সোনার ভারতবর্ষ। কিন্তু কোথায় গেল সেই স্বর্ণভাণ্ডার? সে অনেক কথা। কিন্তু সম্পদে, অর্থে এই দেশই যে ছিল সেকালের লোভনীয় গন্তব্য, তার প্রমাণ আমরা বারেবারে পেয়েছি। ইতিহাস সাক্ষী দিয়ে গেছে তার। সেই সম্পদের টানেই সুদূর ইউরোপ থেকে বহুবার সমুদ্রপথে পাড়ি জমিয়েছে নাবিকের দল। আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বদেশে বিধিবদ্ধ বাণিজ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেও তারা অনেকে ব্যবসা করতে এসেছে ভারতীয় উপকূলে। কখনো পর্তুগীজ, কখনো ফরাসি আবার কখনো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দল। যেমন কলকাতার গঙ্গায় ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিল অফিসার জব চার্নকের জাহাজের বহু আগে ভেসে এসেছিল আর্মেনিয়দের জাহাজ। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত আর্মেনিয়দের প্রাচীন গীর্জা তার স্মৃতি বুকে ধরে রেখেছে আজও। ঠিক এমন ভাবেই ভারতের বুকে বাণিজ্য করবার লক্ষ্যে ১৬১২ সালে ডেনমার্কে একদল ড্যানিশ বণিকদল তৈরি করেন ‘ড্যানিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’। লক্ষ্য ছিল ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বাণিজ্য কুঠি তৈরি করে পণ্য আমদানি রপ্তানির মাধ্যমে কিছু লাভের মুখ দেখা। ইউরোপীয়রা চিরকালই বেনিয়ার জাত৷ বাণিজ্যের উপরে তাদের কাছে আর কিছুই নেই। তাই ভাস্কো-দা-গামার হাত ধরে একবার ভারতীয় উপকূলের খোঁজ ইউরোপে পৌঁছে যাবার পর আর কখনোই ইউরোপীয় জাহাজশূন্য থাকেনি ভারতীয় বন্দরগুলো। এমনকি তখনকার প্রচলিত শহরগুলো বাদেও তথাকথিত গণ্ডগ্রামগুলোকেও নিজেদের সুবিধার জন্য বানিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করতেন তাঁরা। আজকের মহানগরী কলকাতাই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
যাই হোক, ১৬১৬ খ্রীস্টাব্দে ক্যাপ্টেন রডেন্ট ড্রেকের নেতৃত্বে একটি জাহাজ ডেনমার্ক থেকে রওনা হয় ভারতের দিকে। কিছুমাস পরে জাহাজটি এসে পৌঁছোয় দক্ষিণ ভারতে করমণ্ডল উপকূলের ট্রাঙ্কুবার শহরে। সে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। উপকূলে জাহাজ নোঙর করবার আগে আগেই ড্যানিশদের আস্ত জাহাজখানা গেল ভেঙে। তক্ষনি সমস্ত মালপত্র সমেত নাবিক ও খালাসিরাও একেবারে জলে। কয়েকজন বেঘোরে প্রাণ হারালেন বটে, কিন্তু ক্যাপ্টেন রডেন্ট ড্রেক সাহেব প্রাণটুকু বাঁচিয়ে যাহোক করে পৌঁছলেন ট্রাঙ্কুবার শহরে। তাই এইদেশে পা রাখবার প্রথম দিনটা মোটেই মসৃণ হয়নি ড্যানিশ নাবিকদের জন্য। তবে সমস্ত ঝঞ্জাট মিটিয়ে ড্রেক সাহেব তাঞ্জোরের রাজার কাছ থেকে ১৫ বর্গমাইল জায়গার ইজারা নিয়ে তৈরি করলেন ভারতের প্রথম ড্যানিশ বাণিজ্যকুঠি। এই ছিল ভারতীয় ভূখণ্ডে ড্যানিশদের প্রথম পদচিহ্ন।
