ছাড়ুন… ধরুন। আবার জোরে ছাড়ুন… ধরুন… বাঃ ভালো হয়েছে, তবে আরো ভালো হতে পারে। আরেকবার নিন।ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর… ছাড়ুন… বাঃ এবার আর একবার করতে হবে। এই তো খুব ভালো হচ্ছে।
অনেকক্ষণ ধরে শ্রেয়া দেখছিল ছেলেটিকে। মাথার সামনে চুল নেই বললেই চলে। লম্বা, গোলগাল চেহারা। চোখে চশমা। শার্টের পকেটের উপর লাগানো ব্যাচে লেখা আনন্দ বাগচী। এতক্ষণ ধরে তার সামনে বসে থাকা বয়স্ক লোকটিকেই ছেলেটি বলছিল, ছাড়ুন… ধরুন।
যতবার বলছিল শ্রেয়া লক্ষ্য করছিল, ছেলেটি ছাড়ুন বলে নিজেই ঠোঁট ফাঁক করে নিঃশ্বাস ছাড়ছে আবার ধরুন বলে নিজের পেটটাই ভিতর দিকে ঢুকিয়ে নিচ্ছে। এই ছাড়া আর ধরা যতক্ষণ চলল ততক্ষণ ছেলেটি এত জোরে চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছিল যে বন্ধ দরজার বাইরেও সেই শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
শ্রেয়া আরেকটি চেয়ারে বসে ছেলেটিকেই দেখে যাচ্ছিল। এর পরের টার্ন তার। সামনের মানুষটি উঠলে তাঁকেও ওই পদ্ধতির মধ্যে দিয়েই যেতে হবে। ওই ছাড়া আর ধরা…।হাসি পেল শ্রেয়ার। সে শব্দ করে হেসে উঠল।
আনন্দ অবাক চোখে তার দিকে তাকালো। শ্রেয়া বলল, সরি ভাই, কিছু মনে করবেন না। আপনার এক্সাসাইজ দেখে হাসি চাপতে পারলাম না।
এক্সাসাইজ?
আরে আপনি যেভাবে নিঃশ্বাস নিতে বলে পেট ঢুকিয়ে নিচ্ছেন, আবার পরমুহূর্তেই ছেড়ে দিচ্ছেন সেটা তো পেটের একধরনের ব্যায়াম। ওর নাম কপালভাতি । আবার হাসল শ্রেয়া।
আনন্দ মুহূর্ত খানেক গম্ভীর থাকার চেষ্টা করে হেসে ফেলল। তা যা বলেছেন ম্যাডাম। সারাদিন ধরে তো এটাই করি। এনার পর আপনিও করবেন।
আনন্দের সামনে বসে থাকা ভদ্রলোকটি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। আর কিছু করতে হবে বাবা?
না, কাকাবাবু। আপনার হয়ে গেছে। এবার ডাক্তারবাবু যেটা বলবেন, সেটা মেনে চললেই হবে।
আচ্ছা বাবা। রিপোর্টটা?
ওটা আমি ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে দেব। আপনি কাল যখন দেখাতে আসবেন পেয়ে যাবেন।
শ্রেয়া তাদের কথপোকথনের মাঝে ঘরটার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল। একদিকের দেওয়াল জুড়ে কাঠের কেবিন। আর একদিকে দুটো মেশিন। সামনে কম্পিউটার। ডান দিকের মেশিনের সামনেই মানুষটি বসেছিল। আর কম্পিউটারে তার লাংগসের ছবি উঠছিল। অনেকটা ইসিজি করলে যেমন ডায়াগ্রাম দেখা যায়। তেমনি কতগুলো রেখা। কোনোটা কার্ভ, কোনোটা সোজা আবার কোনোটা বাঁকা। হৃদয় অথবা লাংগের এই বিচিত্র গতিপথ তার বোঝার বাইরে।
সে দেওয়ালের আরেক দিকে তাকালো। পরপর অনেকগুলো অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখা। একপাশে ছোটো একটা বেসিন। বেসিনের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারলো এখানকার জলেও আয়রন। তারমানে এখানে ভর্তি রোগীদের পেটেও আয়রন যাচ্ছে! ভাবনাটা মাথায় আসা মাত্র সে নিজেই তাকে খন্ডন করল। নিশ্চয়ই চারদিকে ওয়াটার পিউরিফাই লাগানো।আফটার অল এটা একটা নামী হাসপাতাল।
শ্বাস কষ্টের সমস্যা নিয়ে আজ পালমোনলজিস্ট দেখাতে এসেছিল সে। দেখার পর ডাক্তার তাঁকে এই হাসপাতালেই পালমোনারি ফাংসন টেস্ট করতে পাঠিয়েছে। আপাততঃ সেখানেই সে বসে আছে।
