২৮.
সরল দে একজন সরল মানুষ। সে সস্তায় জীবন ধারণ করার জন্য ফুটপাতের সস্তা পোশাক ব্যবহার করেন। বাড়িতে এসে জামা পরতে গিয়ে দেখে সাইজে অনেক বড় হয়ে গেছে। আবার সস্তায় দর্জির দোকানে সেলাই করে ঠিক করে জামা। আবার জামা কাচাকাচি করার পরে ছোটো হয়ে যায়। সরল সস্তায় খাবার খোঁজে। মুরগীর রোগ হলে সস্তায় কিনে খায়। সস্তার শরীর সরলের, জোর কিন্তু বাড়ে। জমিতে ফসল ফলায়। খোলা আকাশের নিচে আনন্দে থাকে। সস্তায় তার জীবন চলে বলে সকলে তাকে সস্তা সরল বলেই ডাকে। সরল এতে রাগ করে না। কারণ লোকে ঠিকই বলে। সস্তায় কোনো কিছু পেলে সে বাড়ি নিয়ে যায়। তারপর বকুনি খায়। সস্তায় একবার একটা প্যান্ট কিনে সে বাড়ি গিয়ে কাচার পরে দেখে সেটা আর পরণের উপযুক্ত নয়। তবু সে পরে। সে বলে, যতই হোক টাকা দিয়ে কেনা। একবার সরল রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছিল। একটা ফুটপাতের একটি ছেলে রাস্তায় পড়ে রইলো সস্তা মুরগীর মত করোনা আক্রান্ত অবস্থায়।
দামি লোক কেউ নেই। তারা তাদের দামি জীবন নিয়েই ব্যস্ত। সস্তা জীবনের জন্য তাদের সময় নেই।
কিন্তু সস্তা সরল রাস্তায় পড়ে থাকা করোনা আক্রান্ত ছেলেটিকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো মাস্ক পরে আর গ্লাভস পরে।পুলিশ তাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন।
ডাক্তারবাবু বললেন, রক্ত লাগবে। কিন্তু আমাদের স্টকে রক্ত নেই। সঙ্গে সঙ্গে গ্রুপ পরীক্ষায় সস্তা রক্তের সাথে সস্তা রক্ত মিলে গেলো। সরল তার সস্তা রক্ত দিলো । ছেলেটি প্রাণ ফিরে পেলো। সরল রাস্তায় নেমে আবার একটা সস্তা মূল্যে পাঁউরুটি কিনে খেতে শুরু করলো। দুপাশের মূল্যবান জীবন প্রবাহ, সরলকে দেখে হাসতে থাকলো পোকা লাগা দেঁতো হাসির মত নিয়মিত সুরে।
২৯.
—ওরে যাস না ওদিকে, পুকুর আছে ডুবে যাবি
—– না মা, কিছু হবে না
ছোট থেকে চিনু দুরন্ত, একরোখা ছেলে। ভয় কাকে বলে সে জানে না। কোভিড নাইনটিন তার পরিবারের চিন্তা দিন দিন বাড়িয়ে চলেছে।
এইভাবে প্রকৃতির কোলে বড় হয়ে যায় মানুষ । কত কি শেখার আছে প্রকৃতির কাছে। কিন্তু কজনে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। কিন্তু চিনু সেই শিক্ষা নিয়েছিল। গ্রামের সকলে তাকে একটা আলাদা চোখে দেখত।বেশ সম্ভ্রমের চোখে। পরিবারের সকলে জানে না, কি করে চিনু শিক্ষা পেল। প্রথাগত শিক্ষা সে পায় নি। তবু বাড়িতে দাদুর কাছে লেখাপড়া শিখেছে। বই পড়া শিখেছে। চিনু বলত, দাদু কি করে তুমি বই পড়। আমি পারি না কেন? দাদু বলতেন, নিশ্চয় পারবি। মনে মনে বানান করে পড়বি। দেখবি খুব তাড়াতাড়ি বইপড়া শিখে যাবি।
হয়েছিল তাই। দুমাসের মধ্যে চিনু গড়গড় করে বই পড়ত।কোনো উচ্চারণ ভুল থাকত না।
দুপুরবেলা হলেই চিনু বন্ধুদের নিয়ে কদমতলা, বেলতলা, আমতলা, জামতলা দৌড়ে বেড়াত। কাঁচা কদ কড়মড় করে চিবিয়ে খেত। লাঠিখেলা,কবাডি সব খেলাতেই তার অদম্য উৎসাহ। গ্রামের লোকের উপকারে তার দল আগে যায়।
এই দাপুটে ছেলে চিনু একদিন এক সাধুর সঙ্গে ঘরছাড়া হল। বাড়ির সকলে কান্নায় ভেঙ্গে পরলো। কিন্তু চিনুকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। লকডাউনের সময় সে ছিল জঙ্গলে সাধুবেশে।
একদিন গ্রামের একজন গিয়ে দেখল, সাধুর আশ্রমে সবুজ গাছ যত্নের, কাজ করছে চিনু….
৩০.
সীমার ইচ্ছে ছিলো নদী হবে। কুলু কুলু বয়ে যাবে নিরন্তর। পাড় উপচে ভাসানো ঢেউ মনে রোমাঞ্চ জাগাবে। কিন্তু করোনার বদখেয়ালে আর অর্থের লালসায় সব ইতিহাস চাপা পড়ে যায়।
মিতা তার বাল্যবন্ধু। সে বলে, চাপা ইতিহাস ফুঁড়ে বেরোয় বটগাছের রূপ নিয়ে। একদিন রোদ ছিলো, সবুজ গাছ ছিলো। কিছু কাঁটাঝোপ থাকা স্বাভাবিক। সেই বাধা পেরিয়ে অনেকটা পথ একা হেঁটেছে সীমা। সঙ্গে ছিলো অদম্য ইচ্ছে।
আজ সত্তরের তরুণী সীমা সফল করোনা রোগকে হারিয়ে সে আজ সুস্থ। ইতিহাস কথা বলে মৃদুস্বরে।
বেশ কিছু প্রকাশিত গ্রন্থে তার সমস্ত ইচ্ছে, সাধনা নিঙড়ে দিয়েছে মন।
আজ সকালেই সে পেয়ে গেলো পুরষ্কার পাওয়ার সংবাদ।
সত্য, সুন্দর জীবন জয়ের উপহার।
৩১.
ছয় মাসের দুধের শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে গেল মা।তারপর মায়ের করোনার টেষ্ট হল। শিশুটিরও হল।
মা বললেন, আমার বাচ্চাটার রিপোর্ট কি?
ডাক্তারবাবু বললেন, নেগেটিভ। কিন্তু আপনার পজেটিভ। আপনাকে এখন হাসপাতালে থাকতে হবে।
– তাহলে আমার বাচ্চা?
– আপনার বাচ্চা নার্সের কাছে থাকবে। কোন চিন্তা নেই। তারাও তো মায়ের জাত।
নার্স এখন শিশুটিকে দুধ খাওয়ান মায়ের স্নেহে। মাস্ক পরে হাতে গ্লাভস পরে মাতৃজাতি আজ সেবাব্রতী…