একদিকে এয়ারপোর্টে যাওয়ার ঝাঁ চকচকে হাই রোড, অন্যদিকে রেলস্টেশনে যাওয়ার ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, কোনটা তার জন্য পারফেক্ট হবে? অটো স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই কথাই ভাবছে পারিজাত। আসল নাম জবা। পারিজাত নামটা তার নিজের দেওয়া। নামের মধ্যেই একটা আভিজাত্য লুকিয়ে আছে। বাবা মায়ের দেওয়া জবা নামটা কেমন যেন ম্যাড় ম্যাড়ে। শুনলেই মনের মধ্যে ভেসে ওঠে গরীব বাড়ির উঠোনের একপাশে অনাদরে ফুটে থাকা এক ফুল, যার না আছে গন্ধ, না আছে নজর কাড়া সৌন্দর্য । কিন্তু এসব কি আবল তাবল ভাবছে পারিজাত? যে কোন বুর্বকও বলে দিতে পারবে কোন রাস্তাটা কমফর্টেবল, সেখানে পারিজাতের মত মডার্ন , স্মার্ট সুন্দরী বুঝে উঠতে পারছে না !
(২)
মা তোমায় কতদিন বলেছি সব তরকারীতে একগাদা করে আলু দেবে না। আলুতে ওয়েট গেইন হয় । ঢেঁড়স আলুর তরকারী থেকে বেছে বেছে শুধু ঢেঁড়সগুলো তুলে নিল জবা।
তিনজন মানুষের পাতে দিতে হবে তো? শুধু ঢেঁড়স দিয়ে রান্না করলে কতটা ঢেঁড়স লাগবে জানিস ? তোরা তো বলেই খালাশ। সংসারটা যে কিভাবে চালাই তা একমাত্র আমিই জানি। পূর্নিমা রাগে গজ গজ করতে থাকে।
সকাল সকাল তোমার রামায়ন শুরু করো না মা প্লিজ।
হ্যাঁ আমি কিছু বললেই তো রামায়ন হয়ে যায় ! যাক গে, তোর যা ইচ্ছে কর। খেলে খা, না খেলে না খা। এই বলে পূর্নিমা জবার বাতিল করা পুরোনো ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ল। ও একটা দর্জির দোকানে ফলস , পিকো বসানোর কাজ করে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জবা নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল। হালকা নীল রংয়ের ড্রেসটাতে বেশ অ্যাট্রাকটিভ লাগছে। শরীরের প্রতিটা খাঁজ নিঁখুত বোঝা যাচ্ছে। আবার অশালীনও লাগছে না। আজ যে স্কুলটাতে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছে শুনেছে সেখানকার প্রিন্সিপালের নাকি সুন্দরী মেয়েদের প্রতি একটু উইকনেস আছে। এটাই অবশ্য জবার কাছে প্লাস পয়েন্ট । জবা আয়নার দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হাসল । হাইট, নাক চোখের সার্পনেস, আর নিজেকে প্রেজেন্ট করার স্মার্টনেস , এই তিনটিকে মূলধন করেই তো এগিয়ে চলেছে সে। নয়ত পচা মার্কা বেঙ্গলি মিডিয়াম কলেজ থেকে কোনো রকমে গ্রেজুয়েশন করা একটা মেয়ে কি অত নামকরা একটা ইংলিস মিডিয়ামে চাকরী পেতে পারে ?
অবশ্য এই জায়গায় আসার জন্য জবাকে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে। প্রথমে একটা ছোট্ট নার্সারি স্কুলে ঢুকতে হয়েছিল। তারপর একের পর এক সিড়ি ভেঙ্গে এগিয়ে চলা। আজ যে স্কুলে যাচ্ছে, ওটা হাওড়া জেলায় একটা নাম করা ইংলিস মিডিয়াম স্কুল। যে কোন মূল্যেই হোক চাকরীটা ওকে পেতেই হবে। অনেক অনেক উঁচুতে উঠতে হবে তাকে। একেবারে স্বর্গরাজ্যে পৌঁছতে হবে। সাধে কি নিজের নাম কোর্টে গিয়ে এফিডেবিট করে জবা থেকে পারিজাত হয়েছে।
ইন্টারভিউ দিতে গেলে , বাবা মা কি করেন জানতে চাইলে , জবা তার দরজির দোকানের কাজ করা মা কে ফ্যাশান ডিজাইনার, আর সাইকেল গ্যা্রেজের মালিক বাবার পরিচয় দেয় মোটর গ্যারেজ মালিক হিসাবে। জবা ভালো করেই জানে গরীব ফ্যামিলি থেকে উঠে আসা , চোয়ালের হাড় বের করা, রুক্ষ্ণ, শুষ্ক ত্বকের মেয়ে গুলো কবিতা, বা গল্পে নায়িকা হলেও চাকরীর বাজারে ব্রাত্য । সবাই আজকাল গিফটের থেকেও গিফট প্যাককে গুরুত্ব দেয় বেশী।
