বাংলা কথা সাহিত্যের সর্বশেষ ‘পার্থিব’ ‘বাঁশিওয়ালা’ শীর্ষেন্দু তার সর্বপ্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপােকা’র প্রথম বাক্যেই ইতিহাসের সময়ের এক দামী মনস্তাত্ত্বিক দলিল রচনার একদম শুরুতেই ব্যক্তি শীর্ষেন্দুর জীবনবােধ-ধর্মবােধ-বিরলতর লালসাহীনতাকে খসখস করে লিখে ফেললেন- “সেইন্ট অ্যান্ড মিলারের চাকরিটা জুন মাসে ছেড়ে দিল শ্যাম।”
হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম-এর অনাতম একটি প্রচলিত নাম শ্যাম। এবং আরও উল্লেখযােগ্য হল, চাকরি ছেড়ে দেওয়া অর্থাৎ, পার্থিব মােহ-মায়ার ত্যাগ করতে শুরু করার মধ্য দিয়ে এই কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাটকীয় আবির্ভাব। ক্রমে শ্যাম বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কর্পোরেট শ্যাম থেকে মানুষ শামি-এ পুনরায় পরিণত হুতে থাকে হারানাে, অসময়ের বেকার জীবনের স্বাধীন তামিশ্রিত সুসময়ের হাতছানিতে “খুঁজে পেতে সে ট্রাঙ্কের তলা থেকে পুরনাে কয়েকটা সুতির শার্টপ্যান্ট বের করল।”
“বড় নিরীহ ও অসহায় দেখায় তাকে।”
“কয়েক দিনের না কামানাে দাড়ির তলায়..” … চোখ দুটোকেও কেমন যেন একটু ঘােলাটে আর অনুজ্জ্বল দেখায়।”
হারানাে সময়, অন্ততঃ মানসিক তৃপ্তির র্টের তােলা বাঙালি, সামাজিকতা, পিছুটান, যৌথ পরিবার ফ্ল্যাশব্যাক থেকে একদম বাস্তব স্বপ্ন হয়ে ধরা দেয় শ্যামের হাতের মুঠোয়—
“শাম, ইতু! কেমন আছ? ইতু, ভাল না। তােমার দেখা নেই দুমাস!
ভালমানুষ নয় কিন্তু অপরাধবােধ, নীতিবােধ-এর অসুখে জর্জরিত, ভালাে-মানুষ হতে চাওয়া শ্যামের সাথে দেখা হয়ে যায় সুবােধ মিত্রের। অন্যের জিনিস নির্দ্বিধায়
টে-পুটে খাওয়ার আজকের ব্যস্ত সময়ে তো বটেই, সেই ৬৭’র ভূড়ি হতে থাকা কলকাতায়ও সুবােধ মিত্ররা উল্লেখযােগ্য ছিল। যে নিজের পিতৃপ্রদত্ত শুভনাম ব্যতীত আর কোনাে কিছুরই ‘সু ব্যবহার করাতে শােখেনি
“মিত্র শ্বাস ছেড়ে বলল, এখন ভাবি কী সব বােকামি! এ-সব প্রতিজ্ঞার কোনও দাম নেই, কী বলেন?
