্যান্য শিল্পকলার জন্য বর্তমানে বিখ্যাত হলেও এর কিছু রহস্যময় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই গ্রামটিতে অনেকগুলি ছোট ছোট মন্দির আছে যাদের মধ্যে একটি গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর। মন্দিরগুলি ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যায় এগুলির বেশীরভাগই বৈষ্ণবদের সমাধিমন্দির। এরকমই তিনটি সমাধি মন্দিরের সন্ধান আমরা পেয়েছি পুরীর টোটা গোপীনাথ মন্দির থেকে একটু দূরে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের বসতি অঞ্চলে। প্রজ্ঞাপ্রাণা অধ্যাপিকা শান্তা মায়ির মতে ঘোলা দুবলিতে বেশ কয়েক বছর কাটিয়ে চৈতন্য মহাপ্রভু এসে হাজির হন উলাগ্রামে। সেখানে তাকে সন্তানস্নেহে লালন পালন করেন মহাদেব বারুই। এর পরে বহু জায়গা পরিভ্রমণ করার পর পূর্ববঙ্গের বেজড়া গ্রামে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন 22 জন সদগোপ, রুইদাস, কাঁসারি ইত্যাদি তথাকথিত নিচু জাতির মানুষ। তখন তিনি কিন্তু পরিচিত হয়েছেন আউলচাঁদ নামে যার সঠিক পূর্ব ইতিহাস আজও অজ্ঞাত। সমাজের নিপীড়িত, অস্পৃশ্য, অবহেলিত মানুষকে অকাতরে কোল দেওয়া, সেই বাহুতুলে প্রেমে ঢলঢল নৃত্য, দীর্ঘকায় আজানুলম্বিত বাহু ইত্যাদি অনেক কিছুই হুবহু মিলে যায় চৈতন্যদেবের সঙ্গে। আউল চাঁদের প্রবর্তিত কর্তাভজা সম্প্রদায়ের মূল সাধন পদ্ধতিরও অনেকটাই মিল রয়েছে। ওনারা আউল চাঁদের জন্ম তিথিও পালন করেন দোল পূর্ণিমাতেই। ভক্তেরা আউলচাঁদকে আউল মহাপ্রভু, কাঙ্গালী মহাপ্রভু ইত্যাদি নামেও ডাকতেন। তবে এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো আউলচাঁদের নিজের হাতে প্রাচীন বাংলা ভাষায় তালপাতায় লেখা দুটি লাইন,
এর অর্থ হল ওনার (শ্রীচৈতন্যের) বাড়ীর বৃদ্ধ চাকর ঈশান, মাতা শচীদেবী এবং ওনার অন্তরঙ্গ পার্ষদ স্বরূপ দামোদর কেউই আজ আর বেঁচে নেই। শুধু তিনিই এখনও পড়ে আছেন আর কাঁদছেন জগন্নাথের পায়ে।
তবে একটাই বড়োসড়ো গরমিল থেকে যাচ্ছে তা হল ইতিহাস অনুযায়ী প্রায় দেড়শ বছরের সময়ের ব্যবধান রয়েছে চৈতন্য মহাপ্রভু আর আউল চাঁদের মধ্যে। যদিও আমাদের তথাকথিত ইতিহাসেও অনেক ফাঁক থেকে যায় তা আমরা নিজেরাও বারবার প্রমাণ পেয়েছি।
এর মানে কি মহাপ্রভু ৪৮ বছরে নয়, বরং ২৫০ বছর বেঁচে ছিলেন!!! আর তাকে যে আউলচাঁদ নামে কায়াকল্প করতে হবে সে ইঙ্গিত কি ওই অদ্বৈতাচার্যই দিয়েছিলেন( বাউলকে কহিও কাজে নাহিক আউল)? আলোচনা করবোই একদিন। বিস্তারিত ভাবে।