দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৯৫)
পর্ব – ১৯৫
শ্যামলী কারখানা থেকে বেরিয়ে বাইরে পা রাখল। আজ নভেম্বর মাসের ছয় তারিখ। ১৯৮৪ থেকে পাঁচশো চুরানব্বই বাদ দাও, বাংলা সন পেয়ে যাবে। তাহলে বাংলা ১৩৯০ সন। আগে আগে মা সকালে উঠে ক্যালেণ্ডার দেখতে বলত। দ্যাখ তো শ্যামলিমা, আজ কি তিথি?
শ্যামলী দৌড়ে গিয়ে ক্যালেণ্ডার দেখে বলত মাকে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে দিদি ফুট কাটত, ওই শুরু হল, বেগুন খেতে আছে কি না, কুমড়োটা পচে যাবার দশা হলে খাব কি না। শ্যামলী হাসত। জানত চাঁদ দেখে দেখে মানুষ তিথি গুনে ক্যালেণ্ডার বানিয়েছে। আজ কার্তিক মাসের কুড়ি তারিখ। মঙ্গলবার। আজ ক্যালেণ্ডারে লেখা ছিল সূর্যাস্ত হবে চারটা তিপ্পান্ন মিনিটে। তাহলে এতক্ষণে সূর্য ডুবে গেছে। ভীষণ ভাবে জীবনানন্দ মনে পড়ছে। সূর্য অস্তে চ’লে গেলে কেমন সুকেশী অন্ধকার
খোঁপা বেঁধে নিতে আসে— কিন্তু কার হাতে? এখনো শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশী। ছয়টা পঞ্চান্ন হলে চতুর্দশী পড়বে। চাঁদের কথা মায়েদের কত ছড়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মা ডাকে আয় আয়, শিশু ডাকে আয় আয়, চাঁদ ভাবে কার কাছে যাবে! আহা কি আশ্চর্য সুন্দর কবিতা লিখেছেন সেকালিনী মায়েরা।
জীবনানন্দ দাশের কথা কেন এত মনে পড়ছে! আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে… সাতটি তারা? কোন্ সাতটি তারা?
আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি এই ঘাসে
বসে থাকি; কামরাঙা-লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো
গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে- আসিয়াছে শান্ত অনুগত
বাংলার নীল সন্ধ্যা- কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশেঃ
আমার চোখের ’পরে আমার মুখের ’পরে চুল তার ভাসে;
পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখেনিকো- দেখি নাই অত
অজস্র চুলের চুমা হিজলে কাঁঠালে জামে ঝরে অবিরত,
জানি নাই এত স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে রূপসীর চুলের বিন্যাসে
পৃথিবীর কোনো পথেঃ নরম ধানের গন্ধ- কল্মীর ঘ্রাণ,
হাঁসের পালক, শর, পুকুরের জল, চাঁদা সরপুটিদের
মৃদু ঘ্রাণ, কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাত- শীত হাতখান,
কিশোরের পায়ে-দলা মুথা ঘাস,- লাল-লাল বটের ফলের
ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা- এরি মাঝে বাংলার প্রাণঃ
আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি পাই টের।
মৃত মনিয়ার মতো… কবি কি পাখির কথা ভেবেছেন, মুনিয়া পাখি? দিদির বায়নায় বাবা একবার কিনে ফেলতে যাচ্ছিল। শ্যামলী চিৎকার চেঁচামেচি জুড়ে দিয়ে ছিল। বাবা বলেছিল, তনুর ইচ্ছে হয়েছে, তনু নিচ্ছে। ও দেখাশোনা করবে। তোর কি পাখি নিতে ইচ্ছে বল্, তোকেও কিনে দেব।
শ্যামলী বড় বড় চোখে বাবাকে বলেছিল, জানো না, কারো স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া খারাপ কাজ?