শাম মােলায়েম গলায় বলে, দুর দুর…”
এই শ্যাম মজুমদার’ = ‘বাস্টার্ড’ বােঝে, ঘেন্না করে অন্তরে বাঙালির সাহেবীয়ান ও নীতিবােধহীনতাকে। শ্যামের মনের টাইমমেশিনে যখন অতীতের বহিঃরাঙ্গের ব্যভিচার ও ছলাকলা ফিরে আসে, তখন এই অধমের মনে আসে শ্রীকৃষ্ণ—রাধা লীলা কাহিনী, বারবার কড়া নাড়ে কৃত্তিবাস-সন্দীপন এই শব্দগুলি। নাহ, এখানেও শীর্ষেন্দু সমান্তরাল তুল্যমূল্য বিচার বিশ্লেষণের বাইরে বেরিয়ে এলেন নাটকীয় নৈতিক চেতনার উন্মেষে “আমার কেবল ভয় ওই আটপৌরে মেয়েদের, চারদিন কথা বলার পর যারা পাঁচদিনের দিন মিমিন করে বলে, বা বলছিল, ছেলেটাকে একবার নিয়ে আসিস তাে খুকি, দেখব।”
কাহিনীর অনুষঙ্গে-পারিপার্শ্বে একাধিকবার ভিখিরি, খাদ্যাবস্থার বেহাল দশা অগ্নিযুগের খাদ্য আন্দোলনের আর্ত মানুষের কালশিটে সময়ের প্রতি সচেতনভাবেই নিঃশব্দ রেখাপাত করে।
কখনাে সখনাে পুলিশের টহল মনে করায় নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রাক্মুহূর্তেই এই ‘ঘুণপােকা’ রচনা। সচেতনভাবে ও নিঃশব্দে শব্দদুটি ব্যবহারের পিছনে রয়েছে লেখক ও ব্যক্তি শীর্ষেন্দুর সমাজতান্ত্রিক, সৎ, সাম্যবাদী মার্কসিস্ট থেকে ধর্মীয়, শান্তিপ্রিয়, নির্লোভ, নন-কমিট্যাল সাম্যাবস্থায় রূপান্তর। একটি বাক্য কোট করার লােভ সংবরণ করা যাচ্ছে না— “ডান হাতের চকচকে একটা সুন্দর ব্লেন্ড কণ্ঠনালীর ওপর রাখল। সামান্য একটু চাপ দিল। … ব্লেডটা ছুড়ে ফেলে সে হেসে আপনমনে বলল, ধৎ, বড্ড নাটুকে।.. ক্ষতের ভেজা তুলাে চেপে সে চোখ বুজল। আঃ! বড় আরাম।”
বারংবার ঔচিত্যবোেধ-এর ‘আয়নায় মুখ দেখা’ শ্যাম বউসমেত পুরনাে বন্ধু মাধুকে অপ্রস্তুতে ফেলার চকিত পরিকল্পনা করেও ‘পঁচিশটি টাকা পাওনা আদায় থেকে পিছিয়ে যায়। মিনুর মত রাস্তার পকেটমার, মাস্তানও শ্যামের বন্ধু তাে বটেই, উপরন্তু মিনুকেও শ্যাম নীতিবোধের পুর্বপাঠ পড়াতে চেষ্টা করে। এবং ব্যর্থ হয়ে টের পায়, বেকারত্ব, থুড়ি, জীবনের বাস্তবতা নির্মমতা।।
শ্যাম মৃদু হাসল, ভাবছি বিয়ে করলে কেমন হয়। ইটস্ হাই টাইম।”
“খুশি হয়ে মানুমামা বলল, তােকে চেনাই যায় না, রােগা হয়ে গেছিস, গালে একগাল দাড়ি, কী হয়েছে?”
