|| মানচিত্র আর কাঁটাতার, হৃদয় মাঝে একাকার || বিশেষ সংখ্যায় সঙ্কর্ষণ

কূটনৈতিক প্রেক্ষিতে দেখলে কিন্তু সময়টি একেবারে সঠিক বেছেছিলেন বৈষ্ণবচরণ। ঘটনা শুনে অনেকের মনে হ’লেও হ’তে পারে যে বিপদের সময় সম্পূর্ণ আত্মগোপন ক’রে থেকে নিজে ঠিক নিরাপদ অবস্থায় পৌঁছোনো মাত্রই যে ব্যক্তি নিজের রাজনৈতিক কৌশল প্রদর্শন করা আরম্ভ করে, আন্দোলনের নেতা হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা আদৌ কতোখানি? অবশ্য শ্রী বৈষ্ণবচরণ পট্টনায়ক আদর্শ সুযোগসন্ধানী যে ছিলেন সে বিষয়ে তেমন দ্বিমত থাকবারও কথা নয়, কারণ বিংশ শতকের ব্রিটিশ ভারতে কেবল রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরী ক’রবেন ব’লে কেউ রেলের কামরা রঙ করবার চাকরি ক’রেছেন এমন উদাহরণ নেহাতই বিরল। সেসময় ভারতীয় নাগরিক ব’লতে আমরা হয় বেতনভোগীর দেখা পেয়েছি অথবা সরাসরি মুক্তিকামী। কিন্তু প্রতিনিয়তঃ রাষ্ট্রব্যবস্থার চোখে ধুলো দিয়ে রাষ্ট্রেরই বিরূদ্ধে তাকে ব্যবহার ক’রতে অতিরিক্ত সাহসিকতার তো প্রয়োজন হয়ই। ১৯৩০এর আশেপাশে বিদ্রোহীদের থেকে খুব ভয়াবহ কোনো বিপদের আশঙ্কা না থাকায় উড়িষ্যার বিভিন্ন অংশে ঔপনিবেশিক পৃষ্ঠপোষকতায় রাজকার্য চালাতেন মূলতঃ দেশীয় রাজন্যবর্গ ও ভূস্বামীরাই। এঁরা এতো অতিরিক্ত রকমের অত্যাচারী ছিলেন যে দরিদ্র প্রজারা এঁদের জ্বালায় রীতিমতো অতিষ্ঠ ছিলো। শ্রী পট্টনায়ক যেখানকার বাসিন্দা সেই ঢেঙ্কানল জেলায় রাজা ছিলেন শ্রী শঙ্করপ্রতাপ সিংদেও। প্রথমতঃ বংশানুক্রমেই তিনি প্রজাদের তুলনায় বহুগুণে বিত্তশালী, উপরন্তু পেশাগতভাবেও কুসীদজীবী হওয়ায় যেনতেন প্রকারেণ তাদের ন্যূনতম সম্পত্তিটুকু বাজেয়াপ্ত করা তাঁর প্রায় অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছিলো। উড়িষ্যা রাজনৈতিকভাবে ব্রিটিশ দৃষ্টিতে তো বটেই দেশীয় নেতাদের (জাতীয় কংগ্রেস) চোখেও এতো বেশী অবহেলিত ছিলো যে তাদের অধিকার রক্ষার জন্য নেতৃত্ব দেওয়ার মতো তেমন কোনো মুখ তৈরীই হ’তোনা।
এমতাবস্থায় প্রতিবাদের প্রতিভূ হিসাবে শ্রী পট্টনায়ক স্বচেষ্টায় কিছু বইপত্র প’ড়ে এক নতুনতর রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত হন, যেখানে কোনো এক বা কতিপয় অতিশিক্ষিত ও সুবক্তা মানুষ নন, তথাকথিত-অশিক্ষিত জনসাধারণই রাষ্ট্রবিরোধিতার চালিকাশক্তি। সঠিক মর্যাদাপ্রাপ্ত বৃহত্তর কোনো গণসংগঠন বিপ্লবের পক্ষে যে কতোখানি উপযুক্ত তা জনসমক্ষে আলোচনা ক’রতে গিয়ে তিনি পাশে পেলেন অজস্র দরিদ্র ঢেঙ্কানলবাসীকে। ‘বীর বৈষ্ণব’ নামে তাঁকে আখ্যায়িত করা জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসাহে রেলপথে যোগাযোগবৃদ্ধির পাশাপাশি দ্বিগুণ উৎসাহে