পানের কষে তেঁতুল বিচির মতো কালো হয়ে যাওয়া দাঁত বের করে পাখিওয়ালা বলেছিল দিদিমণি তোমরা না কিনলে এইসব বদরি মুনিয়া কারা কিনবে? ভারি ফুটফুটে দুই মেয়েকে শশাঙ্ক পালের সঙ্গে দেখে পাখিওয়ালা আশা করেছিল, ভাল লাভ করতে পারবে। শ্যামলী বলেছিল আমি কিচ্ছু কিনব না। আর কাউকে পাখি কিনতেও দেব না। পাখি বাজারের কয়েকজন খরিদ্দার ঘুরে তাকিয়েছিল তার দিকে। একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বলেছিলেন, শোনো, তোমার ইচ্ছেটা সকলের ওপর চাপিয়ে দিও না। এই অভ্যাসটা ভাল নয়। পরে এজন্য তোমাকে পস্তাতে হবে। পাখিওয়ালা দাঁত বের করে হাসছিল। বাবা বললেন, আমার ছোটমেয়ে। সবে তেরোয় পড়েছে। খুব আদুরে। বয়স্ক লোকটি বলেছিলেন, ওকে বোঝাবেন, নিজের ইচ্ছেগুলো অন্যের উপর চাপাতে চাওয়া ভাল নয়। সেদিন দিদির আর পাখি কেনা হয় নি। চোখ মুছে দিদি বলেছিল, আমার সবতাতে তোর আপত্তি। সেদিন কুকুর পুষতে চাইলে তুই বলেছিস্, ওদেরকে প্রকৃতি নিজের খাবার খুঁজে খাবার যোগ্যতা দিয়েছে। তুমি খেতে দিলে ক্রমে ক্রমে প্রকৃতির দেওয়া সেই যোগ্যতাটা ও হারিয়ে ফেলবে। ওর তখন কুকুরের চেহারাটুকুই থাকবে, কিন্তু ভিতরে তখন সত্যিকারের কুকুর আর থাকবে না। ওর স্বাভাবিক ক্ষমতা না কি শেষ হয়ে যাবে। মা গো! কি বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে পারিস তুই? লোকে না কি কুকুর পোষে না!
সপ্তর্ষি মণ্ডলের তারাগুলোর নাম এদেশে মুনি ঋষিদের নামে। অত্রি, অঙ্গিরা, বশিষ্ঠ, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, আরেকটির নাম মরীচি। ভারতের মানুষ এইভাবে ভেবেছিল। ইউরোপের লোকেরা তারামণ্ডলের চৌহদ্দি আরো বাড়িয়ে নিয়ে ওখানে বড়সড় একটা ভালুক দেখতে চেয়েছে। একটা মেয়ে ভালুক। গ্রেট শি বেয়ার। আকাশের দিকে তাকিয়ে মানুষের কল্পনার আর শেষ নেই। ইংরেজিতে বলে আরসা মেজর। ভালুকের জীববিজ্ঞান সম্মত নামেও ওই আরসা শব্দের ছোঁয়া লাগানো। মা তাদেরকে চাপড়ে চাপড়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে বলত, চাঁদের পানে চেয়ে চেয়ে রাত কেটেছে কত, তাইতে সোনা চাঁদের কণা পেয়েছি মনের মতো। মা পেয়েছি বলত না, বলত পেইচি।
জীবনানন্দ বলছেন সন্ধ্যা এসেছে, নীল সন্ধ্যা। নীল কথাটার মধ্যে কেমন একটা ব্যথা উঁকি দেয় না? নীল আছে। তার আগে লাল। কেমন লাল? কামরাঙা লাল। কামরাঙা কথাটা ভাবতে গিয়েই কত কি মনে হল তার। মেয়েটার মুখে ব্রণ, কিংবা ব্ল্যাকহেড, কবি বলবেন, মহুয়া কুঁড়ি। ব্রণের সাথে কেন যে কামনাকে মিলিয়ে দিল কারা, কে জানে! আর চুলের কথা। চুলের সঙ্গে নারীত্বকে মিলিয়ে দিয়েছে। কুঁচবরণ কন্যা রে তোর মেঘবরণ চুল। মেয়েদের চুলের কথা কত করে লিখেছেন জীবনানন্দ। ছুটির দিনে পিসি তাদের চুলের যত্ন নিত। দিদি বলত, কলকাতায় গিয়ে ভাল দোকানে চুল কেটে আসব। পিসি ধমকাত। খবরদার চুল কাটব বলবি না। মেয়েদের চুল কাটতে নেই। বাবা দিদির দিকে তাকিয়ে হাসত। বলত বড়মণি, কলকাতার ভাল দোকানে চুল কাটার খরচ জানিস্? মা ঝামরে উঠত, বললেই চুল কাটতে দিচ্ছি আর কি? দিদি কেঁদে ফেলে বলত, আমার কিচ্ছু স্বাধীনতা নেই!