এই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল গুলোতে গ্ল্যামার থাকলেও মাইনেটা বড্ড কম দেয়। যা থেকে বেশীর ভাগটাই বেরিয়ে যায় নিজেকে মেনটেইন করতে। অবশ্য তা নিয়ে জবা একদম ভাবে না। ও জানে এক সময় না এক সময় , এইসব ইনভেস্টমেন্ট সুদে মূলে পুষিয়ে যাবে।
ঘর থেকে বেরোতে যাবে, জুতোর ফিতেটা গেল ছিড়ে। মনে মনে ভাবল, সস্তায় চকচকে জিনিস কিনলে এই হয়।
কিন্তু এখন কি করা ? ইন্টারভিউতে লেট পৌছালে চাকরী পাবার কোন চান্স নেই। মোবাইলটা বের করল রবিকে ফোন করার জন্য । যদিও ওকে ফোন করতে জবার একদম ইচ্ছে করে না। কিন্তু এইরকম সময় অসময়ে দরকার পড়লে, রবিই একমাত্র ভরসা । অনেকদিন ধরেই জবার পিছনে পিছনে ঘুরে বেড়ায় রবি। এখন একটা ছোট রেস্টুরেন্টে রিশেপশনিস্টের কাজ করে। মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখা হলে, জবা একটা মিষ্টি হাসি উপহার দেয়। এতেই রবি যেন কোটি টাকার লটারি জিতে যায়। জবার মত সুন্দরীর হাসি মুখ দেখার জন্য এমন কত রবি হা পিত্যেশ করে দাড়িয়ে থাকে। এটা জবাও জানে। তবুও জবা রবিকে দেখলে হাসে কারন হাসিটুকু ইনভেস্ট করে সে সময়ে অসময়ে রবিকে দিয়ে কাজ হাসিল করতে চায়। জবার ফোন পাওয়ার দু মিনিটের মধ্যে রবি এসে হাজির।
“কি রে , কি হল ? এত জরুরী তলব ।”
জবা মুখটা কাঁচু মাচু করে বলল, দেখনা বেরোনোর সময় জুতোটা গেল ছিড়ে । তুই একটু আমাকে স্টেশনে পৌঁছে দিবি প্লিজ? আজ একটা ইন্টারভিউ আছে, দেরি হলে চাকরিটা হওয়ার কোন চান্স নেই।
রবি যেন হাতের মুঠোয় চাঁদ পেয়েছে। জবাকে বাইকের পিছনে বসিয়ে ঊড়ে চলল সে। স্টেশনে গিয়ে রবি বলল, তুই আগে তাড়াতাড়ি জুতোটা সারিয়ে নে, আমি তোর জন্য টিকিট কেটে আনছি। রবির এই গুন গুলিই জবার ভালো লাগে। রবি তাড়াতাড়ি টিকিট কেটে নিয়ে এল, তারপর যতক্ষন না ট্রেন ছাড়ল, স্টেশনে দাঁড়িয়ে রইল । শুধু কি দাঁড়িয়ে রইল না মন প্রান দিয়ে প্রার্থনা করতে থাকল যাতে জবার চাকরীটা হয়ে যায়।
রবিকে ওইভাবে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওর ছোটবেলার বন্ধু দিবাকর এগিয়ে এল। দিবাকরের একটা ছোট বইপত্রের স্টল আছে স্টেশনে।
কী গুরু ?কেমন আছিস?
এই চলে যাচ্ছে ভাই। রবি উত্তর দিল।
মিছি মিছি সময় নষ্ট করছিস। ও পাখি তোর খাঁচায় ঢুকবে না ভাই। দিবাকর ব্যঙ্গের সুরে বলল।
রবি শুধু হাসল। কোনো উত্তর দিল না।
এই হাসি এক অদ্ভুত জিনিস। মানুষ কত কিছু যে লুকিয়ে রাখে এই হাসির আড়ালে। পশু পাখি হাসতে জানে না। ওরা কোনো কিছু অপছন্দ হলে চিৎকার করে, কখনও কখনও বিড়াল কুকুরকে আমরা কাঁদতেও শুনি। কিন্তু হাসতে দেখিনা বা শুনিনা, তাই হয়ত ওদের জীবনে জটিলতা মানুষের চেয়ে অনেক কম।
যাই হোক, রবির প্রার্থনার গুনে অথবা প্রিন্সিপালের সুন্দরীদের প্রতি দুর্বলতার দোষে, যে কারনেই হোক জবার চাকরীটা কিন্তু হয়ে গেল।
(৩)
মেয়েদের সৌন্দর্য ঠিক কৃষ্ণচূড়া ফুলের মত। যতক্ষন গাছে থাকে সবাই আহা আহা করে। কবিরা তাকে নিয়ে কবিতা লেখে, গান লেখে। একবার ঝরে পড়লে কেউ আর তাকিয়েও দেখে না। মাড়িয়ে চলে যায়। জবার মা পূর্ণিমা তাই রূপ থাকতে থাকতেই, মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। জবার মাসি একটা সম্বন্ধ এনেছে । ছেলে দুবাই এ চাকরী করে। ওরা কিচ্ছু চায় না। শুধু একটা ঘরোয়া, শিক্ষিত , সুন্দরী মেয়ে চায়।
জবার বাবা মিন মিন করে বলল, দুবাই? অত দূরে?
