জলের ঝাপটায় ধড়মড়িয়ে উঠে বসল এনি। মুখে রুমাল বাঁধা তিনজন বসে আছে তার সামনে। এনির সব চিন্তাভাবনা তালগোল পাকিয়ে যায়। তাদের মধ্যেই একজন বলে ওঠে, ” বসের জন্য ওয়েট করতে হবে, দেখা যাক কি বলে?” প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আধো আলো আঁধারিতে এক ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়ায় কিছুটা দূরে। ” কিছু খেয়েছে?” ” না বস, এইমাত্র জ্ঞান ফিরলো। তোমার জন্যই ওয়েট করছিলাম আমরা।” ” হুম, কি পাওয়া যায় দেখ ধারেকাছে, এনে খেতে দে। একটু ধাতস্থ হলে তোরা দুজন বাইকে করে বাড়ি পৌঁছে দিবি। খুব সাবধানে। ওর যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেই দায়িত্ব তোদের।” ” না বস। তুমি চিন্তা করো না, আমরা থাকতে কিচ্ছু হবে না ওনার।”
বস নামক ব্যক্তির গলাটা ভীষণ চেনা লাগছে এনির। কিন্তু মুখটা তো কিছুতেই দেখা গেল না। ঐটুকু কথা বলেই আবার কোথায় চলে গেল, যেন অন্ধকারে মিশে গেল। এরা কারা? উঃ, মাথাটা ভীষণ ভারি হয়ে আছে। ঠিকমতো কাজ করছে না। না, এবার আবছা আবছা মনে পড়ছে। আজ বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেয়ে রিপোর্টিংয়ের এক গোপন কাজে টাকিতে যেতে হয়েছিল। রেশনের জিনিসপত্র নাকি পাচার হয়ে যাচ্ছে, এদিকে সাধারণ মানুষ না খেয়ে মরছে। এনিকেই সবথেকে এফিশিয়েন্ট হিসেবে ভরসা করে এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। একদম হাতেনাতে ধরাও পড়ে গিয়েছিল অপরাধীরা মাল পাচার করার সময়ই। আর ঠিক তখনই অবিশ্বাস্যভাবে মুকুন্দজেঠু কোনো কারণ ছাড়াই তাকে শাসাল, ক্যামেরা কেড়ে নিল। প্রতিবাদ করতেই লাঠির বাড়ি পড়ল পিছন থেকে। তারপর আর মনে নেই।
অবশ্য কিছুক্ষণ পর একটা অন্ধকার ঘরে ঘোরের মধ্যেই এনি বুঝতে পারল কেউ বা কারা তাকে বন্দী করে রেখেছে কোনো একটা গুদামেই। আশেপাশে কাউকে পায়নি এনি, নিজের মোবাইল ফোনটাও না। কতক্ষণ এভাবে কেটেছিল মনে করতে পারছে না এখন সে। হঠাৎ দরজা খুলে এই রুমাল বাঁধা তিনজন কিছু বোঝার আগেই নাকে একটা রুমাল চেপে ধরল। এমনিতেই এনির তখন প্রায় মাথা কাজ করছিল না, ঠিকমতো জ্ঞানও থাকছিল না, তাই বাধা দেওয়ার বা প্রতিরোধ করার কোনো উপায়ই ছিল না। তারপর আবার সব ব্ল্যাঙ্ক।
এখন ঘরে মাত্র একজন রয়েছে পাহারায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এরা ওকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে নিয়ে এসে সুরক্ষিত অবস্থায় বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলছে কেন? এরা কারা? ঐ গলাটা কার? তার মানে দুটো আলাদা দল এরা।
মুকুন্দজেঠুর মতো মানুষ যে খাবার চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত এটা বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে। সমাজসেবক হিসেবেই সবাই চেনে। সাদা পাঞ্জাবিতে নিখাদ ভালো মানুষই শুধু নয়, কতো সমাজসেবামূলক কাজও নাকি করেন, নিজের এন. জি.ও. আছে। এতোদিন এসবই জানতো এনি। এনিদের বাড়িতেও অবাধ যাতায়াত ছিল, সেই সূত্রেই, পরিচয় থেকেই জেঠু বলা।