হাসপাতাল শব্দটা ভাবা মাত্র তার আবার হাসি পেল। এটাকে হাসপাতাল না বলে সেভেন স্টার হোটেল বলাই ভালো। টপ ফ্লোরে ফুড পার্ক। কন্টিনেন্টাল থেকে ইন্ডিয়ান, চীনা থেকে ইতালিয়ান… সব খাবারই সেখানে মজুত। সঙ্গে ছোট্ট নীল সুইমিং পুল। মুহূর্তে মুহূর্তে কেয়্যারিং ডিপার্টমেন্টের লোক এসে তদারকি করে যাচ্ছে কার কী সমস্যা। অজস্র এল সিডি টিভি লাগানো। টেবিলের উপর রাখা ইংরেজি ম্যাগাজিন, নিউজ পেপার। এখানে কি সাধারণ বাংলা জানা পেশেন্ট আসে না? নিজেকেই প্রশ্ন করল সে। নিজেই উত্তর দিল। ইংরেজি হল আন্তর্জাতিক বিজনেস স্ট্রাটেজি। আজকাল আর নিজের ভাষার কদর নেই। একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে সে আবার আনন্দের দিকে তাকালো।
আসুন ম্যাডাম, এবার আপনার পালা। এই চেয়ারে বসুন। বড় একটা হাঁ করে এই পাইপটা মুখে টেনে নিন আগে। তারপর শুরু করব।
শ্রেয়া উঠে গিয়ে আনন্দের সামনের চেয়ারে বসল। পাইপটা একবার টেনে নিয়ে, মুখ থেকে বের করে অপেক্ষা করতে লাগল পরবর্তী নির্দেশের।
বুকে কষ্ট? শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা হচ্ছে বুঝি?
হুম। ছোট্ট করে ঘাড় নাড়ালো শ্রেয়া।
কত বয়স আপনার?
অনে…ক। বলে হাসল শ্রেয়া।
মেয়েদের বয়স জানতে চাওয়া ঠিক নয় জানি ম্যাডাম। কিন্তু আমাদের ডিউটি। প্রতিটা বয়সের আলাদা প্যারামিটার থাকে কিনা!
মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে ভাই। শ্রেয়া মজা করে হেসে বলল, বয়স চল্লিশ হল।
ও এমন কিছু বয়স নয়। এখন এই বয়সে মেয়েরা বিয়ে করছে।
কী বলছেন ভাই! চল্লিশ পেরোলেই তো বুড়ি।
সে আগেকার জমানায় হত। চল্লিশ পেরলেই সাদা শাড়ি, চোখে চালসে।
হুম, শ্রেয়া মৃদু হাসল।
হাঁটতে গেলে হাঁফিয়ে যান? আনন্দ আবার প্রশ্ন করছে।
সেরকম কিছু নয়। তবে সিঁড়ি ভাঙলে একটু হাঁপ ধরে।
ফ্ল্যাটে লিফট আছে?
ফ্ল্যাট নয়, বাড়িতে থাকি। লিফট নেই।
চাকরি করেন না হাউজ ওয়াইফ? মানে বাইরে বেরোনো হয় ?
হুম। একটা ছোটো ব্যবসা আছে।
বাঃ। আজকাল কোনো মেয়ের বাড়িতে বসে থেকে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। জানেন তো বাড়িতে থাকলেই মোবাইল ঘাঁটবে, সিরিয়াল দেখবে আর যত অশান্তির সৃষ্টি হবে।
আনন্দের কথা শুনে শ্রেয়া বলল, আপনি বুঝি ভুক্তভোগী?
না, ম্যাডাম। নিজের কপালে হাত বুলিয়ে আনন্দ বলল,- চুলে টাক পড়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু এখনো বিয়ে করার সময় পাইনি।
চোখ নাচিয়ে শ্রেয়া বলল, তবে যে বললেন, মেয়েরা বাড়িতে থাকলেই অশান্তি!
এর জন্য চোখ কান খোলা রাখলেই যথেষ্ট। আপনি নিজে এই করিডরে আধ ঘন্টা বসে থাকুন। টের পেয়ে যাবেন। যত্তসব বোগাস বিরক্তিকর সিরিয়াল আর মোবাইল, দুইয়ে মিলে সমাজটাকে উচ্ছনে দিয়ে দিল।
শ্রেয়া উত্তর দিল না। সে নিজে সিরিয়াল দেখে না, মোবাইলে আসক্তি নেই বললেই চলে। তবে যেখানেই যায় দেখে মানুষ কিভাবে মোবাইলে আসক্ত। রাস্তাঘাটে, অফিসে, দোকানে এমনকি এই হাসপাতালেও এসে থেকে দেখে যাচ্ছে শতকরা নিয়ানব্বই জনের কানে হেডফোন, আর কিছু টাইপ করে চলেছে, নয় ফেসবুকে ছবি দিচ্ছে এখানে বসেই। তারও খানিক আগেই বিরক্ত লাগছিল, তার পাশে বসা একটি মেয়ে তার অসুস্থ বাবাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে দিল দেখে।
আনন্দ আবার জিজ্ঞেস করল, কতদিন ধরে হচ্ছে এসব ?
