ছাত্রাবস্থায় বান্ধবীর সাথে এক পাহাড়ী গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে পথের ধারে দেবদারু গাছের ছায়ায় দুজনা মিলে একটু বসেছিলাম, দেখছিলাম পাহাড়ীপল্লীর রূপ, তার গাছগাছালি। শুনতে পেলাম, – এই যে শুনছো? হ্যাঁ তোমদেরই বলছি, এই যে দেবদারু গাছদুটো দাঁড়িয়ে আছে যার তলায় তোমরা বসে আছ, আর এদের মাঝে যে চারা গাছগুলো দেখছ ওগুলো আমরা দুজন আর আমাদের ছানারা। ঐ দূরে যে পাহাড়টা দেখছ তার কোলে একটা বিশাল লেক আছে, লেকের চার ধারে আছে চিরহরিৎ পাইনবন। আমরা ওখানে গ্রীষ্মের সময় যাই, আবার ডিসেম্বরে ঠাণ্ডা পড়লে এখানে চলে আসি। তোমরা ওখানে বেড়াতে যেও, তোমাদের ছানা হলে তাদেরও ওখানে নিয়ে যেও, তোমাদের নেমন্তন্ন রইল। এখানে এই বেঞ্চটায় যেমন বসে আছ, প্রকৃতির শোভা দেখছ, তেমনি ওখানেও লেকের পশ্চিম কোণে দেখবে দুটো বড় দেবদারু গাছ, ওই দুটো দেবদারু আমরা দুজন, আর আমাদের মাঝে আমাদের ছানারা। আমাদের তলায় বেঞ্চ পাতা আছে। তোমরা আমাদের অতিথি হয়ে সেই বেঞ্চে বসবে। বেঞ্চে বসে তোমরা পাহাড় দেখবে, লেকের স্ফটিক স্বচ্ছ জল দেখবে, জলে পাইন বনের ছায়া তোমাদের মন ভুলিয়ে দেবে। আর তোমাদের ছানারা আমাদের ছানার সাথে খেলবে। তোমরা গেলে খুব খুশি হব, আমরা ঠিক তোমাদের চিনে নেব, তোমাদের ছায়া দেবো ঠাণ্ডা বাতাস দেবো। যেও কিন্তু।
সেদিনের সেই পাহাড়ীপল্লীর প্রাকৃতিক শোভা, তার আন্তরিক আহ্বান আমাদের মন ভরিয়ে দিয়েছিল, যা আজ দশ বছর পরেও আমরা ভুলতে পারিনি। সেদিনের সেই বান্ধবী আজ আমার স্ত্রী। এবারের গ্রীষ্মের ছুটিতে স্ত্রী আর আমাদের মেয়ে রূপসার হাত ধরে পৌঁছে গেলাম দশ বছর আগের সেই পাহাড়ীপল্লীর বন্ধুর নির্দেশিত পাহাড়ের কোলে লেকের ধারে। যাবার সময় ট্রেনে রূপসা বার বার বলছিল, ‘বাবা, আমি ওখানে গিয়ে তোমার বন্ধুর ছেলেদের সাথে খেলব।‘ ওখনে পৌঁছেই খুঁজেছিলাম দশ বছর আগের আমাদের সেই বন্ধুকে। পাইনবন পেয়েছিলাম, কিন্তু লেকের পশ্চিম কোণে কোন দেবদারু গাছ খুঁজে পাইনি, নেই কোন বেঞ্চও। সেখানে উঠেছে এক বিশাল অট্টালিকা। আমার চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল, দেখলাম স্ত্রী চশমা খুলে তার চোখ মুছছেন।