‘খুব সকালবেলা দরজা খুলে একঝলক সাদার মধ্যে ইতু’কে দাড়িয়ে থাকতে দেখে শ্যাম, আর তার আধাে আলাে-আধাে তমসাচ্ছন্ন জীবনের ‘ঘুম জড়ানাে চোখে সেই সাদা রং কটকট করে। পবিত্রতার চর্ত প্রতীক ইতু চরম বাসনার ঝড় তুলেও, ‘লেপ চাপা দিয়ে আগুন নেভায়। পিঠে পােড়া আঁচল’, ইতু সিঁড়ি বেয়ে চলে যায়। কেন জানি এই অক্ষম পাঠকের সীতার অগ্নিপরীক্ষার কথা মনে পড়ে যায়। শ্যাম বলে, ‘আমি খেলার নিয়ম ভাঙ্গিনি ইতু। শীর্ষেন্দুর নারী-পুরুষ দ্বন্দ্ব সমাস নৈব্যক্তিক মানসলােক সত-পবিত্রতা-সতীত্বের ছেদহীন বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে।
‘শ্যামের জন্মদিনে তাই কোনও বছরেই কোন উৎসব নেই, তেইশে ডিসেম্বরের কথ তার খেয়ালই থাকে না। শীর্ষেন্দুরও তাে উৎসব নেই জন্মদিনে।
মােট সাইক্লিস্টদের উপর অজানা রাগে শাম প্রতিশােধ নেয় চালকের মুখে আয়নার মাধ্যমে আলাের প্রতিফলন ঘটিয়ে। দুর্ঘটনা ঘটে। “দৈবীতে বিশ্বাসী শ্যাম, অপরাধবােধে ভােগা শ্যাম খবরের কাগজে তন্নতন্ন করে সন্ধান করে দুর্ঘটনার খবর।
‘সর্বত্রই অদৃশ্য বিজ্ঞাপন বেঁচে থাকুন। আপনার জীবন… মূল্যবান।’ পরােপকারী শ্যাম অনুভব করে ওজন অনেক কমে গেছে। অনেক দুশ্চিন্তা ও মেদ ঝরে গেছে তার। নাগরিক জীবনের প্রতি কী চরম তাচ্ছিল্য কী পরম নিশ্চিন্ততার মায়াকাজল শীর্ষেন্দুর শ্যাম-এর পরতে পরতে— তা শুধু বােঝা যায়, লেখা নয়।
সুবােধ মিত্রেরও ঈশ্বর ভক্তি কেশ প্রবল ও প্রামান্য। কাঠের পালঙ্কে বিভিন্ন দেব-দেবীর সিংহাসন। কণ্ঠস্থ ছিল গীতাখানা। শালগাছের মত শিরদাঁড়া সােজা রাখা লেখক শীর্ষেন্দুর মােক্ষম লেগগ্লান্স সুবােধ মিত্রের বয়ানে—“হা মশাই, যতক্ষণ আমি পবিত্র ও শুদ্ধ থাকতুম, ততক্ষণই রবিঠাকুর থাকত আমার সঙ্গে। ঝড়ে-জলে, আলােয়-অন্ধকারে, ঘরে কিংবা দূরে— সবসময়ে ওই অত লম্বা, মথয় কালাে টুপি, জোক পরা দাড়িওলা লােকটা সব কাজ ফেলে আমর সঙ্গে থাকত।” বাঙালির রন্ত্রি চেতনার কাঙ্খিততম পবিত্রতম রবি প্রণাম। একটু পরেই আবার সুবােধ বলছেন যখন, “আসলে আমিই ঠিক আসল রবিঠাকুরকে পেয়েছিল মশাই। কিন্তু রাখতে পারলুম না “, তখন কোথাও যেন রবীন্দ্রনাথ কেন্দ্রিক সস্তা মেকি নাটুকেপনাকে ব্যঙ্গ বলে মনে হয়।
নৈতিকতায়-পবিএ৩ায় ৩াই শীষের প্রেম অমিত বিক্রমশালী, ব্যতিক্রমী, শাশ্বত। যেখানে যৌনতা শরীরী আচার মাত্র, অনাবশ্যক, অবৈধ, পাপ। আদর্শবাদী শ্যাম ‘টের পায়, তার সামনের বাতাস বিদ্বেষে বিষিয়ে আছে। বাস্তববাদী, অন্তরলোকের লেখক, দিকদ্রষ্টা শীর্ষেন্দু অনেক দূরের সমকালীন রূঢ় ব্যভিচারী, প্রতিশােধী সময়ের ছবি আঁকেন আর ১৯৬৭ ও ২০১৫ যেন মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
অপরাধবােধে শ্যাম পালিয়ে বেড়াতে যায়। মােটর সাইক্লিস্টদের উপর তার রাগের কারণ স্পষ্টতর হয়- “একটু অহংকারী, সাহসী, ছুটন্তু এক পুরুষ দুটো ছড়ানাে হাতে