তিনি শুরু ‘মার্ক্সীয় সাম্যবাদের’ চর্চা। এই কাজে সহকর্মী হিসাবে প্রথমেই তিনি পাশে পেলেন স্থানীয় বুদ্ধিজীবী শ্রী হরমোহন পট্টনায়ককে। ঢেঙ্কানলে তৈরী হ’লো উড়িষ্যার প্রথম সাম্যবাদী রাজনৈতিক সংগঠন ‘প্রজামণ্ডল’। মণ্ডলের সদস্য মূলতঃ ছিলো রাজশক্তির দ্বারা উৎপীড়িত দরিদ্র উড়িষ্যাবাসীই। কিছুদিনের মধ্যেই মণ্ডলের শক্তি এতো ভয়ঙ্কর হারে বৃদ্ধি পেলো যে ঢেঙ্কানল তো বটেই, সমগ্র উড়িষ্যারই রাজশক্তি রীতিমতো আতঙ্কিত হ’য়ে প’ড়লো। কিন্তু রাজ্যবাসী মনপ্রাণ দিয়ে তাদের নেতাকে বিপক্ষের দৃষ্টি থেকে গোপন ক’রে রাখায় হাজার প্রলোভনেও তাদের কাছ থেকে নেতা বীর বৈষ্ণবের সন্ধান বের করা গেলোনা। বোঝাই যায় যে সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিবাদী সত্ত্বা ঠিক কতোখানি প্রবল হ’লে এহেন বৃহত্তর আন্দোলনে কোনো বিশ্বাসঘাতকের উপস্থিতি শূন্য হ’তে পারে। এমতাবস্থায় রাজা রামদেওকে সাহায্য ক’রতে অর্থ ও সৈন্য পাঠালেন অন্যান্য ভূস্বামীরাও। তারা এসে সন্ধানের নামে দরিদ্র গ্রামবাসীদের কুটীরগুলি তোলপাড় ক’রে দিতে লাগলো। কিন্তু কোনোভাবেই প্রজামণ্ডলের একজন নেতাকেও তারা ধ’রতে পারলোনা।
ঠিক এইখানে ১টি বিষয় বিশেষভাবে স্মর্তব্য। প্রজামণ্ডলের একটি নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবী শিশু-কিশোর বাহিনী ছিলো, যারা পরিচিত ছিলো ‘বানর সেনা’ নামে। গড় বয়স দশ থেকে বারো বছরের এই ছেলেগুলি মূলতঃ ছিলো মণ্ডলসদস্যদেরই সন্তান। বঞ্চিত মানুষজনের মধ্যে বিভিন্ন পেশার উপস্থিতি ছিলো, যেমন- কৃষক, শ্রমিক, মিস্ত্রী, মাঝি ইত্যাদি। তেমনই জনৈক কর্ণধারের পরিত্যক্তা স্ত্রী ছিলেন প্রজামণ্ডলের সদস্যা এবং তাঁর দ্বাদশবর্ষীয় পুত্র ‘বাজিয়া’ ছিলো বানর সেনার সভ্য। এঁদের সামান্য সম্পত্তিটুকুও ঋণের দায়ে আত্মসাৎ ক’রেছিলো রাজশক্তি, কেবল মাথার ওপর ছাদটুকুই যা ছিলো, কিন্তু শ্রী পট্টনায়কের সন্ধান না পেয়ে যখন রাজা রামদেও ক্রুদ্ধ হ’য়ে প্রজাদের ওপর ‘রাজভক্তি কর’ বসালেন, তখন তা দিতে না পারায় অন্যান্য প্রজাদের মতোই মত্ত হাতির পদাঘাতে সে কুটীরও ধূলিসাৎ হ’য়ে গেলো। মাতা-পুত্রের কাছে তাঁদের দলটি ব্যতীত আর কিছুই র’ইলোনা। ঐ ঘরে ব’সে চাল বাছাই ক’রেই জীবিকা নির্বাহ ক’রতেন তাঁরা। সেটিও চ’লে যাওয়ায় অস্তিত্বরক্ষার্থে বাজিয়া গ্রহণ ক’রলো তার পৈতৃক পেশা, নীলকন্ঠপুরের ব্রাহ্মণী নদীতে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি তার দায়িত্ব প’ড়লো বানরসেনার সাংগঠনিক কাজের, মূলতঃ বিপক্ষের গুপ্তচরদের গতিবিধি নিরীক্ষণের।