কথাটা শুনেই শ্রেয়ার বহু বছর আগের একটা কথা মনে পড়ে গেল। কতদিন ধরে এসব হচ্ছে শুনি?
মাথা নিচু করে স্কুলে ক্লাস নাইনের মেয়েটা দাঁড়িয়ে। সামনে অঙ্কের টিচার। লজ্জা করে না তোমার? অঙ্কে জিরো পাও, আর নেচে বেড়াচ্ছ? বলিহারি মেয়েতো তুমি!
কোনো উত্তর না দিয়ে সেভাবেই বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে নিজের নখ খুঁটছিল সে।
কী হল উত্তর দাও। ক্লাসে না এসে ফাংসানে মেতেছ? মা বাবার কোনো আক্কেল নেই? মেয়ে এদিকে ফেল করছে।
এতক্ষণে শ্রেয়া শান্ত অথচ দৃঢ় কন্ঠে উত্তর দিল, মা বাবাকে খামোকা তুলছেন কেন? আর অঙ্কে তো এবারই প্রথম কম নম্বর পেলাম।তা বলে জিরো পাইনি। তিরিশ পেয়েছি। পাশ তো করেছি। পরেরবার আরো ভালো করব।
কী? মুখে মুখে জবাব দিতে শিখেছ? চলো, আজই তোমাকে হেডমিস্ট্রেসকে বলে টিসি দেবার ব্যবস্থা করছি। বেয়াদপ মেয়ে কোথাকার।
দিদি, একটা কথা বলব, কিছু মনে করবেন না। আমার বাবা এই স্কুলের সেক্রেটারি। এই স্কুল যে সরকারি অনুদান পেয়েছে, তাও আমার বাবার জন্যই। আর বাবাকে না জানিয়ে আমি স্কুল কামাই করিনি। কাল অল বেঙ্গল ডান্স প্রতিযোগীতা ছিল।
দেখে নেব, এবারের পরীক্ষায় তুমি কিভাবে পাস করো! সেক্রেটারির মেয়ে বলে সাপের পাঁচ পা দেখেছ! মুখে মুখে তর্ক! বদমাশ মেয়ে একটা। দিদি ঘন্টা পড়ার আগে পর্যন্ত একনাগাড়ে শ্রেয়াকে উদ্দেশ্য করে নানা কটুক্তি করেই গেলেন।
আজ এতদিন বাদে কিভাবে সেই কথাগুলো মনে পড়ল ভেবে শ্রেয়া নিজেই অবাক হল। বাবা বলতেন, কথারা মরে না, নিজের মতো জন্মায়, আমাদের চারদিকে ঘোরে, তারপর একসময় মনের গভীরে ঘুমিয়ে পরে, বহুদিন পর আচমকা একদিন ফিরে আসে,- সেই কথাটাই ঠিক। দিদির বলা কথাগুলো যেন দীর্ঘ শীতঘুমের পর হঠাৎ করে সামনে এসে দাঁড়ালো।
ম্যাডাম, সিগারেট, ড্রিঙ্কের নেশা আছে? আনন্দের ডাকে সম্বিৎ ফিরল শ্রেয়ার।
না। কোনো নেশা নেই।
বাঃ, খুব ভালো। এবার তাহলে শুরু করা যাক। নিন, ধরে থাকুন, হ্যাঁ এবার ছাড়ুন…।
একই পদ্ধতিতে বেশ কিছুক্ষণ ছাড়া আর ধরা চলার পর খানিক বিরতি।
শ্রেয়া নিঃশ্বাসটা ছেড়ে বলল, একটা কথা জানতে খুব ইচ্ছে করছে।জিজ্ঞেস করব?
আনন্দ শ্রেয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে গোল গোল দৃষ্টিতে কিছু একটা পর্যবেক্ষণ করে নিতে চাইল। তারপর বাঁ হাতের চেটো উলটিয়ে বললেন, বলুন।
আচ্ছা এই ছাড়া আর ধরা তো রোজ চলছে আপনার। নিজের জীবনে কতটুকু ছাড়তে আর ধরে রাখতে পেরেছেন কাছের মানুষদের?
আনন্দ সম্ভবত এমন প্রশ্ন আশা করেননি। সে খানিক বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শ্রেয়ার দিকে। তারপর কিছু ভেবে দার্শনিক সুলভ ভঙ্গীতে উত্তর দিল, ধরতে গেলেই কি ধরা দেয় কেউ, নাকি ছেড়ে দিতে চাইলেই ছাড়া যায়! জীবন একটা অচিন পাখি। তার আসা- যাওয়া ধরা- ছাড়া যে চলতেই থাকে ম্যাডাম। তারপর সামান্য হেসে বলল, চলুন আর একবার শুরু করা যাক। ধরুন… হ্যাঁ , এইতো খুব ভালো হয়েছে। এবার ছাড়ুন…।