বুনাে ঘােড়ার ঝুঁটির মত ধরে থাকা মােটর সাইকেলের কঁাপা হাতল, বুক চিতিয়ে … চমৎকার নয়। … কোমরে ধুসর রঙের পিস্তল, মাথায় কালাে টুপি আর ওই লাল মেটর সাইকেল! সাজেন্ট দেখলে আমি রাস্তার সুন্দর মেয়েদের লক্ষ্যই করতুম না …।” …. কি অদ্ভুত ছেলেমানুষী ইচ্ছার আড়ালে পুরুষত্বের সৌন্দর্যের প্রতি অপার সমর্থন দিয়ে। যান লেখক আর তাঁর অহিংসা স্পষ্টতর হয়— “আই কুডনট কিল দ্যা ম্যান।”
“যেখানে শান্ত ধার্মিক মানু েধীর পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সারা বছর যেখানে চলেছে উৎসৰ” এরকম এক দেশের সন্ধানরত শ্যাম বলে ওঠে- “নাঃ, বস্তুত কোথাও নেই লুকিয়ে থাকবার জায়গা, কিংবা পালিয়ে যাওয়ার সহজ পথ।” আমি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি লেখনীর অসম্ভব সাবলীল সমকালীনতা বাস্তবতায়।
সমাজচেতনায় সজাগ্রত শীর্ষেন্দুর শাম ‘পাকিস্তানের কালচে খামে বাকর চিঠি পায়। ছত্রে ছত্রে, আর শ্যামের পুর্ব স্মৃতিতে পরিবারবােধ ফুটে ওঠে। আর সাথে সাথে শামের মুখে অমােঘ অপর্থিব উচ্চারণ
“এরা শ্যামের মা-বাবা, এঁরাই তার জন্মের কারণ। এঁরাও তাে জানেন না, শামাকে, কিংবা কোথা থেকে এল।” শীর্ষেন্দুর অদৃষ্ট চেতনা ফুটে ওঠে বারংবার নবনব কলেবরে। | শীর্ষেন্দুর ভদ্রলােক ‘মেয়েদের কাছে ঘেঁষে না, ভদ্রলােকদের পকেটের দিকে তাকায়
’, ‘চোখেমুখে খুব নরম এক ধরণের কবিত্বের ভাব ফুটে ওঠে। অনতিক্রমা নিস্তরঙ্গ জীবন শ্যামকে হতাশ করে।
শ্যামের দিনবদল ঘটে হঠাৎই ‘লীলা ভট্টাচার্য-এর সন্ধান পেয়ে— “হাইস্কুলে পড়ার সময় মেয়ে দেখলে যেমন হত, অনেকটা সেরকম নার্ভাস বােধ করছিলুম’.. অনেক দিন বাদে আমি টের পেলুম যে, আমি প্রেমে পড়ে যেতে পারি।” প্রেমে পড়ে বদলে যাওয়া যুবত্রে মত শ্যামের মনে হয় এক বিস্ফোরক, সত্য উপলব্ধি যা আজ অনুভব খুব জরুরী “আশ্চর্য, আমি হিন্দু! কেমন হিন্দু আমি! হিন্দু হয়ে আমি কেমন আছি।” ট্রামে হুণ্ডির কারবারী, পুরনাে দোস্ত, রাজাবাজারের ইরফানের আদাব— দেশভাগের স্মৃতি তাকে মনে পড়ায়— “অবিশ্বাস্য মনে হয় যে, এইসব নাম-পরিচয়ের মধ্যে সে বাঁধা আছে। অবিশ্বাস্য মনে হয় যে, এইসব নাম-পরিচয়ের বাইরে তার আর কোন অস্তিত্ব নেই।”
গ্রামবাংলার জামায়াবাস্তব প্রকৃতি-আবহু শ্যামের মনে ফিরে ফিরে আসে— “নেপুকুরের আঁশটে গন্ধ পায় শ্যাম, শাপলার গায়ের গন্ধ, নিথর রাতকে চমকে দিয়ে জলে ঘাই দেয় বড় মাছ, তারপর শান্ত জলের নীচে পরিদের গভীর রাজ্যে চলে যায় লর অতিকায় নিঃশব্দ গতিময় ছায়া।”