কিন্তু কিছুদিন পরে অসাবধানতাবশতঃ শ্রী হরমোহন পট্টনায়ক ধরা প’ড়তেই পূর্বের তুলনায় কঠোর হ’য়ে ওঠে রাজশক্তি। কলকাতা থেকে ২৫০জন সশস্ত্র দেশীয় সৈন্যের একটি দল পাঠানো হয় ঢেঙ্কানলে। বিপদ বুঝে গোপনে ব্রাহ্মণী নদী সাঁতরে নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে আত্মগোপন করেন বীর বৈষ্ণব। গ্রামবাসীদের প্রচেষ্টায় এই সংবাদ স্বরাষ্ট্রব্যবস্থার কাছে পূর্ণ সত্যতাসহ না পৌঁছোলেও কেবল গুজবের ভিত্তিতেই তৃতীয়বারের মতো (প্রথম ২বার ব্যর্থমনোরথ হ’য়ে ফিরে আসতে হয়) ব্রাহ্মণী নদীর অভিমুখে যাত্রা শুরু করে দেশীয় ব্রিটিশ সৈনিকেরা এবং নীলকন্ঠপুরের আগে তারা প্রথমবার গ্রামবাসীদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। লড়াই খানিকক্ষণ চলবার পরেই অবিশ্রান্ত গুলিবৃষ্টি করা শুরু করে তারা এবং তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয় দুই বিপ্লবী শ্রী রঘু নায়ক এবং শ্রী কুরি নায়কের। এই ঘটনার পরেই গ্রামবাসীরা দুইভাগে বিভক্ত হ’য়ে সরাসরি পশ্চাদপসারণ করে, যদিও ততোক্ষণে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। সমস্ত অঞ্চলে আলো না থাকায় সৈন্যরা বিভ্রান্ত হ’য়ে প’ড়লেও মণ্ডলসদস্যরা, বিশেষ ক’রে বানর সেনা পূর্ণ সজাগ ছিলো। নদীর ঘাটে সেই সময় নজর রাখবার দায়িত্বে ছিলো দ্বাদশবর্ষীয় বাজিয়া ও তার কতিপয় সঙ্গী। সামান্য নিদ্রাচ্ছন্ন, এমন সময় দুই অস্ত্রধারী সৈন্য এসে তাকে জাগিয়ে নদীর ওপারে নিয়ে যেতে আদেশ করে। বাজিয়া তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারে যে এরা তাদের নেতাকে বন্দী ক’রে নিয়ে যেতে এসেছে। দৃপ্তকন্ঠে সে জানায় রাত্রি হ’য়েছে, অতএব নৌকো এখন নদীতে নামবেনা। সৈনিকেরাও বুঝতে পারে যে এই ছেলেটি মূলতঃ ইচ্ছাকৃতভাবেই ঐপারে যেতে চাইছেনা। এরপর শুরু হয় প্রলোভন দেখানো, দ্বিগুণ ভাড়া, তিনগুণ ভাড়া ইত্যাদি।
কিন্তু স্বাধীনতার লোভ যাকে পেয়ে ব’সেছে সহস্র উপায়েও তাকে লক্ষচ্যুত করা বড়ো সমস্যা আর তাই অন্যান্য বানরসেনারা দূর থেকেই দেখলো আর দুয়েককথা বলার পরেই আরেকজন সৈন্য এগিয়ে এসে বন্দুকের কুঁদোর ঘায়ে মাথা ফাটিয়ে দিলো বাজিয়ার, কিন্তু তারপরেও সে দৃপ্তকন্ঠে নৌকো নামাতে অস্বীকার ক’রতে থাকায় প্রথম সৈনিকটি তার রক্তাক্ত মাথায় প্রবেশ করালো বেয়নেট এবং ২য়জন সেই মৃতপ্রায় বালকের পেট লক্ষ্য ক’রে চালালো গুলি। তারপরেই মাটিতে লুটিয়ে প’ড়লো ভারতবর্ষীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের কনিষ্ঠতম হুতাত্মা ‘শ্রী বাজি রাউৎ’, বানরসেনার অন্যতম সভ্য, মায়ের আদরের বাজিয়া, ইতিহাস যাকে আদৌ মনে রাখেনি, দেয়নি তার প্রাপ্য সম্মান, সামান্য একটি সরকারী পুরস্কার তার নামে উৎসর্গ করা ছাড়া। প্রত্যক্ষদর্শী ২বালক এই সংবাদ ছ’ড়িয়ে দেওয়া মাত্রই মণ্ডলসহ সারা গ্রাম