এখানকার সন্ধ্যে বেশ মনোরম। ধানক্ষেত আর মানুষের বসতি সাথে পশ্চিম আকাশের অপরাহ্নের লাল রং।রাতটাও বিশিষ্টতা দান করেছে। এখন ইলেকট্রিকের আলো তবে টিংকু মামা বলেছিল এই গ্রামে বাড়িগুলো দুর থেকে হ্যারিকেনের আলোয় জ্বলে উঠত। রাত হলেই ঝিঝি পোকার শব্দে চারদিক ভরে উঠতো। সাবির সুবীরকে বললো টিংকু মামাকে বড্ড মিস করছি বল। সুবীর মাথা নাড়লো।
পরদিন বেশ সকালেই টিংকু মামা ফুলবাড়ী এসে উপস্থিত। সাথে একটা ম্যাপ। সাবির সুবীর জিজ্ঞাসা করতেই, টিংকু মামা জানালো আগে গরম গরম পরোটা ডিম ভাজা খেয়ে নিই। তার পর চা খেতে খেতে বলব। সকালে কালিকাপুর স্টেশন থেকে বেরিয়েছি। পেটে কিচ্ছু পড়ে নি।
চা খেতে খেতে টিংকু মামা বললো, সাথে ওদের এক আত্মীয় যুবক ছেলে বসেছিল। টিংকু মামা জানালো এই ম্যাপ টা এনেছি তোদের দেখাতে। সাথে মোবাইলে বর্তমান গুগল ইমেজ খুলে টিংকু মামা বললো, এখান থেকে কুঁড়েভাঙা যাবো, সেখান থেকে নদীর পাড় ধরে হেঁটে যাবো আমঝাড়া গ্রামে। এক কালে আমরা আমঝাড়ার মাঝি সাজতাম কারণ আমঝাড়ার নৌকা সবচেয়ে বেশি ডুবে যেত। আর এলেবেলে মাঝি ভাবতাম ডকঘাটের মাঝিদের কে। কারণ ক্যানিংয়ের ঠিক উল্টো দিকেই হচ্ছে ডকঘাট।
সাবির সুবীর গুগল ইমেজ দেখে বললো মাতলা নদীটা শুরুতেই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাত্রা শুরু করেছে কেনো? মামা তখন পুরোনো ধুলি ধূসরিত ম্যাপ দেখালো । ম্যাপ দেখে ওরা অবাক হয়ে গেলো।
আসলে মাতলা নদীর উৎপত্তি হয়েছে করতোয়া আর বিধ্যাধরীর মিলিত ধারায়। যে নদীটা হোমড়া – ঘুটিয়ারি শারিফের দিকে গিয়েছে ওটা ওটাই বিধ্যাধরী। আর যেটা ফুলবাড়ীর দিকে গিয়েছে ওটা করতোয়া নদী। টিংকু মামা বললো আমার নানিমা ওই নদীকে ক্যারাছে নদী বলতো আগেকার মানুষ তাই অমন উচ্চারণ।
ক্যানিং এর ব্রিজ থেকেই কিছুটা অস্পষ্ট ভাবে বোঝা যায় মাতলা নদীর উৎপত্তিস্থল। আমরা ছেলে বেলায় ফুলবাড়ী আসতাম ক্যানিং থেকে কুঁড়েভাঙার নৌকা চড়ে। তখন এই নদী চড়েছিলাম। নদী দুই ভাগ হয়েগেছে তাও স্পষ্ট মনেপড়ে। নৌকা তে চড়তে দারুন লাগতো । একবার মা আর এক মামার সাথে রাতে নৌকা চড়ে এসেছিলাম। গ্রামগুলো তখন অন্ধকার, মাঝিরা ঠিক রাস্তা চেনে। দূরে জঙ্গলের মতন জায়গা থেকে ঝিঝি পোকার আওয়াজ একটু ভয় লাগছিল বৈকি। ভাবছিলাম যদি নৌকা এই রাত্রিবেলা ডুবে যায় যদি বাঘ আসে। তবে অনেক পরে জেনেছিলাম বাঘ আসার কোনো সম্ভাবনা তখন কোনো ভাবেই ছিলনা।
সাবির বললো মামা পুরাতন ম্যাপে এই করতোয়া নদী তো ন্যাজাট – কলিনগরের দিকে এগিয়েছে। আর বিদ্যাধরী গিয়েছে আমরা যেখানে পর্তুগিজ নৌ ঘাঁটি আবিষ্কার করেছিলাম ওই দিকেই মানে ঘুটিয়ারিশারিফ, প্রসাদপুর হয়ে প্রতাপনগর – তাড়দার দিকে।
টিংকু মামা বললো আমার জামাই বাবুর ছিল খড়ের ব্যবসা । এক কালে কলকাতার মানিকতলা থেকে ভাঙ্গড় হয়ে জামাইবাবুর নৌকা মাতলায় আসতো তার মানে হয় করতোয়া হয়ে না হয় বিধ্যাধরী দিয়েই আসতো! আর আমার নানার ছিল ব্যবসা এককালে বারুইপুরের সূর্যপুরের সাথে ক্যানিংয়ের সাথে ছিল খাল আর নদীর যোগাযোগ। ওই পথেই আমার নানার নৌকা ভিড়ত। এখন সেসব কথা শুনলে গল্পকথা মনে হয়। নদী আর খালের কোনো অস্তিত্ব আর কোথাও নেই। আর হ্যাঁ, মাতলা এখন আর কোনো নদী নয়।এখনকার ভূগোলের মতে ওটা মাতলা খাঁড়ি। কারণ সুন্দরবনের মোহনা থেকে শুরু করে মাতলা আর কোনো চলমান নদীতে এসে মেসেনা। সব নদী বুজে গেছে। তাই মাতলা নদী নয় মাতলা খাঁড়ি!
সাবির সুবীরকে টিংকু মামা জানালো আমি তোদের সাথে দেখা করতে কেনো এসেছি জানিস? সুবীর বললো কেনো মামা? টিংকু মামা জানালো এই ফুলবাড়ীর কাছেই আমঝাড়া গ্রাম। ওই গ্রামেই এক কালে প্রতাপাদিত্য তৈরি করেছিলেন নৌ ঘাঁটি – দুর্গ। আমার ইচ্ছা তোদের কে সঙ্গে নিয়ে যাবো। সাবির সুবীর তো খুব খুশি এইরকম ছুটির সময় এমন অভিযান মন্দ নয়। সাথে এই সব গ্রামে ঘোরাঘুরিও হবে।