।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় ঋত্বিক গঙ্গোপাধ্যায়

লগ যা গলে

মঞ্জিরার সাথে আজ শেষবার দেখা হচ্ছে।
মঞ্জিরা পাত্র। বয়েস সাতাশ। চেতলায় বাবা মার সাথে থাকে। ওর একটা ভাই আছে। ক্লাস ইলেভেন। মঞ্জিরার পড়াশোনা হেরিটেজ কলেজে। তার আগে বিডি মেমোরিয়াল।ও সেক্টর ফাইভের একটা ফার্মা কম্পানিতে চাকরীজীবন শুরু করেছিলো। কোম্পানি চেঞ্জ করে এখন পুনের দিকে উড়ে যাচ্ছে। যেমন প্রায় সবাই যায়৷ যেতে হয়। মঞ্জিরা খুব প্রাণোচ্ছল মেয়ে। মাঝে মাঝে অবশ্য অকারন চুপচাপ হয়ে যায়। রাস্তার কুকুর বেড়াল খাওয়াতে ভালোবাসে, তাই ওকে সদয় মনের বলা যেতে পারে। বই পড়তে ভালোবাসে, তার চেয়েও ভালোবাসে গান শুনতে৷ পুরনো দিনের হিন্দি গানে ও একজন প্রায় অথরিটি। মঞ্জিরাকে দেখতে কেমন? আমাকে জিজ্ঞেস করলে খুবই ভুল হবে। তাই সে প্রসঙ্গ থাক।
মোদ্দা কথা হলো মঞ্জিরার সাথে আজ শেষবার দেখা হচ্ছে।
মলটা পাঁচ তলার। একদম ওপরে ফুডকোর্ট। সব মলেই তাই থাকে মনে হয়। পাঁচ তলা থেকে কেউ ভক করে বমি করে দিলে বা একটা হাড়ের টুকরো ছুঁড়ে ফেললে কোন ঝামেলাই নেই। কে করেছে বোঝার আগেই আসামী ভাগলবা। আমি এই কথাটাই মঞ্জিরাকে বলেছিলাম। প্রথম যেদিন এখানে খেতে আসা হয়েছিলো।
– মনে আছে?
মঞ্জিরা অন্যমনস্কভাবে হাসলো।
– এটা ঠিক হলো কবে?
– হয়ে গেলো। দিন পনেরো।
– মানে নোটিশ পিরিয়ড শেষ না করেই যাচ্ছিস।
কোন উত্তর পেলামনা।
আমাদের পিজ্জা রেডি হয়ে গেছে। কাউন্টার থেকে ছেলেটা হাত নাড়ছে অস্থিরভাবে। দৌড়ে নিয়ে এলাম। মঞ্জিরার প্রিয় পাইনাপল চিকেন পিজ্জা ( না চিকেন পাইনাপল পিজ্জা?)
– কদ্দিন পরে দেখা হচ্ছে বল তো!
– হ্যাঁ। প্রায় তিন মাস। তুমি ফেবুতে তো আসো না আজকাল।
– আসা হয়না।
– স্বাভাবিক। বিয়ের যোগাড় নিয়ে ব্যস্ত থাকো নিশ্চয়। ম্যাট্রিমোনিয়াল? নাকি ফ্যামিলি থেকে দেখেশুনে?
– বাবার অফিসের কলিগ, তার মেয়ে।
– আগে আলাপ ছিলো?
– ওই অফিসের পিকনিকে দু একবার…।
– ও।
বাইরে খুব এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে কাল থেকে। বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ দানা বেঁধেছিলো। সে এখন কোলকাতার দোরগোড়ায় হাজির।
– এরকম হুট করে চলে যাওয়াটা..
-” তোমার দুঃখে ” পিজ্জায় কামড় দিয়ে বললো মঞ্জিরা – সেটাই কি শুনতে চাও?
– বোকা বোকা কথা।
– আহা চটো কেন।
ফিক করে হাসলো। এই হাসিটা আমার ভয়ানক ফেভারিট।
– তোর মাস্টার্সের কি হলো?