এর বেশ কিছুকাল পরে ১৬৯৮ সালে তাদের নজর পড়ে কৃষিভিত্তিক বাংলার দিকে। তখন বাংলার সুবেদার সম্রাট ঔরঙ্গজেবের প্রিয় পৌত্র আজিমুস্বান। প্রথমে বালেশ্বর ও পাটনায় বাণিজ্য করবার জন্য নবাবকে প্রাথমিক প্রায় ত্রিশ হাজার সিক্কা টাকা দশটি বাৎসরিক কিস্তিতে নজর হিসাবে দিতে হল তাদের। কথায় কথায় বলে রাখা ভালো, ঘুষ বস্তুটি কেবল আজকের দিনে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সমস্যা নয়। মুঘল যুগে স্থানীয় সরকারের কাজকর্ম প্রায় পুরোটাই ঘুষ আর নজরানার আধিক্য অনুযায়ী পরিচালিত হত। তাই যেকোনও ফরমান বার করতে হলেও পাঠাতে হত গরুর গাড়ি ভর্তি উপহার আর নগদ নজর। শোনা যায় নবাব হবার পর সিরাজদ্দৌলাকে ইংরেজ কোম্পানি কোনও উপহার পাঠান নি বলে প্রথম দিন থেকেই কোম্পানির সব অফিসারদের উপর চটেছিলেন তিনি।
তবে যাই হোক, ড্যানিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যকর্মও যে খুব মসৃণতার সাথে অতিবাহিত হচ্ছিল তা কিন্তু নয়। প্রথমে বালেশ্বর ও পাটনায় ব্যবসার হাতেখড়ি ঘটালেও তারপরে তাদের নজর পড়ে গাঙ্গেয় বাংলার উপকূল। চন্দননগরের (তৎকালীন ফরাসডাঙা) অন্তর্ভুক্ত গোন্দলপাড়া গ্রামে বাণিজ্যকুঠি তৈরি করবার জন্য একরকম উঠে পড়ে লাগেন কোম্পানির অধ্যক্ষ সর্টম্যান সাহেব ও অন্যান্য অফিসারেরা। নবাব খানজা খাঁর কাছ থেকে মাসিক ২০ টাকায় গোন্দলপাড়ার পাট্টা আদায় করে ড্যানিশ কোম্পানি। তখন চন্দননগরে ফরাসী রমরমা। এমনকি কোম্পানির অধ্যক্ষ সর্টম্যান সাহেব ফরাসীদের সাথেই বাস করবেন বলে মনস্থির করলেন তৎকালীন ফরাসডাঙায়। সেখানে থাকাকালীনই তার পরিচয় হল মুর্শিদাবাদ নবাব দরবারের ফরাসী দূত ল সাহেবের সাথে। ফরাসীদের সাথে নবাব আলিবর্দীর সম্পর্ক বেশ মধুর। তখন কলকাতায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এমনকি নবাবকে লুকিয়ে দূর্গ নির্মানেও তাদের খুব ঝোঁক। এমন অবস্থায় ইংরেজদের কর্মকাণ্ড নবাব আলিবর্দীর একেবারেই না পসন্দ হলেও ফরাসীদের তাঁকে সন্তুষ্ট করে নির্ঝঞ্ঝাট বাণিজ্য কর্ম তিনি পছন্দ করেন। মুর্শিদাবাদের দরবারে তাই ল সাহেবের খুব মান। আমরা পরবর্তী সময়ে পলাশী যুদ্ধের সময়েও ইংরেজদের বিরুদ্ধে থাকা নবাব সিরাজদ্দৌলার বাহিনীতে ফরাসী সেনাপতি সিঁনফ্রে সাহেবের সক্রিয় যোগদানের কথা জানি। নবাব আলিবর্দীর সময় থেকেই এই সখ্যতা। আর তা খবর পান ড্যানিশ ক্যাপ্টেন সর্টম্যান। ব্যবসার জন্য একটা পাকাপাকি জায়গা অনেক আগেই প্রয়োজন ছিল তার। তারজন্য নজর ছিল শ্রীপুর, মোহনপুরের মতো গঙ্গার তীরবর্তী বর্ধিষ্ণু গ্রাম। হাতে এসেও গেল সুযোগ। ল সাহেবের হাতে প্রচুর উপঢৌকন দিয়ে তিনি ড্যানিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য শ্রীপুর চাইতে পাঠালেন মুর্শিদাবাদে নবাব দরবারে। ১৮৪৫ সালে ‘ক্যালকাটা রিভিউ’ থেকে জানা যাচ্ছে, ড্যানিশ কোম্পানি এরজন্য প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা ব্যয় করে।