পূর্ণিমা খেঁকিয়ে উঠল, “ বোকার মত কথা বল না তো । সারাক্ষন তো অন্যের সাইকেল সারাই কর, স্ট্যাটাস বলে একটা কথা আছে বোঝ ? জাতে উঠতে চাও তো এখানে মেয়ের বিয়েতে রাজি হয়ে যাও। লোককে অন্তত গর্ব করে বলা যাবে, আমার মেয়ে বিদেশে থাকে।”কত সাধ ছিল আমার জীবনে অন্তত একবার প্লেনে চড়ে বেড়াতে যাব, তোমাকে বিয়ে করে আমার সব শখ জলাঞ্জলি গেল। কত ভালো ভালো সমন্ধ এসেছিল আমার। কেন যে মরতে তোমায় বিয়ে করতে রাজী হয়েছিলাম।
জবার বাবা মনে মনে বলে, বিয়ে কি আর এমনি এমনি করে ছিলে? তখন আমার দোকানের রমরমা দেখে বিয়ে করেছিলে। তখন তো আর এখনকার মত সবাই বাইক চালাত না। তখন সাইকেলই ছিল বেশীরভাগ মানুষের ভরসা।
মুখে বলল, তোমার মতে, জাতে ওঠার জন্য মেয়েকে ইনভেস্ট করতে হবে?
কি উল্টো পালটা বকছ? কিছু পেতে গেলে কিছু তো ছাড়তেই হয় না কী?
জবাও যে ব্যাপারটা ভাবছে না তা নয়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই কথাটাই জবা ভেবে চলেছে। শুধু আজ নয়, যেদিন থেকে দুবাইয়ের সম্বন্ধটা এসেছে তবে থেকেই ভেবে চলেছে। কিন্তু একটা কাঁটা মনের মধ্যে খচ খচ করে বিঁধছে । দুবাই গেলে সুখ সাচ্ছন্দ্য সে হয়ত অনেক পাবে, কিন্তু সেখানে তাকে জবা হয়েই থাকতে হবে, কখনও পারিজাত হয়ে উঠতে পারবে না। স্বামীর দাসী হয়ে থাকার থেকে স্বামীকে দাস বানিয়ে রাখার মজা অনেক বেশী। বেশ কিছুদিন ধরে এই একটা প্রশ্নই জবার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এদিকে দুবাইয়ের ছেলেটারও আসার দিন এগিয়ে আসছে। খুব ঠান্ডা মাথায় ডিশিসন নিতে হবে।
পূর্ণিমা জবাকে পাখি পড়ার মত বুঝিয়ে যাচ্ছে, জীবনে টাকাটাই সব, টাকা থাকলে জীবনে সব সুখ পাওয়া যায়।
জবা মায়ের কষ্টটা বুঝতে পারে, সারাজীবন অভাবের সঙ্গে লড়াই করে করে মা অমন হয়ে গেছে। জবাও জীবনে টাকার দরকারটা বোঝে কিন্তু টাকার জন্য সমস্ত স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে দিতে হবে এটা ঠিক মেনে নিতে পারছে না। মুক্ত বিহঙ্গের মত সে ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে চায়। দুবাই গেলে তাকে খাঁচার পাখির মত ছট ফট করতে হবে। না, ওভাবে সে বাঁচতে পারবে না।
অনেক ভেবে চিন্তে জবা সিদ্ধান্তে এল, রবিই তার জন্য পারফেক্ট। রবি তাকে স্বর্গের পারিজাতের মতই মাথায় তুলে রাখবে। আর জবাও রবিকে নিজের ইচ্ছে মত ওঠ বস করাতে পারবে।
রবিকে সব কথা জানাতেই, রবি খানিকক্ষন থম ধরে বসে রইল।
কি রে কিছু বলছিস না যে?
দেখ জবা, তুই তো আমার অবস্থা ভালো করেই জানিস। তোর মত মেয়ের তো রানীর মত থাকার কথা। আমার মনের মধ্যে তুই সব সময় রানী হয়েই থাকবি, কিন্তু আমি কি তোকে সেই সুখ স্বাচ্ছন্দ দিতে পারব?
রবির কথায় জবা খুশী হল, ঠিক এই রকমটাই তো সে চাইছিল। মুখে কিছু না বলে রবিকে জড়িয়ে ধরে নিবিড় ভাবে চুমু খেল জবা।
(৪)
আজ রবি আর জবা কাউকে কিছু না জানিয়ে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছে । রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জবাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে রবি এসে নিজের ঘুপচি ঘরে ঢুকল। রং চটা ছোট্ট আয়নার দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হাসল। জবার কিনে দেওয়া দামি সিগারেটে সুখ টান দিতে দিতে আবেশে চোখ বুজল রবি। মনে মনে বলল, যাক, এত দিনের ইনভেস্টমেন্ট কাজে এল শেষ পর্যন্ত। এবার থেকে জবা সুন্দরী থুরি স্বর্গের পারিজাত ইনকাম করবে আর আমি ওড়াব। ।হা হা হা।