– প্ল্যান চেঞ্জ।
আর কি বলার থাকতে পারে বুঝলাম না। চিরকাল বকবক করা কাজ ওর, আমার হচ্ছে শোনা। আজকে সবকিছু উলটো খাতে চলছে। অবশ্য ভেবে দেখলে এরকমই হওয়ার ছিলো।
আমাদের মধ্যে কোন হাত ধরাধরি নেই। কোন চুম্বন নেই। পাশাপাশি হাঁটা আছে৷ অনেক অনেক আলোচনা আছে৷ সিনেমা দেখা গান শোনা আছে। কিন্ত মঞ্জিরার বন্ধুবান্ধব আলাদা ধরনের। তার ভালো বাইকের শখ আছে৷ সে ডেটে গেছে ঘ্যাম বাইকে বসতে পারার লোভে। আমি বাইক চালাইনা। আমি সরকারী স্কুলে চাকরি পেয়েছি। ডেলি প্যাসেঞ্জারি করছি। আমরা দুটো পাড়ার বর্ডারে থাকতাম। আমি সরকারী কোয়ার্টারে, ওরা নিজস্ব হাই সোসাইটির ফ্ল্যাটে। অতঃপর ” একদা কি করিয়া মিলন হোলো দোঁহে কি ছিলো বিধাতার মনে। ” পাড়ার ছেলেরা টোন কেটেছে। ওদের বাড়িতেও ছুটকো ঝামেলা হয়েছে। আমরা সেই নিয়ে হেসেছি। আমার বাবা মা এই নিয়ে কিছু বলেন নি। ভুল বললাম। বাবা কিছু বলেন নি। মা প্রায় দশবছর প্যারালাইসিস হয়ে শয্যাশায়ী।
– তা হঠাৎ বিয়ে করার ডিশিসান নিলে?
– আরে সেই তো করতেই হোতো।
আমি মাথা চুলকে বললাম।
– ” হ্যাঁ, কিন্ত আর একটু দেখেশুনে পছন্দ করে নিলে হোতো না?
আমি হাসলাম – বাবাহ। তুই গুগাবাবার ডায়ালগ ঝাড়ছিস তো।
মঞ্জিরা হাতে ক্ল্যাপ দিল – মোক্ষম! আমি জানতাম তুমি ধরতে পারবে!
দুইজনে প্রাণ খুলে হাসলাম। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ফুডকোর্টের বাইরেই তিনদিক খোলা মলের টেরেস। আবহাওয়ার পরিবর্তন তাই ভেতর থেকেই দিব্যি বোঝা যায়।
– কাটতে হবে বুঝলে। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলে চাপ।
– কেন? ভিজলেই হয় দুজন মিলে।
মঞ্জিরা আমার দিকে তাকালো। আমি সেই দৃষ্টির সামনে কুঁকড়ে গেলাম।
আমি এখন বাড়ি ফিরবো। ও যাবে লেকটাউনে, এক বন্ধুর বাড়ি। সেই বন্ধু ছেলে না মেয়ে আমি জিজ্ঞেস করিনি। কোনদিনই করিনি। ওকে ক্যাবে ওঠাতে ওঠাতেই বৃষ্টি এলো। নিম্নচাপের ছ্যারছ্যারে বৃষ্টি। আমি বাসে ফিরবো। তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে লাভ নেই।
কি হবে?
মঞ্জিরা আমার বিয়েতে আসবেনা। চাকরী থেকে ছুটি পাবেনা৷
আধঘন্টা পরে ফোন করলাম। ঠিকঠাক পৌঁছেছে কিনা জানতে। ফোনটা বেজেই গেলো। কলারটিউনে ঃ লগ যা গলে, কে ফির ইয়ে হসিন রাত হো না হো / শায়দ ফির ইস জনমপে / মুলাকাত হো না হো..।
আমি একা একা ভিজতে ভিজতে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলাম।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।