।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় সুমিত রায়

গ্রামের ডাকে
অমল, চাকরি পেয়ে নিজের গ্রাম থেকে শহরে এসেছে কয়েক মাস আগে। কিন্তু তার মন আজও পড়ে থাকে গ্রামের বাড়িতে। যেন এক অদৃশ্য মায়ার বাঁধনে আজও অমল বন্দী।
গ্রামটির নাম হাপটিয়াগছ। মহানন্দা নদীর ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠা গ্রামটিকে, প্রকৃতি তার আসল রূপটি উজার করে দিয়েছে।সহজ-সরল কতিপয় কৃষক পরিবারের ছোট ছোট কয়েকটি কাঁচা ঘরবাড়ি নিয়ে তৈরি এই গ্রামটি।গ্রামের প্রত্যেকটি পরিবারের আছে- গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর দিঘী ভরা মাছ। সবুজ শ্যামল খোলা মাঠে, গরু-ছাগল দিনভর চরে বেড়ায়। বাড়ির চারিপাশে রংবেরঙের ফুল ও ফলের গাছগুলোর উপস্থিতি- গ্রামটিকে রূপসীর তকমায় পৌঁছে দেয়।পুকুরধারে সারি সারি তালগাছ দাঁড়িয়ে- পাহারা দেয়, রূপসী গ্রামটিকে।
শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা প্রায় সব ঋতুতেই গ্রামে একটা না একটা উৎসব লেগেই থাকত। রাতের যাত্রা গানের সানাই, পরিশ্রান্ত মানুষগুলোকে আনন্দ দিত।গ্রামের মানুষের নির্ভেজাল আন্তরিকতা, প্রত্যেকটি পরিবারের নিয়ে আসতো এক সুসম্পর্কের আভাস।তারা আপদে-বিপদে সুখে-দুঃখে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে যেন সকলের তরে ছিল, একটি পরিবার। তাদের ভালবাসার মধ্যে কোনও ছলচাতুরি ছিল না। ছিলনা কোন স্বার্থপরতা। তাই শহরে এসে অমলকে হোঁচট খেতে দেখা যায়-ছলচাতুরি আর স্বার্থপরতার পাথরের ধাক্কায়।
খোলা মাঠের মুক্ত বাতাস, নদীর কলকল শব্দ আর গাছের পাতার দোলনের সুর অমলের ভিতরে নাড়া দেয় । আর শীতকাল মানেই অমলের স্মৃতির পাতা থেকে উঁকি দেয় গ্রামের নানা দৃশ্য।গ্রামের মেঠো পথ আর পিচ ঢালা সরু রাস্তা, যার দু’পাশে সারি সারি খেজুর গাছ আর সবুজ ঘেরা চারিপাশে শস্যফুলের ক্ষেত দেখে- মনে হবে কোন শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবি। খেজুর গাছে ঝুলে থাকা মাটির তৈরি হাঁড়ি-সে এক অপূর্ব দৃশ্য। রাতের সুখ তারাগুলো নিভে গিয়ে, ফিরে আসে- কুয়াশার চাদরে মোড়ানো নতুন এক শীতের সকালে।শীতের এই সকালে গ্রামের বাড়িতে জমে ওঠে, খেজুর রস আর গুড় দিয়ে নানা পদের পিঠা বানানোর ধুম।
স্মৃতির কোটরে আটকা, ফেলে আসা গ্রামের প্রশান্তির শীতল পরশ ও মায়ার আঁচল- অমলকে টেনে ধরে সর্বক্ষণ । তাই ছুটি পেলেই অমল ছুটে যেত গ্রামের বাড়িতে।