চার দশক আগে লিখতে বসে, যখন ফেসবুক, টুইটার, দূর অস্ত, মােবাইল ফোন দূরের স্বপ্ন, তখন শীর্ষেন্দু লিখছেন— যদি আস্তে আস্তে নির্জন হয়ে আসে পৃথিবী!…
ভালবাসায় ভরে উঠবে … থাকবে না প্রতিযােগিতা, আক্রমণ লােপ পাবে, তখন মানুষের ভাষা থেকে লুপ্ত হবে গালাগাল, অশ্লীল কিংবা কঠিন শব্দ … এখনকার মত সব গােলামলে মনে হবে না।”
শীর্ষেন্দুর মনে হয় আরও শালিক আরও চড়াই আরও উদ্ভিদের, আরও ভালবাসা, রহস্য ও স্বপ্নের বড় প্রয়ােজন আমাদের। তাই ভিড়ের মধ্যে লীলাকে দেখে, বৃষ্টির মাধ্যে খােলা রাস্তায় নেমে’, শ্যামের ‘নিজেকে একটু জীবন্ত বলে মনে হয়।’
সুবােধ মিত্রর গলায় ‘অটোমেশন এসে যাচ্ছে’— স্বেচ্ছাবসর শ্যামের শেষ সিগারেট-বারবার বিভিন্ন পকেটমার ও মাস্তানের দেখা পাওয়া আগুনে ষাট-সত্তর দশকের আর্ত বেকারত্ব, জীবন তাড়নাকে তুলে ধরে বারংবার। অন্তরঙ্গে ‘লীলা’ সঙ্গ বাসনা করা শ্যাম সুবােধ মিএের জমানাে ঘুমের বড়ি তারও দরকার হতে পারে বলে জানায়। যদিও সুবােধ মিত্রর ‘হাওড়া ব্রিজ পােরাবার কথা হলেই আলসি ধরে’! এক্কেবারে উত্তর কলকাত্তাইয়া রােম্যান্টিসিজম।
বারবার এসময় মনের মধ্যে ‘হরিণের খুড়ের’ শব্দ, ‘নিঃশব্দ বৃষ্টিপাত’ শ্যামের মানসলােককে আরও, আরও বেশি জীবন্ত করে তােলে। শ্যাম লীলাকে পাহারা দেয় লীলার অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে। কেউ হেসে কথা বললে শামের ‘সমস্ত শরীর রি-রি করে উঠে।’ যদিও শ্যামের মন বলে, আমি জানিনা আমি কী চাই। আমি জানি না।’ আবার এক মােটর সাইকেল এর আবির্ভাব। লীলা তার পুরুষ বন্ধুর সাথে চলে যায়। শ্যাম জানে পৃথিবী এখনও তেমন সুন্দর নয়। এখনও এখানে রয়ে গেছে কিছু অহংকারী মােটর সাইক্লিস্ট অর কিছু চোয়াড়ে লােক। এই ঘটনারই পরপর বিষন্ন চোখের একটি লােকের শ্যামকে বলা কুকুর দিনে দিনে বাড়ছে। আরও বাড়বে।’ মনের ইনসেটে কোথায় যেন মহাভারতের যুধিষ্ঠির আর কুকুরের স্বর্গ যাত্রার পৌরাণিক দৃশাপট মনে আসে। শ্যাম লক্ষ্য করে, ‘কুকুরগুলি বড় স্নেহে এবং ভালবাসায় শান্ত লােকটির দিকে চেয়ে আছে। শ্যামের আশেপাশের পঙ্গপালের মত লােকজন ‘অলীক ‘ছায়ার মত মনে হয়। শ্যাম নীরব থাকে। অন্ধের মত রুখে দাঁড়াতে চায় সুসময়ের আশায়।
পবিত্রতায় মায়ামােড়া ভালবাসার লীলাকে এক জাদুবাস্তব ঘােরর মধ্যে অনুসরণ। করতে করতে শ্যাম এক রেস্তোরায় এসে পৌঁছায়। শামের অন্তর-অনুভব অফুটে বলে— “লীলা জানত শ্যাম তার পিছু নেবে। তাই এতদুর তাকে কৌশলে টেনে এনেছে লীলা। লীলা জানে যে, যে কোনও বিপদে-আপদে শ্যাম তাকে রক্ষা করবে। তাই সে কৌশলে শ্যামাকে বলে দিল এই লােকটার হাত থেকে আমাকে বাঁচাও।
