সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ১)

আমার মেয়েবেলা
আমার শৈশব কেটেছে মুর্শিদাবাদ জেলার ফরাক্কায়।
সেই ফরাক্কা,,
যেখানে প্রকৃতি যেন নিজেকে মনের মতো করে ঢেলে সাজিয়েছে। প্রকৃতি সেখানে বাড়ির মেয়ে, পাশের বাড়ির কাকিমা। মায়ের হাতে মার খেলে যে রান্না ফেলে আগে ছুটে আসত বাঁচাতে। যে কাকিমা মায়ের মতো শাসন করত, বন্ধুর মতো মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করত প্রেমে পড়লে বলিস কিন্তু ।
ফরাক্কার কোয়ার্টার গুলো পরপর সুন্দর করে ছবির মতো সাজানো ছিল। সব কোয়ার্টার গুলোই মোটামুটি বাইরে থেকে একই রকমের দেখতে ছিল।
একসঙ্গে দুটো কোয়ার্টার বা চারটে কোয়ার্টার
তারপর একটু গ্যাপ। কোনও গুলো আবার একটা একটা। মাঝে বেশ খানিকটা গ্যাপ।
এক এক ক্যাটাগরির এক এক রকমের কোয়ার্টার। এই গ্যাপ থাকার জন্য সব কোয়ার্টার এর সামনে পাশে প্রচুর ফুলের ফলের গাছ লাগানো হত। সবজির চাষও করা হত।
আমার একদম প্রথম জীবন কেটেছে একসঙ্গে চারটে কোয়ার্টার এর ক্যাটাগরিতে। পরে আবার দুটো ক্যাটাগরিতে।।
তবে আমার মধ্যে কোনও দিন এসবের হেলদোল ছিল না। বাবা কেন বড়ো কোয়ার্টার পায়নি,, বা আমরা যদি অনেক বড়ো কোয়ার্টারে থাকতে পারতাম তাহলে আরও ভাল থাকতাম আরও সম্মান পেতাম। আসলে আমি কোনও দিন এসব ভাবিই নি কারণ আমি সেই ছোট্ট বেলা থেকেই নিজের পরিচয়ে বাঁচার চেষ্টা করতাম। পছন্দ করতাম সেইভাবে বাঁচতে আর তারজন্য গোপনে নিজেকে তৈরিও করতাম। এখনও তাই।আমার জীবনে কোনও দিন আমি আমার প্রয়োজনে আমার বাপের বাড়ি বা শশুড় বাড়ির পরিচয় কখনও ব্যবহার করিনি। আমার পরিচয় আমি নিজেই।।
তো যাইহোক ফরাক্কায় এসব খুব দেখেছিলাম। আমার বন্ধুদের মধ্যেও ছিল। ওর বাবা বড়ো ইঞ্জিনিয়ার, ওর বাবা ড্রাইভার, ওর মা হসপিটালে আয়ার কাজ করে। আফটার অল সাহেবের ছেলে সাহেবই হয়।। এসব তো ইন্ডাস্ট্রিয়াল জায়গায় চলেই।।
এখন ও শুনি অনেকের মুখে। তবে আমি তখনও ছিলাম আত্ম ভোলা এখনও তাই।।
যা বলছিলাম আমাদের ফরাক্কায় প্রকৃতি মনের আনন্দে যেন নেচে নেচে বেড়াত। ঝকঝকে পিচের চওড়া পরিষ্কার রাস্তা। রাস্তার দুধারে বড়ো বড়ো গাছ একে অপরের সঙ্গে ঝুঁকে প্রেমালাপে ব্যস্ত। ফলে প্রতিটি রাস্তাই একটু মেঘলা আধো অন্ধকার কেমন যেন কুয়াশা জড়ানো।রাস্তায় অত কটকটে রোদ ছিল না। রাস্তার ধারে গরম কালে গাছের ছায়ায় দু দন্ড জিরোনো যেত।। গাছে গাছে কোকিলের ডাক, ঘুঘু পাখির ঘুউউউঘূ , টিয়া কাক চড়ুই কাঠবেড়ালির ব্যস্ততা,,শালিকের ঝগড়া,,, রাস্তার ধারে ফণীমনসা আকন্দর জঙ্গল থেকে গুণগুণ একটা আওয়াজ পেতাম।
ভোরে ফুল তোলার কাজটা একটা নৈতিক দায়িত্ব এবং কর্তব্যের মধ্যেই নিয়ে ছিলাম। প্রতিদিন মোটাসোটা আকন্দ ফুলের মালা শিব ঠাকুরকে উপহার দিতাম। বলা যায় খুব তুষ্ট রাখতাম, ঘুষ দিতাম মাথায় বেলপাতা দিয়ে। মা বলেছিল – শিব ঠাকুরকে বলবি তোমার মত বর চাই। প্রথম প্রথম মায়ের কথা মতো তাইই বলতাম। কিন্তু একটু জ্ঞান হতে আর বলিনি। তখন শিব ঠাকুরের কাছে একটাই অনুরোধ করতাম গলায় মালা পরিয়ে,,
ঠাকুর মদ গাঁজা সিদ্ধি ভাঙ খাওয়া, খালি গায়ে বাঘছাল পরা, শ্মশানে মশানে ঘোরাঘুরি করা বর আমার চাই না। তাতে যদি আমার বিয়ে না হয়, না হোক। আমি মা দুগ্গার মতো আত্মহত্যা করতে পারব না।
তখন তো আমি আবার শশী কাপুরের প্রেমিকা। অমন ছাই মাখা খালি গা ওলা শিব ঠাকুর আমার পছন্দ হবে কেন?
স্কুল ছুটির দিনে ভাই এর সঙ্গে বেরিয়ে পরতাম ঘুড়ি লাটাই নিয়ে। লাটাই ধরে একটা গাছের তলায় বসে থাকতাম। ভাই সব বুঝিয়ে টুঝিয়ে আমাকে বসিয়ে সাইকেল চালাত। সামনেই চালাত। বেশি দূরে যেত না। খেয়াল রাখত। আমি ঠিকমতো ঘুড়ি ওড়াতে পারছি কিনা।