” নিন ম্যাডাম, এখন সামনের ধাবা থেকেই যা খাবার পাওয়া গেল। এই রুটি তরকাই কষ্ট করে খেয়ে নিন। তারপর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবো। চিন্তা করবেন না। আপনার বাড়ি এখান থেকে বেশী দূরে নয়। প্লিজ তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন। নিশ্চিন্তে থাকুন, আপনি সেফ আছেন, দাদার জিম্মায়।” ” আপনারা কারা? সত্যি বলুন। আর দাদা কে? আপনারা আমায় ধরে এনেছেন কেন?” ” ধরে আনিনি ম্যাডাম, উদ্ধার করেছি দাদার নির্দেশে।” “কে দাদা?” স্যরি ম্যাডাম, নাম বলা যাবে না। বারণ আছে। প্লিজ, খেয়ে নিন। বেশী দেরী হলে আপনার বাড়ির লোকও চিন্তা করবেন।”
বেশ কিছুক্ষণ হলো পল্লবরা এনিকে দিয়ে গেছে বাড়িতে। ক্যামেরা ও তার মোবাইল দুটোই উদ্ধার করে দিয়েছে ওরা। অক্ষত নেই ঠিকই, তবে যে কাজের জন্য প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যাওয়া, সেই রিপোর্টটা বানানোর রসদ আছে। হ্যাঁ, শেষপর্যন্ত পল্লবদের পরিচয় আর গোপন থাকেনি। এনির সামনে কথা বলার সময় পল্লবের এক শাগরেদ ভুলবশত আরেকজনের নাম ধরে ডেকে ফেলেছিল। পল্লবরা এই অঞ্চলে কুখ্যাত দল হিসেবেই পরিচিত। পাড়ার মস্তান যাদের বলা হয়। যদিও বস্তিবাসীরা ওদের শ্রদ্ধার চোখে দেখে বরাবরই। আর তা কেন, সেটা আজ বুঝতে পারছে এনি।
এখন এনির কাছে সবটা পরিষ্কার। মুকুন্দজেঠুর সব কারবারের হদিস জানা ছিল পল্লবদের। ঘটনাচক্রে ওরাও ওত পেতে ছিল গরিব মানুষদের খাবার উদ্ধার করতে ওদের মতো করে এবং সেই কাজেই ওখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। আর ঠিক তার আগেই এনিকে মুকুন্দজেঠুর লোকেরা মেরে বন্দী করে গুদামঘরে রাখে। এনির সাথের সঙ্গীসাথী ভয়ে ময়দান ছেড়ে পালাতে সক্ষম হয়। আর পল্লবরা সবটাই আড়াল থেকে দেখে। ঠিক তারপরই তারা মুকুন্দবাবুর লোকজনদের ওপর চড়াও হয়, ততোক্ষণে মুকুন্দবাবু নিশ্চিন্তে ময়দান ছেড়েছেন দেখে। তাই কিছুটা সহজেই ওদেরকে জব্দ করে ক্যামেরা, মোবাইল সমেত এনিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয় ওরা। কিন্তু এনি যেহেতু পল্লবকে মস্তান হিসেবে চেনে তাই চুপিচুপি কাজটা দ্রুত সারতে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে এনিকে ওখান থেকে উদ্ধার করতে বাধ্য হয়। যাতে এনি কোনোরকম বাধা সৃষ্টি না করে এবং কাজটি দ্রুত হয়। শেষপর্যন্ত পরিচয় গোপন না থাকায়, এনি ফেরার সময় পল্লব সামনে এসেছিল। ” দিদি, জানি আমরা ভালো ছেলে নই। তবে তোমরা যতোটা খারাপ ভাবো ততোটা খারাপও নই। আমরাও চাই গরিব মানুষের খাবার তাদের হাতেই পৌঁছাক। তবে তোমাদের মতো শিক্ষিত নই, তাই আমরা আমাদের মতো করে কাজ করতে চেষ্টা করি, করেছিলাম। যদিও আজ পারিনি। কারণ, আজ আপনাকে সেইমুহুর্তে উদ্ধার করাটা বেশী জরুরী মনে হয়েছিল। তবে ক্যামেরাটা এনে দিয়েছি। তাই প্রমাণ সমেত খবরটা সবার সামনে আসুক, তাই চাই। মুখোশের আড়ালের মানুষগুলোর আসল চেহারা সবাই জানুক। কাজটা রিস্কি। আমরা খারাপ হলেও আপনার সাথে আছি। যে কোনো প্রয়োজনে আমাদের পাশে পাবেন, যদি ভরসা করেন।” একটা ছোট্ট চিরকুটে নিজের ফোন নাম্বার লিখে এগিয়ে দিয়েছিল পল্লব। সঙ্গে এনির নিজের মোবাইটাও।
এনি ভাবলো, সব সাদা পোশাকের ভেতরের মানুষটা সাদা হয় না, যেমন সব তথাকথিত কালো জগতের মানুষের অন্তরও কালো হয় না। আমরা মানুষের পোশাকি চেহারা দেখে, সেটাই তার চরিত্র ভেবে ভুল করি হামেশাই।