শ্যাম আত্মবিশ্বাসী ও প্রত্যয়ী কারণ যে জানে সে উপস্থিত থাকতে ‘অরুণের কাছ থেকে লীলার কোনও ভয় নেই। শ্যাম নিজে অরুণের চেয়ে পাকা লােক ছিল। লীলা এবারও অধরা এবং নিরাপদ থেকে যায়।
সুবােধ মিত্রর দেখা পেয়ে চমকে যায় শ্যাম। মিত্র ‘অনেককালের পুরানাে বন্ধুর মত হেসে বলল, “কাল একটা আশ্চর্য ব্যাপার দেখলুম মশাই। বরযাত্রী গিয়েছিলুম পুটিয়ারী পশ্চিম না দক্ষিণ ঠিক নেই, টালিগঞ্জের খাল পেরিয়ে যেতে হয়। ও-সব গ্রাম-গঞ্জ ছিল কিছুকাল আগেও। কিন্তু গিয়ে শুনলুম ওটাও নাকি কলকাতা… হা: হা: …এতদিন কলকাতার মাঝে থেকে টেরও পাইনি যে, কলকাতা কেমন বেড়ে যাচ্ছে চারদিকে। এরপর আর কলকাতার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলেও যাওয়া যাবে না মশাই, খুব অদ্ভুত ব্যাপার হবে, দেখবেন। তখন পাহাড়ে যাবেন তাও কলকাতায়, সমুদ্রে যাবেন তাও কলকাতায়। তখন কলকাতায় জন্ম সারাজীবন কলকাতাতেই ঘুরে মরবে লেক… হাঃ হাঃ…”।
—শহর সড়ছে আর সভ্যতার করাল গ্রাসে আটকে যেতে যেতে আমরা, অরুণের অসভ্য শ্বাপদসম আচরণ করছি, অর্থ লালসা-বাভিচারী হয়ে উঠছি বিনা দ্বিধায়— রাস্তায়, রেস্তোরায়, বারে তাড়া করে টেনশন। কর্পোরেট অরুণ পালাতে চায় একবারই আমি শালা পালাব, ভিসাটা হাতে পাই, তারপর জেট ইওর ওয়ে টু আমেরিকা … ভোঁ ওঁ ওঁ ওঁ।’ কিন্তু পারে না। শ্যাম জানে প্রতিদিনই ওইভাবে আগের দিনের কথা ভুলে যেতে যেতে ঠিকঠাক মতাই নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যাবে অরুণ।’
উপন্যাসের প্রায় শেষ পর্যায়ে শ্যাম সংবাদপত্রে জনৈক আহত গের ভৌমিক-এর মৃত্যু সংবাদ পাঠ করে। বাইক আরােহী গৌরের মৃত্যু, মুখে আলাে ফেলে হত্যাক্রিয়া সংঘটিত করা, সুসময়ের খোঁজে পথ হেঁটে চলা শ্যাম অপরাধবােধে ভােগে, পুনর্জন্ম প্রার্থনা করে মৃত বাইক আরােহীর ‘না, পৃথিবী এখনও তেমন সুন্দর নয়, তবু আমি অপেক্ষায় আছি… জন্ম নাও, আরও একবার জন্ম নও, আমাদের কাছে এসাে।’ জীবনের প্রতি অপার ভালােবাসা আর অপার্থিব সংস্কারবােধ শীর্যের ছত্রে ছত্রে।