স্বাধীনতা, এই নাম নিয়ে কত কি হয়ে গিয়েছে!
এই দেয়ালটায় নকশালরা আলকাতরা দিয়ে স্টেনসিলে মাও জে দঙের মুখ এঁকেছিল। ছবির নিচে লিখেছিল বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস। মাও বলেছিলেন, পলিটিক্যাল পাওয়ার গ্রোজ় আউট অফ দ্য ব্যারেল অফ এ গান। কিন্তু সিদ্ধার্থ শঙ্কর আর রুনু গুহনিয়োগীরা নকশালদের চুরমার করে দিয়েছিল। মাও বলেছিলেন, অল রিঅ্যাকশনারিজ় আর পেপার টাইগারস। কিন্তু দ্যাখো, পাল অটোমোবাইল এর মজুরগুলো বুঝতে পারল না, কে তাদের বন্ধু। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত সাহেবের কাছে গিয়ে কালো চামড়ার শ্রমিকদের উপর তার চাবুক চালানোর নিন্দে করেছিল। আড়ালে লুকিয়ে দাঁত বের করে হেসেছিল চাবুক খাওয়া ভারতীয় শ্রমিকরা। শ্রীকান্ত যখন বলতে গেল হাসছিস কেন রে? তারা বলেছিল, কারো খেয়ে হাসতেছি মোরা?
মাওয়ের কথায় মনে এল তাঁর একটা চমৎকার কথা। শতফুল বিকশিত হোক, শতরকমের চিন্তা বিকশিত হোক। কিন্তু সত্যি সত্যি মাও শতরকমের চিন্তাকে সহ্য করতেন? মাও বলতেন, উইমেন হোল্ড আপ হাফ দ্য স্কাই। নারী তুমি আধেক আকাশ। আর মাওয়ের দাম্পত্যে চার চারজন নারী। ১৯০৭ থেকে ১৯১০ লুও ইঝিউ, ১৯২০ থেকে ১৯৩০ ইয়াং কাইহুই, ১৯২৮ থেকে ১৯৩৭ হে জিঝেন, আর ১৯৩৮ থেকে শেষদিন ১৯৭৬ অবধি জিয়াং কিং। তারপর বৌটার একটা করুণ পরিণতি। এই কি শতচিন্তার বিকাশ? এ -যুগে এখন ঢের কম আলো সব দিকে, তবে।
আমরা এ-পৃথিবীর বহুদিনকার
কথা কাজ ব্যথা ভুল সংকল্প চিন্তার
মর্যাদায় গড় কাহিনীর মূল্য নিংড়ে এখন
সঞ্চয় করেছি বাক্য শব্দ ভাষা অনুপম বাচনের রীতি।
মানুষের ভাষা তবু অনুভূতিদেশ থেকে আলো
না পেলে নিছক ক্রিয়া; বিশেষণ; এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল;
জ্ঞানের নিকট থেকে ঢের দূরে থাকে।