ক্রুদ্ধ হ’য়ে ঝাঁপিয়ে প’ড়লো সেই ৩জন সৈন্যের ওপর, বেগতিক দেখে বাজিয়ার নৌকোতেই পালাতে চেষ্টা ক’রলো তারা। হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় পলায়নে তারা সফলও হ’লো ঠিকই, কিন্তু উড়িষ্যাকেও ত্যাগ ক’রলো তৎক্ষণাৎ। ঠিক সেই মুহূর্তেই জনস্রোতের মাঝে আত্মপ্রকাশ ক’রলেন নেতা শ্রী পট্টনায়ক, যদিও তাঁকে বন্দী করবার মতো অবস্থা স্বরাষ্ট্রব্যবস্থার তখন ছিলোনা। তৎক্ষণাৎ গুলিবর্ষণে মৃত্যু হ’লো আরো ৪জনের। নেতা আপন দায়িত্বে ৫টি দেহ সরকারী চিকিৎসালয়ে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে গেলেন।
চিকিৎসালয় থেকে শ্মশান পর্যন্ত শ্রী রাউতের স্মরণে সেদিন ‘লাল সেলাম’ দিতে থাকা যে অসংখ্য মানুষের সমাগম হ’য়েছিলো, বলা হয় উড়িষ্যায় স্বাধীনতা আন্দোলনের আগুন ছ’ড়িয়ে পড়ে মূলতঃ তার হাত ধ’রেই। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাম্যবাদী রাজনীতির অন্যতম মুখ হিসাবে উঠে আসেন শ্রী পট্টনায়ক। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে তিনি কি স্বার্থপরের মতো কেবল আত্মগোপন ক’রতেই এক নিষ্পাপ বালককে সরাসরি বলি দিয়েছিলেন? আজ্ঞে না, শ্রী রাউৎ সত্যিই একপ্রকার বলিই হ’য়েছিলেন, তবে কোনো ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থে নয়, দেশমাতৃকার স্বার্থে। অধিকারের জন্য তাঁর এই আত্মাহুতি প্রমাণ করে যে বিশেষ কোনো জ্ঞান নয়, বিশেষ কোনো দর্শন নয়, মানবজাতির ইতিহাস স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আসলে শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস। শ্রী পট্টনায়কও কখনোই কেবল নেতা হওয়ার বাসনা থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে জ’ড়িয়ে পড়েননি। শতসহস্র গড্ডলিকা প্রবাহে আমরা প্রবীণতর নেতৃত্বের নামোল্লেখ প্রায়ই দেখি, অথচ মাত্র দ্বাদশবর্ষীয় এই বালকের বলিদান যেন আমরাই প্রতিনিয়তঃ মিথ্যে ক’রে দিই কোথাও। সাম্যবাদ যে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে বহুলাংশে জড়িত এ ঘটনা যে সে সত্যকেও প্রতিষ্ঠা করে তা বলাই বাহুল্য। “আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? ” প্রশ্নটি করবার আগে একটিবারের জন্যেও যদি প্রত্যেক ভারতবাসী নিজের কাছে জানতে চায় সে নিজে দেশের জন্য কী ক’রেছে, শ্রী রাউৎ না হোক, ঘরে ঘরে দুয়েকজন শ্রী সুশীল চাকির উপস্থিতি তো আশা ক’রতেই পারি। সেই ত্রয়োদশবর্ষীয় বালক, “বন্দেমাতরম” ধ্বনি দেওয়ার কারণে প্রকাশ্য আদালত চত্বরে যাকে পনেরো ঘা চাবুক মারবার আদেশ দিয়েছিলেন জেলাশাসক মিস্টার ডগলাস কিংসফোর্ড।
জয়হিন্দ
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।