উপন্যাসের শেষ তথা ১৪নং পর্বের শুরুতেই দেখা যায় শ্যামের জ্বর এসেছে। ময়লা, রুক্ষ তার পােষাক-চোখমুখ। খাবারে অরুচি। শীর্ষেন্দুর শ্যাম বারবার সময় এবং শুন্যের ঘের বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়েও সময় এবং শুন্যের বাইরে সহজ, অলস, অনায়াস ঘােরাফ্লোয় মত্ত- ‘চারদিকে ছায়ার মত অলীক লােকজন হেঁটে যাচ্ছে। কেউ টেরও পাচ্ছে না তাদের চেনা এই চর্তুদিকে রাস্তাঘাট ভেদ করে একে একে হেট আসছে মায়াবী হরিণেরা। তাদের মৃদু খুরের শব্দ বেজে যাচ্ছে। আর মেঘ ডােক উঠছে শরীরের ভিতরে, বৃষ্টি নামছে, সেই বৃষ্টির জালের মতাে ভালবাসায় টলটল করে ভরে আসছে বুক, বহু দূরে অচেনা এক রেল পুল পেরিয়ে যাচ্ছে কালাে একটা রেলগাড়ি।
শ্যামের শরীর ভরে জ্বর আসছে, অবিভক্ত বাংলা দেশের নারায়নগঞ্জের বন্ধু মিনু-অধুনা মস্তান মিনু তাকে মরছে- তার শরীর নেমে আসছে মাটির দিকে এসব ঘােরের মধ্যে ভাবতে ভাবতেও শ্যাম বিড়বিড় করে বলে, ‘সরে যাও, ওই কাচের দরজাটা আড়াল কোরাে না।’ ঘােরর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে শ্যাম লীলাকে দেখতে পায়। বুঝতে পারে লীলা আজ তার অপেক্ষায় ছিল। লীলার পরনে সে দেখে তার প্রিয় বাসন্তী রং। এই বাসন্তী বসন্তের প্রতীক হয়ে ওঠে। মায়ের মুখ, সােনাকাকা, রাঙাপিসির মুখ ভেসে ওঠে শ্যামের আর উপন্যাসের অন্তিম প্রহরে, কাহিনীর মর্মরূপ বলে ফেলার মত, স্বগতােক্তিতে বলতে থাকে “জন্ম নেওয়া বড় কষ্টকর, তবু তােমাদের জনাই এই দেখাে আমি আর একবার জন্য নিচ্ছি… ভালবাসা যে কত কষ্টের। তা জানে আমার মা, তবু আমি সেই কষ্ট বুকে করে নিলুম.. শিগগিরই আমি সুসময় নিয়ে আসছি পৃথিবীতে… অপেক্ষা করি।”
বিলুপ্তির মধ্য থেকেই পুনর্জন্মের বীজ বােনা শীর্ষেন্দু, সংস্কার পরিবারবােধঅপরাধবােধ-ন্যায়-নীতিবােধ-মান্যতার শীর্ষেন্দুর শামি, কাহিনী জুড়ে সুসময়ের খোঁজে পথ চলে। অনুষঙ্গে আসে লীলা। প্রেম। ব্যতিক্রমী অপেক্ষা। এই প্রেম লালসাময় নয়, এই প্রেম প্রতীক্ষার – অপেক্ষার – সুরক্ষার। তাই জীবনের মায়াকাজল মাখা মুর্ত সময়ে যেমন, তেমনি আজকেও জীবন্ত, বাস্তব। এই শ্যাম আসলে শীর্ষেন্দু। শীর্ষেন্দুই শ্যাম। সংস্কার নীতিবােধ ভালবাসা অপরাধবােধ-ভনিতাহীন সবদিক থেকে। অন্ততঃ এই অক্ষম পাঠক তাই জানে-চেনে-ঝেঝে। এই শীর্ষেন্দু জনপ্রিয় নন। এই শীর্ষেন্দুর উপন্যাস তার বহুপাঠ্য জনপ্রিয় জমজমাট ভূত বা গােয়েন্দাকাহিনির মত আমগল্প পাঠকের স্বাভাবিক অনুমানের সমান্তরাল নয়। গতিশীল নয়। কিছুটা ধীর, ব্যতিক্রমী এই শীর্ষেন্দু। এই শীর্ষেন্দু মানুষের নন, মানসের, অন্তরের অন্তঃস্থলের। নিঃশব্দ অথচ নিশ্চিত তাঁর বিচরণ। এই ‘ঘুণপােকা’ দৃশ্যমান নয়, সমালােচনারও নয়, আদিম অন্ত্যজ অনুভবের।